ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসাকেন্দ্রে আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) এস এম জাহাঙ্গীর আলম সরকারকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাকে শাস্তিমূলকভাবে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। তবে পুলিশ সুপারকে প্রত্যাহার করা নিয়ে নানা নাটক হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তিনি ফেনীতে থাকার জন্য নানা মহলে তদবির করেছেন বলে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন। এদিকে নুসরাত হত্যার ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলায় সোনাগাজী মডেল থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করে রংপুর রেঞ্জে সংযুক্ত করার ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীরা।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, পুলিশ সদর দপ্তর সিদ্ধান্ত নিয়েছি এসপি জাহাঙ্গীরকে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) অথবা রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্সে (আরআরএফ) বদলি করা হবে। তদন্ত কমিটিও সুপারিশ করেছিল। কিন্তু একটি মহল চেয়েছিল প্রত্যাহার করা হলে তাকে পুলিশ সদর দপ্তরেই যেন করা হয়। পরে গতকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দপ্তরে তাকে সংযুক্ত করে।
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (জনসংযোগ) সোহেল রানা গতকাল রবিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশ সদর দপ্তরের গঠিত তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে ফেনীর পুলিশ সুপার এস এম জাহাঙ্গীর আলম সরকারকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। আজকের (গতকাল) মধ্যেই তাকে দায়িত্ব বুঝে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সোনাগাজী মডেল থানার তৎকালীন ওসি মোয়াজ্জেম, এসআই মোহাম্মদ ইউসুফ ও এসআই ইকবাল আহাম্মদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নুসরাত হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ সদর দপ্তরের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের আলোকে এস এম জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমনকি তাকে সাময়িক বরখাস্তও করা হতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, নুসরাত হত্যাকাণ্ডের পর সোনাগাজী থানার ওসিকে বাঁচাতে চিঠি লিখে আলোচনায় আসেন এস এম জাহাঙ্গীর আলম।
বেরোবিতে নিন্দা : গত শুক্রবার মোয়াজ্জেম হোসেনকে রংপুর ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্তির খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা স্মারক, ক্যাফেটেরিয়া, শহীদ মিনার কিংবা পুলিশ ফাঁড়িসংলগ্ন ২ নম্বর খেলার মাঠে আড্ডা ও গল্পে এর প্রতিবাদ জানান অনেকে। এমন আদেশের তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন নারী অধিকার আন্দোলনের নেত্রী ও বেরোবি বাংলা বিভাগের অধ্যাপক সরিফা সালোয়া ডিনা। তিনি বলেন, ‘নারীর সম্ভ্রমহানি ও হত্যায় সংযুক্ত ব্যক্তিবর্গের সহায়তাদানকারী ওসি মোয়াজ্জেমকে অবিলম্বে ক্লোজড করা হোক। দ্রুত বিচারকার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তাকে কোনো জনসম্মুখে কাজ করার মতো সুযোগ দেওয়া উচিত হবে না।’
ফিল্ম অ্যান্ড আর্টস সোসাইটির বিবি চাঁদ সুলতানা বলেন, ‘আগে অপরাধ করলে শাস্তি হিসেবে পুলিশকে বান্দরবান কিংবা খাগড়াছড়িতে পাঠানো হতো। অথচ বিতর্কিত মোয়াজ্জেমকে রংপুরে পাঠানো হলো। এটা ভালো কোনো লক্ষণ নয়। এর মাধ্যমে রংপুরকে সারা দেশবাসীর কাছে ছোট ও অপমানিত করা হয়েছে।’
সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাতকে শ্লীলতাহানির অভিযোগে গত ২৭ মার্চ ওই প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাকে আটক করে পুলিশ। এরপর ৬ এপ্রিল সকালে নুসরাত পরীক্ষা দিতে মাদ্রাসায় গেলে সিরাজের অনুসারীরা তার গায়ে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায়। গত ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় তার। ওই ঘটনায় রাফির মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন। পরবর্তী সময়ে সোনাগাজী থানায় অভিযোগ নিয়ে যাওয়া নুসরাতের সঙ্গে ওসি মোয়াজ্জেমের কথোপকথনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। গত ১৩ এপ্রিল পুলিশ সদর দপ্তরের উপমহাপরিদর্শক এস এম রুহুল আমিনকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। ৩০ এপ্রিল কমিটি তাদের প্রতিবেদন পুলিশের মহাপরিদর্শকের কাছে জমা দেয়। প্রতিবেদনে সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম ও এসআই ইকবালকে সাময়িক বরখাস্ত ও তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়। এ ছাড়া এসপি জাহাঙ্গীর আলম সরকার ও এসআই আবু ইউসুফের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা ও তাদের নন-অপারেশনাল ইউনিটে বদলির সুপারিশ করা হয়।