রাজধানীর উত্তরখানের একটি বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া মা, ছেলে ও মেয়ের অর্ধগলিত লাশে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। গতকাল সোমবার দুপুরে ময়নাতদন্ত শেষে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘ছেলের গলায় কাটা এবং মায়ের গলা ও পেটে কাটা চিহ্ন রয়েছে। মেয়েটিকে গামছা দিয়ে শ্বাসরোধ করা হয়েছে। মা ও মেয়ের মৃত্যু হয়েছে শ্বাসরোধে। আর ছেলের মৃত্যু গলা কেটে হয়েছে। আনুমানিক ৭২ ঘণ্টা আগে তাদের মৃত্যু হয়েছে। তিনটি মৃতদেহ থেকে ভিসেরাসহ অন্যান্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।’ লাশ উদ্ধারের স্থান পরিদর্শনের পর পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরি করা হবে বলে জানান তিনি।
গত রবিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে উত্তরখানের ময়নারটেকে ৩৪/বি বাসা থেকে জাহানারা বেগম ওরফে মুক্তা (৪৫), তার ছেলে কাজী মুহিব হাসান (২৮) ও মেয়ে তাসপিয়া সুলতানার (২০) মৃতদেহ উদ্ধার করে দক্ষিণখান থানা পুলিশ। স্বজনরা জানান, জাহানারা বেগমের বাড়ি কুমিল্লার তিতাস উপজেলার কান্দি গ্রামে। আর তার স্বামী প্রয়াত ইকবাল হোসেনের বাড়ি কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার জগন্নাথপুর গ্রামে। মুহিব বিবিএ শেষ করে চাকরির জন্য চেষ্টা করছিলেন। এ বছর ৪০তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় অংশ নেন তিনি। ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল বিকেলে লাশগুলো নিয়ে ভৈরব পৌর এলাকার জগন্নাথপুরের উদ্দেশে রওনা দেন স্বজনরা। গতকাল রাত ৯টার দিকে কাদির সরকার বাড়ির ঈদগাহ মাঠে জানাজা শেষে তাদের দাফন করা হয়।
এদিকে উত্তরখানের ওই বাসা থেকে দুটি চিরকুট উদ্ধার করেছে পুলিশ। তারা জানায়, জাহানারা বেগম ও মুহিব দুজনই চিরকুটে তাদের মৃত্যুর জন্য ভাগ্য ও স্বজনদের অবহেলাকে দায়ী করেছেন। এছাড়া তাদের সব সম্পদ কোনো দাতব্য সংস্থায় দান করার কথা লেখে গেছেন।
স্বজনদের প্রতি মা-ছেলের ক্ষোভের বিষয়ে দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে বের হয়ে এসেছে বেশকিছু তথ্য। জাহানারার স্বামী বিআরডিবি অফিসের ব্যবস্থাপক ইকবাল হোসেন ২০১৬ সালে মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলায় কর্মরত অবস্থায় মারা যান। তার মৃত্যুর পর থেকেই আর্থিক সংকটে পরে পরিবারটি। এরপর তারা রাজধানীর কাফরুলে একটি বাসায় থাকতে শুরু করেন। চলতি বছর মার্চে পরিবারটি ভৈরব পৌর শহরের জগন্নাথপুর উত্তরপাড়ায় চলে যায়। কিন্তু স্বামীর ভিটায় ঘর সংকটের কারণে ছেলেমেয়েসহ ঠাঁই হয়নি জাহানারা বেগমের। পাশেই সাড়ে সাত হাজার টাকায় একটি বাসা ভাড়া নেন তিনি।
স্বামীর ভিটায় জাহানারা বেগমের স্থান না হওয়া প্রসঙ্গে তার দেবর আহসানুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা চার ভাই, তিন বোন। পৈতৃক সূত্রে ৪ শতাংশ জমি পেয়েছি। সেখানে চার রুমের একটি বাড়ি আছে। আমরা দুই ভাই থাকি। তাই তাদের সেখানে
থাকার মতো অবস্থা ছিল না। পাশেই একটি বাসায় ভাড়া থাকত।’
তার দাবি, ‘ভাবি, ভাতিজা ও ভাতিজির সঙ্গে আমাদের ভালো সম্পর্ক ছিল। কোনো পারিবারিক ঝামেলা ছিল না। চারটি কারণে তারা আত্মহত্যা করতে পারে বলে মনে হচ্ছে। অসময়ে স্বামীর মৃত্যু, স্বামীর পেনশনের টাকা না পাওয়া, ছেলে মুহিবের বেকারত্ব ও প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে উদ্বেগ।’
