মধ্যযুগে জীবনের ১০ ফাঁড়া

বর্তমানে প্রায় সব দেশেই মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে। শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার হ্রাস, ছোঁয়াছে রোগের প্রাদুর্ভাব কমে যাওয়া, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের আধুনিকায়নই এই আয়ু বৃদ্ধির কারণ। কিন্তু ষোড়শ শতকের আগ পর্যন্ত কোনো মানুষ শিশু থেকে বৃদ্ধ হওয়া ছিল একটি আশ্চর্য ঘটনার মতো। রাজা কিংবা প্রজা মৃত্যুকে পাশ কাটিয়ে পুরো জীবন উপভোগ করা সবার জন্যই ছিল দুঃসাধ্য। মধ্যযুগে জীবনের প্রধান ফাঁড়াগুলো নিয়ে লিখেছেন পরাগ মাঝি

 

১০ কোটি প্রাণ নিয়েছে প্লেগ

 

১৩৪৭ সালের অক্টোবর। ১২টি বাণিজ্য জাহাজ কৃষ্ণসাগর ও ভূমধ্যসাগরে দীর্ঘ যাত্রা শেষে সিসিলির মেসিনা বন্দরে এসে থামল। এখানে লোকজন এক ভয়াবহ দৃশ্য দেখল। জাহাজগুলোর নাবিকরা অধিকাংশই মারা গেছে। যারা বেঁচে ছিল, তারাও জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। তাদের শরীরে কালো ঘা, যেখান থেকে রক্ত আর পুঁজ বের হচ্ছে। এভাবেই প্লেগ নামক রোগটার নাম হলো কালো মৃত্যু।

মধ্যযুগে মানুষের সবচেয়ে বড় খুনিটির নাম প্লেগ। চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতকে ইউরোপের জনসংখ্যায় এটি মারাত্মক প্রভাব ফেলেছিল। ভয়ংকর এই রোগটির অন্য নাম ‘ব্ল্যাক ডেথ’। এটি মাছি ও ইঁদুরের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ত। ইউরোপে প্রথমবারের মতো এই মহামারির প্রাদুর্ভাব ঘটে ১৩৪৮ সালে। এরপর মাত্র চার বছরের মধ্যে মহাদেশটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষের মৃত্যু হয় প্লেগে আক্রান্ত হয়ে।

তিন ধরনের প্লেগ রোগ ছিল। বিউবোনিক প্লেগের প্রভাবে লোকজনের শরীরের নানা জায়গা ফোলে যেত। সেপ্টিসেমিক প্লেগের প্রভাবে শরীরের বিভিন্ন জায়গা কালো বর্ণ ধারণ করত। এজন্যই এই রোগটি ব্ল্যাক ডেথ নামে পরিচিতি পায়। সবচেয়ে সংক্রামক নিউমোনিক প্লেগের প্রভাবে আক্রান্ত ব্যক্তির জ্বর, মাথাব্যথা, নিউমোনিয়া, বুকে ব্যথা ও শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা হতো।

প্লেগের প্রভাবে পৃথিবীজুড়ে প্রায় ১০ কোটি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। সে সময়ের মানুষ জানত না, ঠিক কী কারণে প্লেগ রোগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ত এবং কীভাবে এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বাস করা হতো ইশ্বরের ক্রোধ, মানুষের পাপাচার এবং বহিরাগত, বিশেষ করে ইহুদিরা প্লেগ রোগের কারণ। কেউ যদি বিউবনিক প্লেগে আক্রান্ত হতো, তাহলে এক সপ্তাহের মধ্যে তার মৃত্যুর সম্ভাবনা থাকত ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ।

