জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত রাজনীতিকরা দেশসেবার শপথ গ্রহণকারী। তেমনি প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে জনগণের সেবায় সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের জন্য আমলারা অঙ্গীকারবদ্ধ। অবশ্য তাদের কর্মপরিধি ও দায়িত্ব ভিন্নতর। কিন্তু কালের অভিজ্ঞতায় জনগণের কাছে দুই পক্ষেরই নতুনতর বাস্তব পরিচিতি হয়েছে নিজ নিজ স্বভাবগুণে। সাধারণ মানুষ জানে, রাজনীতিকদের প্রতিশ্রুতি সর্বদাই ভবিষ্যৎকালবাচক, ফলে তারা এটাও জানেন যে, সুদূর ভবিষ্যতের কোনো আশা অদূর ভবিষ্যতে করে লাভ নেই। অন্যদিকে, আমলাদের কর্মনীতি সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ‘লালফিতার দৌরাত্ম্য’ কিংবা ‘উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি’ কথাগুলো প্রবাদে পরিণত হয়েছে। দেশের মানুষ জানে কখন কোথায় কেন কাজ আটকে থাকে, আর কখন কোথায় কেন অনর্থক ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়া হয়। মানুষ জানে কিছু ‘কমিটির’ প্রতিবেদন কখনোই আলোর মুখ দেখে না আর কিছু ‘কমিটি’ সব সময়ই দায়সারা প্রতিবেদন দিয়ে দেয়।
যেমন বিগত বছরগুলো বর্ষায় রাজধানী ঢাকা মহানগর, চট্টগ্রাম মহানগর এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে মারাত্মক জলাবদ্ধতার অবর্ণনীয় জনদুর্ভোগের পরও মন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি আর আমলাদের তিন তিনটি কমিটির নামকাওয়াস্তে প্রতিবেদন ছাড়া আর কিছুই জোটেনি মানুষের। ২০১৭ সালের ওই জলাবদ্ধতার পর তৎকালীন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘আমি প্রমিজ করছি সামনের বছর থেকে আর এসব (জলাবদ্ধতা) দেখবেন না। এই পরিস্থিতি আমাদের শিক্ষা দিচ্ছে। আমরা বুঝতে পারছি কোন জায়গায় আটকা পড়ছি। সে জায়গায় দ্রুত ব্যবস্থা নেব।’ কিন্তু মন্ত্রীর নির্দেশে স্থানীয় সরকার বিভাগ ওয়াসা ও সিটি করপোরেশন আইন পর্যালোচনা করে যুগোপযোগী করা এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বয় করার জন্য একটি ‘উচ্চ পর্যায়ের কমিটি’ করলেও তাতে কোনো লাভ হয়নি।
এক মাসের জায়গায় ছয় মাস পর ওই কমিটির দেওয়া প্রতিবেদনকে ‘অন্তঃসারশূন্য’ বলছেন সংশ্লিষ্টরাই। এর পর গত বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মহানগরীরর জলাবদ্ধতা নিরসনে সুপারিশমালা প্রণয়নের জন্য ১৩ সদস্যের আরেকটি কমিটি গঠন করা হয়। দীর্ঘ সময়ে কয়েকটি সভা করে ওই কমিটিও আরেকটি ‘দায়সারা’ প্রতিবেদন দাখিল করে মাত্র। একই বছরের ৯ মে গঠন করা হয় আট সদস্যের আরেকটি ‘অপারেশন কমিটি’। তৃতীয় এই কমিটিও পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিজিলেন্স টিম গঠন এবং সংশ্লিষ্ট তিনটি সংস্থার অর্থ ব্যয় করার সুপারিশ করেই দায়িত্ব শেষ করেছে। লাগাতার এই ব্যর্থতার কারণ হিসেবে কমিটির নেতৃস্থানীয় সদস্যরা অবশেষে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ‘নন টেকনিক্যাল’ লোকজন দিয়ে স্থায়ী সমাধানের পথ খোঁজা যাবে না।
দেশের প্রধান তিনটি সিটি করপোরেশন এলাকায় জলাবদ্ধতা নিরসনে গঠিত পরপর তিনটি কমিটির অভিজ্ঞতা থেকে আমলারা অবশেষে এই উপলব্ধিতে পৌঁছাতে পেরেছেন। উপরোক্ত পরিস্থিতিকে যেমন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর কর্মকর্তাদের ব্যর্থতা হিসেবে দেখা যেতে পারে, তেমনি একে জনপ্রশাসন ও রাজনীতিকদের নতুন উপলব্ধির পরিচায়ক হিসেবেও হয়তো দেখা যেতে পারে। আশাবাদী হয়ে কি আমরা ধরে নেব যে, সত্যিকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে সংকটের মূল কারণগুলো দূর করতে উদ্যোগী না হয়ে, কেবল লোক দেখানো সংস্কার প্রকল্পে যে কাজ হবে না, এই সহজ সত্যটা হয়তো এখন রাজনীতিক ও আমলারাও বুঝতে পারছেন!
আসলে আমাদের নগর-মহানগরগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় এনে সুপরিকল্পিত সংস্কার সাধন এবং যথেচ্ছা নির্মাণের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে না পারলে জলাবদ্ধতা বা এমন কোনো সমস্যারই স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। রাজধানী ঢাকার চারপাশে পাঁচটি নদীর বৃত্তাকার নৌপথ নাব্য করা, নদীগুলোর সঙ্গে যুক্ত করার জন্য নগরের অভ্যন্তরের খালগুলোকে দখলমুক্ত করে পুনঃখনন করা এবং অভ্যন্তরীণ পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাকে পরিশুদ্ধ করে এই প্রাকৃতিক প্রবাহের সঙ্গে সমন্বিত করা গেলে ঢাকায় কখনোই জলাবদ্ধতা থাকার কথা নয়। চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের জলাবদ্ধতা নিরসনেরও একইরকম সুযোগ রয়েছে। নগর পরিকল্পনাবিদরা অনেকদিন ধরে এমন পরামর্শ দিয়েও আসছেন। কিন্তু কাজটা বাস্তবায়ন করতে রাজনীতিক এবং আমলাদের দৃঢ় পদক্ষেপ প্রয়োজন। কিন্তু তাদের টনক নড়বে কীভাবে।