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে জাহানারা বেগমের ভাই মনিরুল হক দেশ রূপান্তরকে জানান, তারা চার ভাইবোন। ঢাকার উত্তরখানে তাদের সাড়ে চার কাঠা জমি রয়েছে। বাবার নামে থাকা ওই জমিতে নিজের অংশের জন্য ভাইকে টাকা দিতে হয়েছে জাহানারা বেগমকে। উত্তরখানের ওই জমিতে নিজের অংশের ওপর ঘর করে বসবাসের উদ্দেশ্যেই এ মাসের ৫ তারিখে পাশেই একটি বাসা ভাড়া নেয় পরিবারটি। কিন্তু ওই জমিতে তার অংশ ভাগ করে দেয়নি অন্যরা।
তিনি আরও বলেন, ‘আমি আমেরিকায় থাকা অবস্থায় ১৯৯৮ সালে আমার টাকা দিয়ে বাবা ওই জমিটি কেনেন তার নিজের নামে। যেহেতু আমার টাকা দিয়ে কেনা ছিল তাই পরবর্তীতে আমার অন্য দুই বোন ও এক ভাই আমাকে টাকা পরিশোধ করে।’
জাহানারা বেগমকে জমির অংশ বুঝিয়ে দিয়েছেন কি নাÑ জানতে চাইলে মনিরুল বলেন, ‘আমার এক বোন অস্ট্রেলিয়াতে আর ছোট ভাই আমেরিকায় থাকে। এজন্য জমি বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। তবে তাকে বাড়ি করার অনুমতি দেওয়া হয়। এই জমি নিয়ে কোনো ঝামেলা ছিল না।’ তিনি আরও বলেন, ‘জাহানারাকে আমরা প্রায় সময়ই সবাই মিলে সাহায্য-সহযোগিতা করতাম। মেয়েকে নিয়ে প্রায় সময়ই হতাশা প্রকাশ করত সে। মেয়ে মীম অনেক সময় কারও কথা শোনে না। যা ইচ্ছে তাই করে। অন্যের বাসায় ঢুকে যায়। কলিংবেল টিপে। খাওয়া-দাওয়া না করলে করেই না। আবার গোসল করে না তো করেই না। ওর মনে যা চাইত তাই করত। এ বিষয়টি নিয়ে জাহানারা অস্বস্তিতে থাকত। আমাদের প্রায় সময়ই মেয়ের কথা বলত।’
মৃত্যুর জন্য স্বজনদের অবহেলা দায়ীÑ চিরকুটের এ লেখা প্রসঙ্গে জাহানারার ভাই বলেন, ‘এটা কী কারণে তা আমার জানা নেই। তবে আমার জানা মতে, তাদের সবাই খোঁজখবর নিত ও সাহায্য করত।’
দক্ষিণখান থানার ওসি হেলালউদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রবিবার রাতে উত্তরখানের একটি বাসা থেকে পচা গন্ধ বের হলে আশপাশের লোকজন থানায় খবর দেয়। রাত সাড়ে ৮টার দিকে ওই বাসায় গিয়ে দেখা যায়, ভেতর থেকে ছিটকিনি দেওয়া। পরে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের সঙ্গে নিয়ে একতলা ওই বাসার কাঠের দরজা শাবল দিয়ে ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে তিনটি অর্ধগলিত লাশ পাওয়া যায়। মা ও মেয়ের মরদেহ পড়েছিল বিছানায়। মেঝেতে উপুড় হয়ে থাকা অবস্থায় পাওয়া গেছে ছেলের মরদেহ। তার গলায় গভীর ক্ষত ছিল। ডান হাতে বঁটি দিয়ে সে গলা কাটে বলে মনে হয়েছে। ঘরের মেঝেতে প্রচুর রক্ত ছিল। প্রচণ্ড দুর্গন্ধ ছিল রুমে। এটি আত্মহত্যা বলেই আমাদের ধারণা।’ তিনি আরও বলেন, “মুহিব ১০ দিন আগে ফেইসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাসে লেখে, ‘পৃথিবীতে টাকা ছাড়া মানুষের মূল্য নেই। বিদায় পৃথিবী বিদায়’।”
পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, ওই বাসার টেবিলের ওপর দুটি চিরকুট পাওয়া গেছে। একটিতে লেখা, ‘আমাদের মৃত্যুর জন্য আমাদের ভাগ্য ও আত্মীয়দের অবহেলা দায়ী। আমাদের সকল অর্থসম্পদ দাতব্য সংস্থায় দান করা হোক। ইতি জাহানানা।’ অন্যটিতে লেখা, ‘আমাদের মৃত্যুর জন্য ভাগ্য ও আত্মীয়স্বজনের অবহেলা দায়ী। আমাদের সকল সম্পদ দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দান করা হোক। ইতি, মুহিব।’