ভ্রমণকারীর ফিরে আসা ছিল অনিশ্চিত

মধ্যযুগে যারা দূরদূরান্তে ভ্রমণ করত, তারা নিজের বাড়ি থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর আবার সেই বাড়িতে ফিরে আসবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকত। তাই প্রায় সময়ই তাদের বাড়িঘর, সহায়-সম্পদ বেদখলের শিকার হতো। আর ভ্রমণকারী ব্যক্তি নানা ধরনের বিপদের সম্মুখীন হতো। পথিমধ্যে নিরাপদ এবং শান্তিতে ঘুমানোর জন্যও তাদের কঠোর সংগ্রাম করতে হতো। শীতকালে ভ্রমণের সময় অনেককেই খোলা জায়গায় ঘুমাতে হতো। ফলে ঠান্ডায় জমে গিয়ে মৃত্যুর মুখোমুখিও হতো তারা। ডাকাতি এবং প্রাণহানিরও ভয় ছিল। দেখা যেত কেউ যদি নিরাপত্তার জন্য দল বেঁধে ভ্রমণে বের হয়, তবে অনেক সময় তার সহকর্মীদের দ্বারাও হত্যাকান্ডের শিকার হতো।

মধ্যযুগের ভ্রমণকারীরা প্রায় সময়ই বিভিন্ন এলাকায় অনাহূত প্রবেশের জন্য স্থানীয়দের নির্যাতনের শিকার কিংবা তাদের সঙ্গে সংঘর্ষের মুখোমুখি হতো। কখনো কখনো ভ্রমণকারীদের বন্দি করে জেলে ঢোকানো হতো। জ্ঞানের স্বল্পতা এবং বিদেশি ভাষায় যোগাযোগের ঘাটতির জন্য এই ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হতো।

ভ্রমণকারীদের অসুস্থতা এবং রোগবালাইয়ে আক্রান্ত হওয়া ছিল আরেকটি ভয়ানক ব্যপার। কেউ পথিমধ্যে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে সুস্থ হওয়ার জন্য ডাক্তারের দেখা পাওয়া ছিল দুঃসাধ্য ব্যপার।

ভ্রমণকারীরা দুর্ঘটনারও শিকার হতো। সেই আমলে ভ্রমণের সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম ছিল সমুদ্রপথ। কিন্তু সেই সময়ের জাহাজগুলো কাঠ দিয়ে নির্মিত হওয়ায় ঝড় জলোচ্ছ্বাস কিংবা কোনো কিছুর সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ভেঙে তলিয়ে যেত।

মধ্যযুগে হেঁটে মানুষ এক দিনে সর্বোচ্চ ১৫ থেকে ২৫ মাইল পথ পাড়ি দিত। ঘোড়ায় চড়লে তা হতো ২৫ থেকে ৩০ মাইল। তবে, জাহাজে চড়ে এক দিনে ৭৫ থেকে ১২৫ মাইল পর্যন্ত পাড়ি দিতে পারতো ভ্রমণকারীরা।

দুর্ভিক্ষ ছিল সাধারণ ঘটনা

মধ্যযুগের মানুষদের জন্য দুর্ভিক্ষ ছিল উল্লেখযোগ্য একটি ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। সেই আমলে বিভিন্ন দেশ কিংবা এলাকায় কোনো কোনো বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং গাছপালা রোগাক্রান্ত ফসল মার গেলে নিশ্চিতভাবেই দুর্ভিক্ষ হানা দিত। না খেয়ে অসংখ্য মানুষ হাড্ডি-চর্মসার হয়ে মারা যেত। কেউ কেউ গাছের বাকল কিংবা চিটায় নষ্ট হওয়া ধান, গম আর ভুট্টা খেয়েই টিকে থাকার চেষ্টা করত। ক্ষুধা সহ্য করে যারা বেঁচে থাকত তারা আবার অপুষ্টির কারণে মহামারির শিকার হতো। দুর্ভিক্ষের সময় যক্ষ্মা, আমাশয়, টাইফয়েড, ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং কলেরার মতো রোগ-বালাই মহামারির আকারে দেখা দিত। কোনো এলাকায় দুর্ভিক্ষ হানা দিলে দেখা যেত ওই এলাকার অধিকাংশ মানুষই মরে গেছে। ত্রয়োদশ থেকে ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে শুধু ব্রিটেনই ৯৫ বার দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন হয়েছে। জানা যায়, ১৩৪৮-১৩৭৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ে ব্রিটেনের মানুষের গড় আয়ু ছিল মাত্র ১৭ বছরের কাছাকাছি।

