গৃহকর্মী সুরক্ষায় চাই আইনি বাধ্যবাধকতা

গৃহকর্তার নির্যাতন থেকে নিজের জীবন বাঁচাতে ১১ তলার ছাদ থেকে পাইপ বেয়ে পালানোর চেষ্টা করছিল গৃহকর্মী শাওন। পথচারী এক ব্যক্তির কাছ থেকে ফোন পেয়ে পুলিশ এসে শাওনকে উদ্ধার করলে জানা যায়, গৃহকর্তাসহ একাধিক ব্যক্তি শাওনকে নির্যাতন করতেন। কখনো রড দিয়ে, কখনো বৈদ্যুতিক কেব্ল দিয়ে তাকে পেটানো হতো, তার সারা গায়ে ছিল মারধরের নানা আঘাতের চিহ্ন। ঘরের কাজ করানোর পাশাপাশি পড়াশোনা করানোর কথা বলে চাঁদপুরের এক গ্রাম থেকে নিয়ে এসে ১২ বছরের শিশু শাওনকে নির্মম নির্যাতনের এই ঘটনাটি ঘটে গত বছরের জুন মাসে রাজধানীর ইস্কাটনের এক বহুতল ভবনের ফ্ল্যাটে। একই বছরের জুলাইয়ে রাজধানীর উত্তরায় গৃহকর্তার নির্যাতন থেকে বাঁচতে পালাতে গিয়ে ৬ তলার ছাদ থেকে পড়ে নিহত হয়েছিল কিশোরী সুরভী। তার আগে চট্টগ্রামে নির্যাতনের পর পালাতে গিয়ে ৮ তলার ছাদ থেকে পড়ে মারা গিয়েছিল কলি নামের আরেক কিশোরী গৃহকর্মী। গণমাধ্যমে প্রকাশিত এসব খবর থেকে গৃহকর্মী নির্যাতনের ভয়াবহতার আঁচ পাওয়া গেলেও এর ব্যাপকতা হয়তো আমাদের অগোচরেই থেকে যায়। 

সম্প্রতি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ-এর গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে নির্যাতনের শিকার হয়ে ১৪৯ জন গৃহশ্রমিক নিহত হয়েছে এবং গুরুতর আহত হয়েছে আরও ১৪৮ জন। হতাহত গৃহশ্রমিকের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। গবেষণা প্রতিবেদন অনুসারে, কেবল ২০১৮ সালেই নির্যাতনের শিকার হয়ে নিহত হয়েছে ১৮ গৃহশ্রমিক এবং গুরুতর আহত হয়েছে আরও ১৮ জন, এছাড়া নির্যাতনের কারণে আত্মহত্যা করেছে আরও ৪ জন। ২০১৭ সালে নির্যাতনের শিকার হয়ে নিহত হয়েছে ২৭ জন এবং আহত হয়েছে আরও ২৩ জন। ২০১৬ সালে নির্যাতনের শিকার হয়ে নিহত হয়েছে ৩৮ জন এবং আহত হয়েছে ২৩ জন। বলাবাহুল্য এই পরিসংখ্যান কেবল নির্যাতনে নিহত ও গুরুতর আহতদের, কিন্তু গৃহশ্রমিকদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়নের ঘটনার প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি বলেই ধারণা করা যায়। 

বাংলাদেশে গৃহকর্মীদের বেশিরভাগই নারী ও কন্যাশিশু। তবে, গৃহকর্মীদের নিয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান না থাকায় এ নিয়ে স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হিসাবে তারতম্য রয়েছে। দেশের বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠনের দাবি, এই সংখ্যা ন্যূনতম ৫ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ২০ লাখও হতে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার হিসাবে বাংলাদেশে গৃহশ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৩২ লাখ। এরমধ্যে শিশু গৃহকর্মীর সংখ্যা ৪ লাখ ২০ হাজার, যাদের ৭৫ ভাগই কন্যাশিশু বলে মনে করে সংস্থাটি।

২০১৫ সালে সরকার ‘গৃহশ্রমিকদের সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা’ প্রণয়ন করে। পাশাপাশি এখন প্রতি বছর ১৬ জুন আন্তর্জাতিক ‘গৃহশ্রমিক  দিবস’ হিসেবে  পালিত হচ্ছে। গৃহকর্মী সুরক্ষা নীতিমালা অনুসারে ১৪ বছরের কম বয়সীদের গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাবে না এবং পূর্ণকালীন একজন গৃহকর্মীর মজুরি এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে, যাতে সে তার পরিবারসহ সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারে।  নীতিমালা  অনুযায়ী প্রত্যেক গৃহকর্মীর কর্মঘণ্টা এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে, যাতে তিনি পর্যাপ্ত  ঘুম, বিশ্রাম, চিত্তবিনোদন  ও প্রয়োজনীয় ছুটির সুযোগ পান।  অসুস্থ অবস্থায় কোনো গৃহকর্মীকে দিয়ে কাজ করানো যাবে না এবং নিয়োগকারীকে গৃহকর্মীর চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে হবে।  গৃহকর্মীদের সঙ্গে কখনোই অশালীন আচরণ, দৈহিক বা মানসিক নির্যাতন করা যাবে না। এছাড়া গৃহকর্মীকে চাকরি থেকে অপসারণ করতে হলে এক মাস আগে জানাতে হবে কিংবা তাৎক্ষণিকভাবে চাকরিচ্যুত করলে এক মাসের মজুরি দিতে হবে।

২০১৭ সালে উচ্চ আদালত ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা’ অনুসারে গৃহকর্মীদের অধিকার রক্ষিত হচ্ছে কি না তার নরজদারির জন্য একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয় সরকারকে। সে আলোকে বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিসহ ২২ সদস্য বিশিষ্ট একটি ‘মনিটরিং সেল’ গঠনও করা হয়, যার চেয়ারম্যান শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী। কিন্তু এই মনিটরিং সেলের কর্মকাণ্ডের কোনো সুফল দৃশ্যমান নয়। এই অবস্থায় এই কল্যাণ নীতিমালার প্রয়োগ ও বাস্তবায়নের জন্য বিশেষত শহরাঞ্চলগুলোতে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোর কাউন্সিলর বা এমন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাজে লাগিয়ে মাঠ পর্যায়ে বিস্তুত কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে, গৃহকর্মী নির্যাতন বন্ধ করতে হলে কঠোর শাস্তির বিধানসহ এই সুরক্ষা নীতিমালাকে আইনি বাধ্যবাধকতার আওতায় আনতে হবে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি যেটা প্রয়োজন তা হলো, নাগরিকদের মধ্যে সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিকতার বোধ জাগ্রত করা।