ইস্টার সানডের দিনে আত্মঘাতী হামলার পেছনে স্থানীয় মুসলিমদের হাত রয়েছে এমনটা ভাবতে পারেননি শ্রীলঙ্কার সাধারণ জনগণ। কীভাবে একটি ছোট গ্রুপ এত বড় হামলার পরিকল্পনা করেছিল সবার চোখের অন্তরালে তা অবাক হওয়ার মতোই ঘটনা।
চলতি বছরের মধ্য জানুয়ারিতে শ্রীলঙ্কা পুলিশ ১০০ কেজি বিস্ফোরক এবং ১০০টি ডেটোনেটর খুঁজে পায় উইপাত্তু জাতীয় উদ্যানের একটি নারকেল গাছের নিচে। পুলিশ ওই ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে চার ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছিল। এর তিন মাস পরেই সন্দেহভাজন ইসলামিপন্থিরা কলম্বোর তিনটি গির্জা এবং তিনটি হোটেলে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালায়।
নারকেল গাছের তলা থেকে বিস্ফোরক উদ্ধার কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বোমা হামলার আগে দেশটিতে যতগুলো সন্দেহজনক ঘটনা ঘটে এরমধ্যে এটি অন্যতম। বিশেষ করে ওই সময় দেশটির গোয়েন্দা সংস্থার কাছে রিপোর্ট ছিল যে, সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেটের হয়ে যুদ্ধ শেষে কয়েকজন শ্রীলঙ্কায় ফিরেছে।
২০০৯ সালে গৃহযুদ্ধ শেষ পরবর্তী সামাজিক বাস্তবতার পেছনে রয়েছে ইস্টার সানডেতে হামলার ঘটনার সূত্রপাত। গৃহযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে দেশটিতে স্থানীয় মুসলিমদের ওপর বেশ কয়েকবার হামলার ঘটনা ঘটে। গোয়েন্দা রিপোর্টে বলা হয়, ওই সময় শ্রীলঙ্কার কিছু মুসলিম পরিবার উগ্রপন্থায় ঝুঁকে পড়ে। সন্ত্রাসবাদবিরোধী নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গবেষক বলেন, শ্রীলঙ্কায় মুসলিমদের ওপর হামলার ওই সময় কিছু মুসলিম পরিবার নিজেদের মধ্যে গোপনে যোগাযোগের মাধ্যমে একটি বিশাল নেটওয়ার্কের জন্ম দেয়। আদর্শিক জায়গা থেকেই পরিবারটি সকল তথ্য গোপনীয়তার সঙ্গে বিনিময় করত সদস্যদের মধ্যে। আর এ কাজে তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করে। তদন্ত কর্মকর্তারা এখন পরীক্ষা করে দেখছেন কীভাবে ওই পারিবারিক নেটওয়ার্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করত।
আনুমানিক ৭০ জন ব্যক্তি এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এদের অনেককে এরইমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু এটা বিশ্বাস করা যাচ্ছে না যে, পারিবারিক এই নেটওয়ার্কটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। হামলার পরিকল্পনাকারীরা এবং বোমা প্রস্তুতকারীরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। শ্রীলঙ্কা সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মতে, আত্মঘাতী বোমা হামলাকারীরা ছিল নেটওয়ার্কের দ্বিতীয় সারির ক্যাডার।
প্রচলিত আত্মঘাতী সন্ত্রাসবাদের নিয়ম অনুসারে একজন আত্মঘাতী বোমা হামলাকারীর অন্তত পাঁচজন সহযোগীর দরকার হয়। সেই হিসেবে এখনো ৪৫ জন সহযোগী রয়েছে যাদের সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই শ্রীলঙ্কা সরকারের কাছে।
গৃহযুদ্ধের সময় তামিল বিদ্রোহীদের হাতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলিম নির্যাতনের শিকার হয়। দেশটির উত্তরাঞ্চল থেকে প্রায় ৭৫ হাজার মুসলিমকে তাড়িয়ে দেওয়া হয় ১৯৯০ সালের দিকে। ওই বছর একটি মসজিদে হামলায় অন্তত দেড়শ মানুষ মারা যায়। এরপর অনেক মুসলিম শ্রীলঙ্কার নিরাপত্তা বাহিনীতে যোগ দেয়। গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুসারে ওই মুসলিমরা সিংহলিজ এবং তামিল ভাষায় পারদর্শী। শ্রীলঙ্কা সরকার যখন তামিল টাইগারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ব্যস্ত ছিল তখন খুব গোপনে উগ্রপন্থি মুসলিমদের একটি দল দেশটির মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে কাজ করতে শুরু করে।
কাত্তানকুড়ির ফেডারেশনস অব মস্কস-এর কর্মকর্তা মাজুক আহমাদ লেব্বে বলেন, গৃহযুদ্ধের সময় ওহাবি মতাদর্শ প্রবেশ করে শ্রীলঙ্কায়। এসময় বিপুল পরিমাণ অর্থ আসে দেশের বাইরে থেকে। কাত্তানকুড়ির জনসংখ্যা ৪৭ হাজার। এই শহরের হাতেগোনা কয়েকটি দোকানে মাত্র বোরকা বিক্রি হয়। শহরটিতে ৬০টি মসজিদ তৈরি হয় প্রায় রাতারাতি।
এমন একটি মসজিদেই মোহাম্মাদ জাহরান হাশিম তার উগ্রপন্থা প্রচারের জায়গা হিসেবে বেছে নেন। তাকে ধর্মীয় শিক্ষার জন্য স্কুলে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু শিক্ষকদের সঙ্গে বাদানুবাদের কাছে ‘সত্যিকারের ইসলাম’ অনুসরণের কথা বলে সে বের হয়ে যায় স্কুল থেকে। তখন হাশিম দারুল আতহার নামে একটি গ্রুপ তৈরি করেন, যা থেকে পরে ন্যাশনাল তাওহিদ জামায়াত (এনটিজে) গঠিত হয় ২০১৪ সালে। তৎকালীন সময়ে এনটিজে বিদেশি বিনিয়োগ, বিশেষত মধ্যপ্রাচ্য, ভারত এবং মালয়েশিয়া থেকে আনতে সমর্থ হয়। ওই অর্থ দিয়েই হামলার ক্ষেত্র তৈরিতে পরিকল্পনা শুরু করা হয়।
২০১৭ সালে এনটিজের সদস্যদের সঙ্গে স্থানীয় সুফিপন্থিদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। তখন জাহরানের বাবা এবং দ্বিতীয় ভাইকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু জাহরান ও তার আরেক ভাই রিলওয়ান লুকিয়ে থাকে। গোপন স্থান থেকেই তিনি ভিডিও ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবিশ্বাসীদের উদ্দেশে ঘৃণিত বক্তব্য দিতে শুরু করে। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মতে, জাহরানের পুরো পরিবার এই নেটওয়ার্কের কেন্দ্রে অবস্থান করছিল এবং শ্রীলঙ্কার মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা থেকে উগ্রপন্থায় বিশ্বাসী মুসলিম তরুণদের সংগঠিত করছিল। সূত্র : বিবিসি