চতুর্দশ শতকের শুরুর দিকের মহাদুর্ভিক্ষ ছিল সবচেয়ে বিপর্যয়কর। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ইউরোপের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়েও কমে গিয়েছিল। ১৩০০ সালের দিকে ওই মহাদেশের তাপমাত্রা এতটাই কমেছিল যে, ওই সময়টিকে ‘লিটল আইস এইজ’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। ১৩১৫ থেকে ১৩২২ সালের মধ্যে ইউরোপে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। দেখা গেছে, টানা ১৫০ দিন ধরে বৃষ্টিপাতের ঘটনাও ঘটেছে। ফলে কৃষকরা তাদের ফসল রোপণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। আর যারা প্রতিকূলতার মাঝেই ফলস বুনেছিল, তাদের ফসল চিটায় নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এই সময়ে ইংল্যান্ডের প্রায় ১৫ শতাংশ মানুষ মরে গিয়েছিল। পশ্চিম ইউরোপের অবস্থা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, অনেক মানুষ ক্ষুধার তাড়নায় নরখাদকে পরিণত হয়েছিল।

জন্মের সময় মা ও শিশুর মৃত্যু

আধুনিককালে শিশু জন্মদানের ক্ষেত্রে চিকিৎসাবিজ্ঞান অনেক এগিয়ে গেছে। জন্মের আগেই আমরা জানতে পারি অনাগত শিশুটি ছেলে নাকি মেয়ে। জটিল অবস্থায় মায়েদের সিজার করার প্রক্রিয়াও এখন সব দেশে চালু আছে। কিন্তু মধ্যযুগে শিশু জন্মদানের এই প্রক্রিয়াটি ছিল খুবই বিপজ্জনক। এ ক্ষেত্রে মা এবং শিশু দুজনেরই জীবনের হুমকি থাকত। গর্ভ থেকে শিশুকে ভূমিষ্ঠ করতে অনেক সময় বেশ কয়েক দিন সময় লেগে যেত। এই সময়ের মধ্যে ধীরে ধীরে অনেক মায়ের জীবনই নিঃশেষ হয়ে যেত। সন্তান জন্মদানের ক্ষেত্রে অনেক সময় অদক্ষ ধাত্রীরা দায়িত্ব পালন করত।

দেখা যেত, অনেক শ্রমের বিনিময়ে যেসব মা তাদের সন্তানকে ভূমিষ্ঠ করতে সক্ষম হতো, পরবর্তী সময়ে তারা নানা রকম মাতৃত্ব জটিলতা এবং ইনফেকশনের শিকার হতো। সন্তান জন্মদানের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত যান্ত্রিক কোনো ব্যবস্থার পরিবর্তে সাধারণ উপায়ে মায়ের গর্ভ থেকে শিশুদের টেনে বের করা হতো। ধনী-গরিবনির্বিশেষে সব মায়েরাই এই জটিল পথ পাড়ি দিত। ১৫৩৭ সালে ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরির স্ত্রী জেন সিমোর সপ্তম এডওয়ার্ডকে জন্ম দেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই প্রাণ হারিয়েছিলেন।

শৈশবেই মৃত্যু

মধ্যযুগে শিশুকালেই অনেক প্রাণহানির ঘটনা ঘটত। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে গবেষকরা ধারণা করেন, মধ্যযুগে সাত বছর হওয়ার আগেই অন্তত ২০ থেকে ৩০ শতাংশ শিশু মৃত্যুবরণ করত। কারও কারও মতে, এই সংখ্যাটি ছিল আরও বেশি।

সাত বছর হওয়ার আগেই যেসব শিশু মারা যেত, তাদের বেশিরভাগেরই মৃত্যু হতো অপুষ্টিজনিত কারণে এবং নানাবিধ রোগ-শোক ও ইনফেকশনের শিকার হয়ে। এ ক্ষেত্রে স্মলপক্স, হুপিং কাশি, দুর্ঘটনা, হাম, যক্ষ্মা, ভাইরাল রোগ এবং পেটের পীড়া ছিল উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া প্লেগ রোগে শিশুরাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হতো।

