বিলস-এর গবেষণা প্রতিবেদন

পাঁচ বছরে নির্যাতনের শিকার ১৪৯ গৃহশ্রমিকের মৃত্যু

দেশে ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সময়ে নির্যাতনের শিকার হয়ে ১৪৯ জন গৃহশ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছে আরও ১৪৮ জন। আর এসব গৃহশ্রমিকের একটি বড় অংশই হলো নারী ও শিশু। তবে গৃহশ্রমিকদের ওপর নির্যাতনের অধিকাংশ ঘটনাই থেকে যায় আড়ালে। শুধুমাত্র আলোচিত কিছু ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় বলে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) এক গবেষণায় দেখা গেছে।

সম্প্রতি গৃহশ্রমিকদের ওপর নির্যাতনবিষয়ক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিলস। ওই গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্য

 অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সময়ে নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে ১৪৯ জন গৃহশ্রমিক। একই সময়ে নির্যাতনের শিকার হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে আরও ১৪৮ গৃহশ্রমিক। আলোচিত সময়ের মধ্যে ২০১৮ সালে নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা যায় ১৮ গৃহশ্রমিক, আহত হয় ১৮ জন। এছাড়া আত্মহত্যা করে আরও চারজন। এর আগের বছর ২০১৭ সালে নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা যায় ২৭ গৃহশ্রমিক ও আহত হয় ২৩ জন। তারও আগের বছর ২০১৬ সালে নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করে ৩৮ গৃহশ্রমিক, আহত হয় ২৩ জন। দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এই গবেষণাটি পরিচালনা করে বিলস। হতাহত গৃহকর্মীদের অধিকাংশই গৃহকর্তা বা গৃহকর্ত্রীর নির্যাতনের শিকার হয় বলে এই গবেষণায় দেখা গেছে।

বিলসের পরিচালক নাজমা ইয়াসমিন এই গবেষণায় পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিভিন্ন এলাকায় নির্যাতনের কারণে কোনো গৃহকর্মীর মৃত্যু হলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু বা আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া গৃহকর্তা ওই ঘটনা অর্থের বিনিময়ে ধামাচাপা দিয়ে ফেলেন বা সমস্যা মিটিয়ে ফেলেন। ফলে নির্যাতিত ব্যক্তির পরিবারকে গ্রামে ফিরে যেতে হয় খালি হাতে। আর গৃহকর্মীর নির্যাতনপরবর্তী মৃত্যুর ঘটনাগুলো অপমৃত্যু হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হয়। ওইসব মামলার তদন্ত পরবর্তীকালে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের দোহাই দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয় বছরের পর বছর। এছাড়া ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনেও করা হয় নানা কারসাজি।’

গৃহশ্রমিক নির্যাতনের ঘটনাগুলো ধামাচাপা পড়ার পেছনে গৃহকর্মীদের আর্থিক অসচ্ছলতা এবং দুর্বল সামাজিক অবস্থান কারণ হিসেবে কাজ করে জানিয়ে বিলস পরিচালক আরও বলেন, ‘নির্যাতনের ঘটনাগুলো প্রভাবশালীরা অর্থের বিনিময়ে চাপা দিয়ে ফেলেন। তাছাড়া গৃহকর্মীরা সাধারণত ওই প্রভাবশালীদের গ্রামের বাড়ির আশপাশের হয়ে থাকেন। তাই সামাজিক অবস্থানের কারণে নির্যাতনের পর তারা সমঝোতায় যেতে বাধ্য হন।’

গৃহশ্রমিক নির্যাতন পরিস্থিতির বর্তমান এই চিত্র পাল্টানোর জন্য সরকারের প্রতি বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরেন নাজমা ইয়াসমিন। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ফলে সরকার ২০১৫ সালে গৃহশ্রমিকদের সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা করলেও আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকায় সেই নীতিমালার বাস্তবায়ন নেই। তাই গৃহশ্রমিকদের নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও অধিকার আইন প্রণয়ন করা খুব জরুরি। তবে শুধু আইন করলেই হবে না, দ্রুত তা বাস্তবায়নও করতে হবে। অন্যদিকে গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা বাস্তবায়নে জড়িত সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিভাগীয় পর্যায়ে আলাদাভাবে মনিটরিং সেল করে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে নির্যাতিতের পরিবারকে ধৈর্যহারা না হয়ে সঠিক বিচার পাওয়ার পথে এগিয়ে যেতে হবে।’