অ্যানফিল্ডে অলৌকিক প্রত্যাবর্তনের গল্প

কেউ বলছেন ‘শতাব্দীর সেরা বিপর্যয়’। কেউ লিখছেন, ‘সেনসেশনাল’। তবু অ্যানফিল্ডের রাতের রূপকথাকে ঠিক ধরা যাচ্ছে না। যাবে কেমন করে। স্রেফ শব্দ দিয়ে কে কবে ধরতে পেরেছে অলৌকিক ফুটবলকে।

চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনালের দ্বিতীয় লেগে ৪-০ গোলে হেরেছে বার্সেলোনা। যারা প্রথম লেগ ৩-০ গোলে জিতে ফাইনালে পা প্রায় দিয়েই ফেলেছিল। কিন্তু প্রায় দিয়ে ফেলে আর দেওয়ার মধ্যে যে দুস্তর ব্যবধান তা বুঝতে পারছে কাতালানরা। বুঝতে পারছে গোটা ফুটবল দুনিয়াও।

মাত্র ৯০ মিনিট। এই অল্প সময়ে পাল্টে গেছে সব। লিওনেল মেসির মুগ্ধতা জাগানো ফুটবল মুছে গেছে। তিকিতাকার ঢেউ হারিয়ে গেছে। যে রক্ষণ সপ্তাহখানেক আগেও ছিল প্রাচীরের মতো অভেদ্য, তা ভেঙেচুরে গেছে। আর সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর ইতিহাসের সেরা প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখেছে লিভারপুল।

সেই গল্প এতটাই অবিশ্বাস্য যে, শেষ বাঁশির পরও বিশ্বাস করতে পারছিলেন না অনেকে। ফাইনালে ওঠার পর লিভারপুলের ফুটবলাররা একে অন্যের কাঁধে হাত রেখে ‘ইউ উইল নেভার ওয়াক অ্যালন’ গাইছিল। তাদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়েছিল গোটা অ্যানফিল্ড। পতাকা উড়ছিল। ঢেউ উঠছিল। রাতের মায়াবী আলোয় সে এক অলৌকিক দৃশ্য। অ্যানফিল্ডের হৃদয় থেকে উঠে আসা এমন একটা রাতের জন্য বোধহয় বহু বছর অপেক্ষায় ছিল লিভারপুল। অন্যদিকে বিপর্যস্ত বার্সেলোনা ভুলতে চাইছিল দুঃস্বপ্নের রাত। কিন্তু চাইলে কি আর ভোলা যায়। এক বিপর্যয় অন্য এক বিপর্যয়ের স্মৃতি জাগিয়ে তোলে। গত মঙ্গলবারও তুলেছে। এক বছর আগে ন্যু ক্যাম্পে রোমার বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের প্রথম লেগে ৪-১ গোলে জয় পেয়েছিল বার্সেলোনা। এরপর ফিরতি লেগে ইতালির রাজধানীতে ৩-০ গোলের বিপর্যয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ থেকে ছিটকে যায় কাতালানরা। এবার সেমিফাইনাল থেকে ওরকম এক বিপর্যয়ে আবার স্বপ্নভঙ্গ হলো তাদের।

অ্যানফিল্ডে মঙ্গলবার রাতের গল্পের ব্যাখ্যায় শব্দ খুঁজে পাওয়া ভার। ম্যাচ শেষে দলের ম্যানেজার ইয়ুর্গেন ক্লপ যাকে বলেছেন ‘মেন্টালিটি অব জায়ান্ট’। গার্ডিয়ান লিখেছে, ‘এটা গৌরবময়। ইউরোপের ইতিহাসে এক অভাবনীয় ম্যাচ খেলেছে লিভারপুল’। বার্সেলোনার কোচ এরনেস্তো ভালভারদে বলেছেন, ‘আমি জানি না এটা আমাকে কীভাবে প্রভাবিত করবে। কিন্তু কোচ হিসেবে আমাকে দায় নিতে হবে।’ দায় আসলে নিতে হবে বার্সেলোনার রক্ষণকে। এমন দক্ষতাহীন, জড় ডিফেন্স কমই দেখা যায়। লিভারপুল তাদের প্রথম গোল পেয়েছিল জর্দি আলভার ভুলে। কিক-অফের ৭ মিনিটে গোল করে এগিয়ে দেন বেলজিয়ান স্ট্রাইকার দিভোক অরিগি। দলের হয়ে ৭৯ মিনিটে আরও একটি গোল করেছেন তিনি। রাইটব্যাক ট্রেন্ট আলেক্সান্ডার আরনল্ডকে নামিয়ে কৌশলের যুদ্ধে এগিয়ে গিয়েছিলেন রেড ডেভিলদের কোচ। শেষ গোলটা হয়েছে আরনল্ডের বুদ্ধিমত্তায়। অবশ্য চলতি মৌসুমে রক্ষণ সামলানোর চেয়ে আক্রমণেই বেশি দক্ষতা দেখাচ্ছিলেন আরনল্ড। সেমিফাইনালে নামার আগে ১৩টি অ্যাসিস্ট করেছিলেন। শেষ গোল হয়েছে তার বুদ্ধিদীপ্ত কর্নার থেকে। দ্বিতীয়ার্ধের ৫৪ মিনিটে জর্জিনহো উইজনালডামের গোলের পেছনেও কৃতিত্ব ছিল আরনল্ডের। তবে এর দুই মিনিট পর জারদান শাকিরির ক্রস থেকে উইজনালডাম হেডে যে গোলটি করেছেন তা এক কথায় অবিশ্বাস্য। নড়াচড়ার সুযোগ পাননি বার্সার গোলকিপার মার্ক-আন্দ্রে টার স্টেগেন।

ইনজুরির কারণে অ্যানফিল্ডে মোহামেদ সালাহ খেলতে পারেননি। মাঠে এসেছিলেন ‘নেভার গিভ আপ’ লেখা টি-শার্ট পরে। দল জেতার পর কোচ আর সতীর্থদের সঙ্গে হাসলেন, নাচলেন আর মনে করিয়ে দিলেন গত বছরের ফাইনালের কথা। এক বছর আগে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনলে রিয়াল মাদ্রিদের কাছে হারতে হয়েছিল লিভারপুলকে। ‘মিসরের মেসি’ সেদিন কিছু করতে পারেননি। এবার কিছু একটা করার সুযোগ হয়তো পাবেন। একটা জাদুকরী রাত সেই সুযোগ অন্তত এনে দিয়েছে তার সামনে। যে রাতে রূপকার লিভারপুলের ফুটবলার আর ক্ষুরধার মস্তিষ্কের ইয়ুর্গেন ক্লপ। যিনি ম্যাচের আগে শিষ্যদের বলেছিলেন, ‘আমি মনে করি না এটা সম্ভব। কিন্তু তোমাদের পক্ষে সম্ভব কারণ তোমরা সত্যিকারের “মেন্টালিটি জায়ান্ট”।’