তদন্তের কাজ শেষ। এ মাসের মধ্যেই আদালতে দাখিল হচ্ছে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার অভিযোগপত্র। অভিযোগপত্র দাখিলের পর মামলাটিকে ফাস্ট ট্র্যাক করার জন্য প্রসিকিউশনকে নির্দেশ দেওয়ার কথা রয়েছে সরকারের। পরে প্রয়োজন হলে মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল বা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
এ ব্যাপারে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, যেকোনোভাবেই হোক এ মামলার দ্রুত বিচার করা হবে। চার্জশিট পাওয়ার পর আমরা এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেব। তবে এটা নিশ্চিত যে, দ্রুত বিচার হবে। এই অপরাধের বিচার করে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই সোনাগাজীর ইন্সপেক্টর শাহ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা মামলার মাঠ পর্যায়ের তদন্ত শেষ করে এনেছি। মামলার যে চার আসামি আরিফ, মকসুদ, আফসার ও শামীম (২) পাঁচ দিনের রিমান্ডে ছিলেন, রিমান্ড শেষে আগামীকাল (আজ শনিবার) তাদের আদালতে তোলা হবে। আশা করছি এই মাসের মধ্যেই চার্জশিট দিতে পারব।
এই কর্মকর্তা জানান, মামলার ১২ আসামি ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। তদন্তের স্বার্থে সন্দেহভাজন আরও তিন-চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে। এ মামলায় গ্রেপ্তারকৃত কারও জামিন হয়নি। মামলার অন্যান্য আসামির সঙ্গে মূল হোতা মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা কারাগারে রয়েছেন। তবে মামলাটি অন্যত্র স্থানান্তর করা হবে কি না তা জানেন না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে নুসরাত হত্যা মামলার বিচার দ্রুত বিচার আইনে করার দাবি উঠেছে শুরু থেকেই। গত ১১ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নুসরাতের হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দিয়েছেন। আইনমন্ত্রীও মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির কথা বলছেন। এর আগে নুসরাতের পরিবার থেকেও এ ঘটনার দ্রুত বিচার দাবি করা হয়েছে। দেশজুড়ে এখনো এই হত্যার বিচার দ্রুত করার দাবি অব্যাহত রয়েছে। এমনকি জাতীয় সংসদেও দ্রুত বিচার আইনে মামলাটির বিচার নিষ্পত্তির দাবি জানিয়েছেন সংসদ সদস্যরা।
আইনজ্ঞরা অবশ্য এই মামলার দ্রুত বিচার হওয়াকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাদের মতে, দ্রুত বিচার হলে একটি উদাহরণ সৃষ্টি হবে যে, এ ধরনের অপরাধের কোনো ক্ষমা নেই এবং এসব অপরাধীর শাস্তির ব্যাপারে সবাই একাট্টা।
সেক্ষেত্রে নুসরাত হত্যার বিচার তিনভাবে করার পক্ষে মত দিয়েছেন আইনজ্ঞরা। তাদের মতে, প্রচলিত ফৌজদারি আইন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল বা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার হতে পারে। তবে সরকারের উচিত হবে দ্রুত বিচার করা।
এর মধ্যে আইন অনুযায়ী দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নির্ধারিত ৯০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করতে হবে। এই সময়ের মধ্যে বিচারকাজ শেষ করা সম্ভব না হলে বাড়তি ৩০ দিন সময় নেওয়া যায়। মোট এই ১২০ দিনের মধ্যেও কোনো কারণে বিচার শেষ না হলে এরপর আর মাত্র পনের দিন সময় নেওয়া যাবে। আইনজ্ঞরা বলছেন, এই আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-।
এ ব্যাপারে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেভাবেই হোক লক্ষ্য রাখতে হবে দ্রুত বিচারের দিকে। চার্জশিট পাওয়ার পর সরকারি প্রসিকিউশনকে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করতে হবে। এ মামলার বিচার বিচারিক আদালতেই, অর্থাৎ প্রচলিত ফৌজদারি আইনে সম্ভব। সেক্ষেত্রে দুই মাসেই মামলা নিষ্পত্তি হতে পারে। দেশে মামলাগুলোর বিলম্ব হওয়ার মূল কারণ, সাক্ষী আনতে না পারা। এ মামলায় কিন্তু সে সমস্যা নেই। সবকিছুই তৈরি। এমনকি উচ্চ আদালত এই মামলার তদন্তে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তা ছাড়া এ মামলায় কারও গাফিলতি করার সুযোগ নেই। কারণ সবার নজর এর দিকে। তারপরও সরকার যদি মনে করে তা হলে দ্রুত বিচার আইনে স্থানান্তর করতে পারে। তবে সবার লক্ষ্য থাকতে হবে দ্রুত বিচারের দিকে।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়–য়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, মামলার দ্রুত বিচার হলে একটা উদাহরণ সৃষ্টি হবে। এ ধরনের অপরাধ করলে যে শাস্তি পেতে হয়, সেটা জানবে সবাই। সরকার চাইলে ইন্টারনাল নির্দেশে এ মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করতে পারে। ট্রাইব্যুনাল গঠন করা আছে, তবে যেভাবেই করুক বিচার দ্রুত হতে হবে।
এ ব্যাপারে মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট সালমা আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাংলাদেশে একের পর এক নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেই চলেছে। কর্মক্ষেত্রে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমনকি বাসেও প্রতিনিয়তই নারীরা যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে অপরাধীদের বিচার হলেও অনেক ক্ষেত্রেই বিচারের দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। আদালতে ভুক্তভোগীদের আসামিপক্ষের আইনজীবীদের জেরার মুখে হেনস্তাও হতে হয়। সাক্ষীর অভাব, হয়রানির ভয়ে মামলা না করাসহ নানা কারণে অপরাধীর বিরুদ্ধে মুখ খোলে না ভুক্তভোগী নারী। এতে করে পার পেয়ে যায় অপরাধীরা। তাই অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে। তবেই ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির মতো জঘন্য ঘটনা রোধ করা সম্ভব। এক্ষেত্রে সামাজিক আন্দোলনের পাশাপাশি গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
এই দুই আইনজ্ঞ এবং মানবাধিকারকর্মী বলেন, নুসরাতের মৃত্যুকালীন ঘোষণা বা ডাইং ডিক্লারেশন এবং সিরাজ-উদ-দৌলা আরও কীভাবে যৌন নির্যাতন করতেনÑ নুসরাতের খাতায় সেগুলো লিখা রয়েছে। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট। সেই সঙ্গে আইনবহির্ভূতভাবে শ্লীলতাহানির শিকার নুসরাতের ভিডিও ধারণ করায় ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের ২৬ ধারা অনুসারে ফৌজদারি অপরাধ করেছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন। তাকেও আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদসহ তার অপরাধের বিচার করতে হবে।
তারা আরও বলেন, নুসরাতের শ্লীলতাহানির ঘটনা, ঘটনার পরবর্তী পরিকল্পনায় আগুনে পুড়িয়ে হত্যা, এসবের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তি ও মহল, দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কিত অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাসহ ওইসব অপরাধীর সামাজিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিকসহ খোদ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সোনাগাজী ফাজিল মাদ্রাসার কে বা কারা আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে এসব ডকুমেন্টও জনগণের মুখে মুখে। তাই নুসরাত হত্যা মামলার আসামিদের শাস্তি নিশ্চিত করতে ৩০ দিনই যথেষ্ট। কালক্ষেপণ না করে, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে ধর্ষক-খুনিদের ফাঁসি নিশ্চিত করে অপরাধ প্রবণতারোধে সরকারের কঠোর বার্তা ছড়িয়ে দিতে হবে।