সাধারণ পরিবারগুলোর পাশাপাশি ধনী পরিবারগুলোতেও সমান হারে শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটত। জানা যায়, ১৩৩০ থেকে ১৪৭৯ সালের মধ্যে ইংল্যান্ডের ডিউক পরিবারগুলোর এক-তৃতীয়াংশ শিশুর মৃত্যু হয়েছিল পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই।

বাজে আবহাওয়া

মধ্যযুগে শহরের তুলনায় গ্রামগুলোতে মানুষের বসবাস ছিল বেশি। তাই মাটির সঙ্গে যাদেও জীবন জড়িত ছিল তারা

প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর সবচেয়ে বড় শিকারে পরিণত হতো। বাজে আবহাওয়া প্রায় সময়ই ফসল রোপণ এবং ফসল বেড়ে ওঠায় বাধা হয়ে দাঁড়াত। পশ্চিমা দেশগুলোতে গ্রীষ্মকাল যদি ভেজা এবং ঠান্ডা হতো, তাহলে নিশ্চিতভাবেই গমের ফসল মার যেত। ফলে গমের উৎপাদন কম হলে মানুষ নিকৃষ্ট মানের গম খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করত এবং অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যেত। ফলে ক্ষুধা, অনাহার, রোগ শোকে মানুষের মৃত্যুর হার বেড়ে যেত। অতিরিক্ত শীত কিংবা গরম মানুষের জীবনের হুমকি হয়ে দাঁড়াত। তাই ভালো আবহাওয়ার জন্য মধ্যযুগের মানুষরা নানা রকম আচার অনুষ্ঠান করত। বীজ বপন থেকে ফসল ঘরে তোলার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে বিশেষ প্রার্থনার প্রচলন ছিল। প্রাকৃতিক বিভিন্ন দুর্যোগ বিশেষ করে তুষার, বাতাস, বৃষ্টি এবং খরা এসবের জন্য আলাদা আলাদা দেবতার পূজা করা হতো।

 সেই সময়ের মানুষরা বিশ্বাস করত প্রাকৃতিক দুর্যোগের পেছনে মানুষের পাপাচার, দুর্নীতি, ব্যাভিচার এবং পারিবারিক কলহ দায়ী। এমনও ভাবা হতো, ডাকিনীচর্চার মাধ্যমে এসব দুর্যোগ পৃথিবীতে নিয়ে আসা হয়।

কলহ-বিবাদ, খুনোখুনি

আইনের যথাযোগ্য প্রযোগ না থাকার ফলে মারামারি আর কলহ-বিবাদ ছিল মধ্যযুগের খুব সাধারণ একটি ঘটনা। নানাভাবে এই সব বিবাদ সংঘটিত হতো। রাস্তায় খুনোখুনি থেকে শুরু করে পানশালা কিংবা জনসমাবেশে একে অপরের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়ত মানুষ। অধস্তনরা তাদের মালিককে খুন করে বা বিদ্রোহ সব দখল করে নিত। কিংবা এসবের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়েও খুনোখুনি হতো।

খুন, জখম আর ধর্ষণের মতো অপরাধগুলো করে মানুষ খুব সহজেই পার পেয়ে যেত কিংবা গা ঢাকা দিতে পারত।

মধ্যযুগে রক্তের বদলা বংশপরম্পরায় চলত। দুটি প্রভাবশালী পরিবারের মধ্যে এ ধরনের বিবাদ সংঘটিত হলে একে একে বহুজনের প্রাণহানি ঘটত। জমিজমা এবং অর্থকে কেন্দ্র করেও বহু প্রাণহানি ঘটত।

রাজায় রাজায় যুদ্ধ কিংবা বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় মধ্যযুগে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। গৃহযুদ্ধ ছিল সেই আমলের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।

