আল্লাহর জিকিরে জীবনে শান্তি আসে

মানুষের আত্মিক, শারীরিক ও সামাজিক জীবনে শান্তি আসে একমাত্র আল্লাহতায়ালার স্মরণে। মানব জীবনের যাবতীয় দুঃখ-বেদনা ও দুশ্চিন্তা নিরাময়ের একমাত্র জিয়নকাঠি তারই জিকির। প্রকৃত মুমিনরা অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন হয়ে থাকে। সে দেখে আল্লাহতায়ালার কুদরত, স্মরণ করে তার প্রভুকে, গ্রহণ করে ইমানি স্বাদ। আল্লাহতায়ালাকে জানে সবসময় হাজির-নাজির। সদরে-নীরবে আগমনে-প্রস্থানে সব সময় তার হুকুমের স্মরণ করে। কারণ তিনিই তার সাহায্যকারী, ভরসাস্থল ও অভীষ্ট। জিকিরের মাধ্যমে আল্লাহতায়ালার ভালোবাসা লাভ করা যায়। চিরশত্রু শয়তান পালায়, ফেরেশতা সাথী ও বন্ধু হয়ে সাহায্য করে সব সময়। মূলত জিকির ইবাদত।

 

আল্লাহতায়ালাকে স্মরণ করার নির্দেশ স্বয়ং আল্লাহর। কারণ ‘আল্লাহর স্মরণই সর্বশ্রেষ্ঠ।’ -সুরা আনকাবুত: ৪৫। আল্লাহতায়ালার জিকির সম্পর্কে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে আল্লাহর জিকির করে এবং যে তার জিকির করে না, তাদের তুলনা জীবিত ও মৃতের মতো।’ -সহিহ বোখারি ও মুসলিম।

 

হাদিসে আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ঘরে আল্লাহর জিকির হয় এবং যে ঘরে আল্লাহর জিকির হয় না, ওই ঘরের দৃষ্টান্ত জীবিত ও মৃতের মতো।’ -ফাতহুল বারি। নানাভাবে আল্লাহতায়ালাকে স্মরণ করা যায়। এর অন্যতম হলোÑ ইবাদত-বন্দেগি। এ ছাড়া খুতবা, ওয়াজ-নসিহত ইত্যাদির মাধ্যমেও আল্লাহর জিকির করা হয়। অনেকে তো প্রতিদিন পাঁচবার আজানকেও আল্লাহর জিকির বলে সাব্যস্ত করেছেন। কারণ, যখন মুমিন শুনে ‘আল্লাহর আকবার’ থেকে ‘লা ইলাহা ইল্লাহ’ পর্যন্ত দীপ্ত ঘোষণার অমীয় বাণী তখন যেন সে হৃদয়ে প্রশান্তি লাভ করে, আজানের ধ্বনি শান্তি এনে দেয় অন্তরে।

 

জিকিরের অর্থ স্মরণ করা বা করানো। কাউকে কোনোভাবে আল্লাহর নাম, গুণাবলি, বিধান বা আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কিত যেকোনো বিষয় স্মরণ করানোকে বিশেষভাবে কোরআন ও হাদিসে ‘জিকির’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। ‘যখনই তাদের কাছে তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে কোনো নতুন জিকির আসে, তখনই তারা খেলাচ্ছলে তা শ্রবণ করে।’ -সুরা আম্বিয়া: ২

 

জিকির ইমানকে নবায়ন করে। জিকির সার্বক্ষণিক ইবাদত। এর কোনো সীমা-পরিসীমা নেই, সংখ্যা নির্ধারিত নেই। নামাজ দিনে পাঁচবার, রাকাত সংখ্যাও নির্ধারিত। রমজানের রোজা এবং হজ নির্দিষ্ট সময় ও নিয়মে নির্ধারিত। জাকাত বছরে একবার। কিন্তু জিকিরের জন্য কোনো সময় ও সংখ্যা নির্ধারিত নেই। সফরে, বাড়িতে, স্থলভাগ, জলভাগ, দাঁড়ানো, বসা, শায়িতাবস্থা, দিন-রাত, অজু-গোসলের সময়ও কোনো বাধা নেইÑ সার্বক্ষণিক জিকির করা যায়। জিকিরে আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয়। আল্লাহর জিকিরে অজস্র ধারায় রহমত বর্ষিত হয়। কোরআনে কারিমে এ বিষয়ে ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনিই তোমাদের প্রতি রহমত বর্ষণ করেন এবং তার ফেরেশতারাও রহমতের দোয়া করেন, অন্ধকার থেকে তোমাদের আলোতে বের করার জন্য। তিনি মুমিনদের প্রতি পরম দয়ালু।’ -সুরা আল আহজাব: ৪২

 

জিকিরের বিনিময়ে আল্লাহতায়ালা মানুষের প্রতি অজস্র ধারায় রহমত ও অনুকম্পা বর্ষণ করেন। কোরআনে বলা হয়েছে, সার্বক্ষণিক আল্লাহর জিকিরেই শান্তি। ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাদের অন্তর আল্লাহর জিকির দ্বারা শান্তি লাভ করে, জেনে রাখো, আল্লাহর জিকির দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।’ -সুরা রাদ: ২৮

 

জিকির বা স্মরণ শব্দটি তখনই ব্যবহৃত হয়, যখন পূর্বপরিচিত কোনো জিনিস ভুলে যাওয়ার পর পুনরায় হৃদয়ে আলোচিত হয়। যার সঙ্গে আগে পরিচয় ছিল না তার আলোচনাকে কোনো ভাষাতেই জিকির বা স্মরণ বলা হয় না। এ জন্য আল্লাহতায়ালা কোরআনে কারিমকে জিকির, তাজকিরা ইত্যাদি নামে আখ্যায়িত করেছেন। আর হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে নাম দিয়েছেন ‘মুজাক্কির’ তথা স্মরণকারী।

 

কোরআনে পৃথিবী, পাহাড়, পর্বত, সুন্দর উদ্ভিদ জগৎ এ সব কিছুকেও জিকিরা (স্মরণকারী) বলা হয়েছে। এ সবই হৃদয়ের কাছে পূর্বপরিচিত দয়াময় আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দেয়। সুরা রাদের ২৮তম আয়াতের অলৌকিক শব্দবিন্যাস দ্বারা বুঝা যায় মানবাত্মাকে আল্লাহ ছাড়া আর যে দিকেই নেওয়া হোক না কেন সে সেখান থেকে দিক পরিবর্তন করবেই। আয়াতটির শব্দবিন্যাস নি¤œরূপ- ‘জিকরুল্লাহ’, ‘আল্লাহর স্মরণ।’ ‘তাতমায়িন্না’ ‘স্থির হয়ে যায়’, ‘আলকুলুব’ সদা বিচরণশীল পার্শ্ব পরিবর্তনকারী অন্তর। অর্থাৎ মানবাত্মা আল্লাহর প্রণয় প্রীতি ও স্মরণ না পেলে অস্থিরতাহেতু পার্শ্ব পরিবর্তন করতে থাকে। আর যখন প্রণয়প্রীতিহেতু স্মরণরূপ ‘শারাবান তহুরা’ (অমীয় পানি, কিংবা আল্লাহর সাক্ষাৎ) পেয়ে যায় তখনই সে অস্থিরতা ও দিক পরিবর্তন ত্যাগ করে ‘মুতমাইন’ ও সুস্থির হয়ে যায়। আল্লাহতায়ালা সবাইকে শান্ত হৃদয়ে, একাগ্রচিত্তে জিকিরের আমল করার তওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : ইসলামবিষয়ক লেখক