বাসের চালক-সহকারীরা মিলে চলন্তবাসে নারীযাত্রীকে দলবেঁধে ধর্ষণ করে মেরে ফেলার ঘটনা আমাদের দেশে এখন যেন নতুন একটা ‘রীতি’তে পরিণত হয়েছে। কয়েকদিন পর পরই এমন ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী থেকে বাজিতপুরের পিরিজপুর বাসস্ট্যান্ড যাওয়ার পথে যাত্রীবাহী বাসে শাহিনুর আক্তার নামে ঢাকার ইবনে সিনা হাসপাতালের নার্সকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। দেশে আকস্মিকই ধর্ষণের ঘটনা আবার বেড়ে গেছে। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবর মতে, মাত্র ৮ দিনে ৪১ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, তাদের মধ্যে ৩ জনের মৃত্যু ঘটেছে। এ যেন ধর্ষণের মহামারী!
এ দেশে ধর্ষণের হাত থেকে প্রাপ্তবয়স্ক নারী, গৃহবধূ, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী থেকে শুরু করে পাঁচ বছরের মেয়েশিশু পর্যন্ত কেউই রেহাই পাচ্ছে না। আর ধর্ষকের তালিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, মাদ্রাসার অধ্যক্ষ, শিক্ষার্থী, ভবঘুরে, চাকরিজীবী, বেকার, মজুর, নিম্নবিত্ত বাসের ড্রাইভার-হেলপার থেকে শুরু করে কিশোররাও রয়েছে।
নিজেদের বিকৃত লালসা চরিতার্থ করতে কিছু লোক দলবদ্ধভাবে নারী ধর্ষণ করছে কিছুদিন পরপর এমন খবর সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। এর কোনো প্রতিকার হচ্ছে না। এসব জঘন্য অপরাধীর বিচার ও শাস্তির খবরও তেমন পাওয়া যায় না। ফলে সমাজে এমন এক বিচারহীনতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে তাতে করে ধর্ষণের প্রবণতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। অথচ এর কোনো প্রতিকার হচ্ছে না। না গড়ে উঠছে সামাজিক প্রতিরোধ, না শক্ত হচ্ছে আইনি প্রতিকার।
আমাদের দেশের মানুষ ধর্মের ব্যাপারে অতিমাত্রায় সংবেদনশীল। কিন্তু নারীদের ব্যাপারে যারপরনাই অসংবেদনশীল। নারীবিরোধী একটা প্রবল মানসিকতা আমাদের সমাজে লক্ষ করা যাচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ পুরুষ যেন এখনো নারীকে কেবল ‘ভোগ্য’ বলেই মনে করে। তারা চোখের সামনের সকল নারীকেই ‘ভোগ’ করতে চায়। এই ‘ভোগ’ করতে চাওয়া আর তা করতে না পারার জন্য ব্যক্তিগত ক্ষোভ-রোষ গিয়ে জমা হয় নারীর প্রতি। তাইতো দেখা যায় আমাদের দেশের পুরুষরা নারীকে অপমান-অপদস্থ আর হয়রানি করে আনন্দ পায়।
ধর্ষণের ঘটনায় অপরাধী কেবল ধর্ষক নয়। প্রকৃত অপরাধী এ সমাজ। যে সমাজ পুরুষকে শেখায় পুরুষই শ্রেষ্ঠ, পুরুষই বলিষ্ঠ। আর নারীকে কেবলই ধৈর্য, শালীনতা ও কমনীয়তার জ্ঞান বিতরণ করে। এই সমাজে এখনো স্বামীর নাম ধরে ডাকার চল নেই! যে সমাজে স্কুলে কিশোর-কিশোরীদের কোনো যৌনশিক্ষা দেওয়া হয় না, যৌনতা নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনাও পাপ হিসেবে ধরা হয়। সেই সমাজ কেমন করে নারীকে সুরক্ষা দেবে? সেই সমাজ কীভাবে শেখাবে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল প্রাণই অমূল্য! আসলে গলদ আমাদের শিক্ষায়, মানসিকতায়, নারী ও পুরুষ সম্পর্কে আমাদের প্রথাগত ধারণায়।