ধর্মের নামে যুদ্ধ

ধর্মবিশ্বাসে পার্থক্য থাকার কারণে মধ্যযুগে বহু মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে। প্রচলিত মতের বিরুদ্ধে কেউ কিংবা কোনো গোষ্ঠী নিজস্ব মত দিলে তা ধর্মদ্রোহিতা বলে গণ্য হতো। আর এই ধরনের অপরাধের জন্য সেই আমলে মৃত্যুদন্ডই ছিল একমাত্র শাস্তি। খ্রিস্টান ও মুসলিমদের মধ্যে ক্রুসেড সংগঠিত হয়েছিল মধ্যযুগেই। এই ধর্মযুদ্ধে দুই পক্ষের লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। ইহুদি ও মুসলিমরা সেই আমলে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

সাধারণভাবে ইতিহাসে ক্রুসেড বলতে পবিত্র ভূমি অর্থাৎ জেরুজালেম এবং কন্সটান্টিনোপলের অধিকার নেওয়ার জন্য ইউরোপের খ্রিস্টানদের সম্মিলিত শক্তি মুসলমানদের বিরুদ্ধে ১০৯৫ থেকে ১২৯১ সাল পর্যন্ত বেশ কয়েকবার যে যুদ্ধ অভিযান পরিচালনা করে সেগুলোকে বোঝায়। তবে, ক্রুসেডের সংজ্ঞা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। ১৪৯২ সালে স্পেন থেকে ইহুদিদের বহিষ্কার করা হয়েছিল, আর মুসলিমদের বলা হয়েছিল তারা সেখানে অবস্থান করতে পারবে যদি খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে তবেই।

শিকারি নিজেই শিকার

মধ্যযুগে শিকার ছিল মানুষের প্রধান একটি শখের বিষয়। তবে, এটি সব সময় সহজেই সংগঠিত হতো না। দেখা যেত শিকারে গিয়ে বন্য পশুর আক্রমণে অসংখ্য শিকারির প্রাণহানি ঘটত। দুর্ঘটনাও ঘটত এসব ক্ষেত্রে। কেউ কেউ শিকারের পেছনে ছুটতে গিয়ে ঘোড়ার ওপর থেকে পড়ে যেত। বিষাক্ত তীরের আঘাতে অনেক শিকারিও বিষক্রিয়ায় মারা যেত। বন্য শূকর এবং ভালুকের আক্রমণ থেকে শুরু করে বাঘ, সিংহ ও সাপের কামড়েও মধ্যযুগের অসংখ্য শিকারি প্রাণ হারিয়েছে।

শিকারে গিয়ে অনেক রাজা-বাদশাও প্রাণ হারিয়েছেন। ৮৮৬ সালে বাইজেন্টাইন বা পূর্ব রোমান অঞ্চলের সম্রাট বাসিল হরিণের শিঙে বিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন। ১১০০ সালে ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় উইলিয়াম দুর্ঘটনাবশত তীরের আঘাতে প্রাণ হারিয়েছিলেন। ১১৪৩ সালে জেরুজালেমের রাজা ফুল্ক ঘোড়ার খুরের আঘাতে প্রাণ হারান।

অকালমৃত্যু

হঠাৎ করেই অকালমৃত্যু ছিল মধ্যযুগের খুবই সাধারণ একটি ঘটনা। সেই আমলে বেশিরভাগ মানুষ বুড়ো হওয়ার আগেই মরে যেত। গ্রামের চেয়ে শহরেই বরং মৃত্যুর হার বেশি ছিল। প্রাপ্তবয়স্করা প্লেগ, যক্ষ্মা, অপুষ্টি, দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ এবং দুর্ঘটনার ফাঁড়া কাটিয়ে খুব কমই বৃদ্ধ হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।

সেই আমলে সম্পদও জীবনের নিরাপত্তা দিতে পারত না। ১৩৩০ থেকে ১৪৭৯ সালের মধ্যে ইংল্যান্ডে পুরুষের জীবন ছিল গড়ে ২৪ বছরের, আর নারীর জীবন ছিল গড়ে ৩৩ বছরের। পঞ্চদশ শতকের ২০-এর দশকে ইতালির ফ্লোরেন্সে পুরুষের গড় আয়ু ছিল ২৮.৫ বছর এবং নারী ২৯.৫ বছর।