নারী নির্যাতন বা ধর্ষণের বিচার না হওয়াটা কেবল আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত সমস্যা নয়, এটা আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের গভীর এক অসুখ। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ মেয়েদের যৌনবস্তু ছাড়া অন্য কোনো কিছু ভাবতে নারাজ। সমাজে এখনো বেশিরভাগ পুরুষই মনে করে যে, মেয়েরা দুই প্রকার (ছোটবেলায় বিজ্ঞান বইতে যেমনটি পড়েছিলাম, জীব দুই প্রকার, প্রাণী আর উদ্ভিদ; ঠিক সেই রকম)! যথা ১. ভালো মেয়ে; এরা বাড়ির কাজ করে, সন্ধ্যার পর একা বাড়ির বাইরে বেরুনো এদের কাছে মহাপাপ, এরা স্বামী-শ্বশুরের খিদমত খাটে, ‘বাচ্চা দেয়’, আর ‘স্বামীর সেবা’ করে। ২. আরেক রকম ‘মেয়েছেলে’ আছে; এরা চাকরি-বাকরি করে, সন্ধ্যায় কিংবা রাতে এরা একা বা কয়েকজন মিলে বাড়ির বাইরে যায়, আড্ডা মারে, মার্কেটে ঘুরে বেড়ায়, ‘খারাপ কাপড়’ বা ‘জিন্স’ পরে। এদের কারণেই নাকি ছেলেরা ‘নষ্ট’ হয়, নানারকম পাপাচারে লিপ্ত হয়!
এমনকি যারা ‘সমানাধিকার’-এ বিশ্বাস করেন বলে দাবি করেন, তাদের অন্তঃকরণ জুড়েও কি আছে পাপ, আছে দ্বিধা, আছে যুক্তিবোধের অভাব? নইলে তারাও কী করে শেষ পর্যন্ত বলে ফেলেন, কী দরকার এসব পোশাক পরার? ‘প্রভোক’ করার? রাত-বিরেতে বাইরে না বেরুলেই কি নয়? আমাদের মন-মানসিকতা, চিন্তাভাবনা, শিল্পসংস্কৃতি জুড়ে রয়েছে পুরুষের বাহাদুরি আর নারীর ওপর জোর-জুলুম চালানোর অভিপ্রায়। এখানকার সিনেমা-নাটকে দেখানো হয়, প্রেমের ক্ষেত্রে ‘বিরক্ত করে যাও, এক সময় ঠিকই পাবে’! এটা দেখানো মানে একটি মানুষের মৌলিক অধিকারের কথা বিস্মৃত হয়ে, তার ওপরে নিজ আকাক্সক্ষার ভার ও দায় চাপিয়ে দেওয়া। এর মধ্যে রয়েছে নিজেকে অতিরিক্ত গুরুত্ব প্রদান করবার ও অন্যের ব্যক্তিত্বকে অবজ্ঞা করবার বার্তা। নারীকে দেখে পুরুষের ভালো লাগতেই পারে, এবং নারীটিকে না পেয়ে তার হৃদয়ে প্রবল বেদনা জন্মাতেই পারে, কিন্তু নারীটির তাকে না-ভালোবাসবার অধিকারকে শ্রদ্ধা না করলে সেই প্রেম ও জুলুমের পার্থক্য থাকে না। ওই প্রেমকে মহিমান্বিত করবার অর্থ এক প্রকার পুং-গুন্ডামিকে প্রশ্রয় দেওয়া ও প্রশংসায় রঞ্জিত করা। এমনকি, নারীকে নির্যাতন করবার সাফাই রচনা। আমাদের দেশের সিনেমা-নাটকে যুগ যুগ ধরে এমনটাই দেখানো হচ্ছে।
পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার সন্ত্রাসের জগতে নিজেকে রক্ষা করে বাঁচাটাই নারীর জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। সে জগতে পুরুষের প্রতিপক্ষে একা নারী, নারীর মন সেখানে অস্বীকৃত-উপেক্ষিত, কেবল আছে নারীর শরীরটুকু আর তাকে ঘিরে আদিমতার উল্লাস। ভোগের সেই উৎসবে শামিল শত-সহস্র-লক্ষ জন। নইলে ব্যক্তিগত শারীরিক লালসা থেকে পারিবারিক বিবাদের আক্রোশ পর্যন্ত যে-কোনো পরিস্থিতিতেই হামলার সহজ শিকার নারী, প্রতিশোধস্পৃহার সহজ নিবৃত্তি ধর্ষণ কেন? এই হিংস্রতার শিকার হতে হয় কখনো ধনীর দুলালিকে, কখনো নিরীহ গৃহবধূকে, কখনো হতদরিদ্র বালিকাকে। আবার কখনো আট-নয় বছরের স্কুল ছাত্রীকে, মূক-বধির তরুণীকে, এমনকি দুই-তিন বছরের শিশুকন্যাকেও, কারোরই নিস্তার নেই।
ধর্ষণের পরেও থাকে চরিত্র হননের আরেক রকম ধর্ষণ। তাই পুরুষের সঙ্গে সমান আগ্রহে পুরুষের চিন্তা দিয়ে গড়া নারীরাও ধর্ষিতার পেশা, জীবনযাত্রা, প্রেম-ভালোবাসা-দাম্পত্যের সুলুকসন্ধান করেন এবং শেষ পর্যন্ত নারীটিকে অভিযুক্ত সাব্যস্ত করে যেন মহাস্বস্তির কাক্সিক্ষত শ্বাস ফেলেন! তারা যে আসলে পুরুষতন্ত্রেরই মুখ, পিতৃশাসনেরই স্বর, এ কথা বুঝি নিজেরাও বোঝেন না।
এদিকে একদল আবার বই লিখছে, মেয়ে হয়ে জন্মালে কী কী করতে হবে, কোথায় কোথায় যাওয়া বারণ, কোন ধরনের জামাকাপড় পরা বারণ। অন্যথায়, কী কী আচরণ করলে পুরুষের খুবলে খাওয়া সহ্য করতে হবে! এর বাইরেও অনেকে আছেন, যারা সব জানেন, বোঝেন, মানেন, কিন্তু আদতে তারা ভয়ানক ভীতু। কখনো যুক্তি কিংবা পেশি নিয়ে দাঁড়াতে চান না।
যখন শহুরে কর্মজীবী নারীর পুরুষ সহকর্মীর কামনার কাছে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া কোনো বিকল্প থাকে না, তখন দু’মুঠোয় শূন্যতাকেই কেবল আঁকড়ে ধরতে ইচ্ছে হয়। ফলে মেয়েরা কেবলই ক্ষয়ে যায়, একটু একটু করে গর্তে ঢুকে যায়। সচেতন সোচ্চার হয়েও সামগ্রিক বৈরিতায় আবার গতানুগতিকতার জলে গা ভাসায়। প্রশ্ন হলো, আর কতদিন এভাবে রঙিন কাচের আড়ালে, মুখোশ পরে, সমস্ত পরিস্থিতি এড়িয়ে, গা বাঁচিয়ে চলব আমরা? আমাদের দেশে মশা আছে, রয়েল বেঙ্গল টাইগার আছে, দারিদ্র্য ও দূষণও আছে। এসব তো অনেকদিন থেকেই আছে। আমাদের চেকলিস্টে নতুন সংযোজন ‘রেপ’ এবং ‘গ্যাং রেপ’। আসলে আমরা মনে করি, আমাদের ঘরে আগুন না লাগলেই হলো। অন্যরা আগুনে পুড়ে গেলে কী আর করব, শৌখিন মধ্যবিত্তরা ‘আহা-উহু’র আপডেট দেব ফেসবুকে, ট্যুইট করব নিজের ফিলিংস। পারলে ইন্সটাগ্রামে একটি ছবি আপলোড করব, ব্যস। খেল খতম, পয়সা হজম।
দেশে কি আর মানুষ নেই? হ্যাঁ, ‘মান’ আর ‘হুঁশ’যুক্ত প্রাণীদেরই তো মানুষ বলা হয়। আমাদের সমাজে একেবারেই হাতেগোনা কিছু মানুষ তো এখনো রয়েছে। আমরা বাকিরা বোধহয় নেহাতই ‘পুরুষ’ নামক প্রাণী, কিংবা কেবলই অসহায় ‘নারী’! আমরা কবে নড়েচড়ে উঠব? মনুষ্যত্বের ওপর কালিমা লেপন করা এই জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে কবে রুখে দাঁড়াব? এভাবে একের পর এক নারী ধর্ষণ, শিশু ধর্ষণ আর দলবদ্ধ ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার মচ্ছব চলতে থাকবে আর আমরা কেবলই সমাজবদ্ধ জীব নাম নিয়ে এক মহাকালিক নীরবতার ব্রত পালন করে যাব?