শাস্তি প্রত্যাহারে অর্থ উপদেষ্টার দ্বারস্থ এল আর গ্লোবাল

মিউচুয়াল ফান্ডের প্রায় শতকোটি টাকার অর্থ অপব্যবহারসহ বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কর্তৃক আরোপিত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা থেকে অব্যাহতি পেতে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমানের সহায়তা চেয়েছে এল আর গ্লোবাল বাংলাদেশ। বড় ধরনের বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে চার বছর আগে আর্থিক জরিমানাসহ বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি), যা থেকে পরিত্রাণ পেতে সম্প্রতি অর্থ উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করে চিঠি দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

মিউচুয়াল ফান্ড বা তহবিল পরিচালনাসংক্রান্ত বিধি ভঙ্গ ও বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে ২০১৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠান এল আর গ্লোবাল অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিকে ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করে এসইসি। কোম্পানিটির ওপর নতুন তহবিল গঠনে এক বছরের নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করা হয়। একই সঙ্গে যথাযথ দায়িত্ব পালন না করায় ট্রাস্টি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিকে (বিজিআইসি) ২৫ লাখ ও নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান হুদা ভাসিকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

তবে এসইসি কর্তৃক বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থ্া গ্রহণ করে বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হলেও তার অধিকাংশই পরিপালন করেনি এল আর গ্লোবাল। বরং চার বছর পর জরিমানাসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা থেকে অব্যাহতি পেতে অর্থ উপদেষ্টা মশিউর রহমানের দ্বারস্থ হয়েছে সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানটি। আর অর্থ উপদেষ্টাও এল আর গ্লোবালের বিষয়টি বিবেচনার জন্য এসইসির কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন। এল আর গ্লোবালকে এসইসির সঙ্গে যোগাযোগও করতে বলেছেন তিনি। 

২০১০ সালের ধসের পর নিজেদের পরিচালিত ছয়টি মিউচুয়াল ফান্ড থেকে কয়েকটি অতালিকাভুক্ত কোম্পানিতে বিধিমালা ভঙ্গ করে ৯৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে এল আর গ্লোবাল। ২০১৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত অতালিকাভুক্ত চারটি কোম্পানিতে বিধিবহির্ভূত এ বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৮ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। বিনিয়োগ করা গার্ডিয়ান হেলথকেয়ার, থাইরোকেয়ার বাংলাদেশ, প্রপার্টি ইনভেস্টরস ও ট্রিবিকা ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড কোম্পানি ছিল এল আর গ্লোবালসংশ্লিষ্ট। এসব কোম্পানি গঠনের নেপথ্যে ছিলেন এল আর গ্লোবাল ও এর পরিচালকরা। যদিও মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা অনুযায়ী, সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান কিংবা এর কোনো পরিচালক অন্য কোনো কোম্পানির পরিচালক কিংবা এর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে না। এই আইন ভঙ্গ করে বিধিবহির্ভূতভাবে অন্য কোম্পানি গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন এল আর গ্লোবালের পরিচালকরা।

এ ছাড়া প্রাপ্য ব্যবস্থাপনা ফির বাইরে এল আর গ্লোবাল তাদের নিজস্ব অফিস ও প্রশাসনিক ব্যয় বাবদ নিজেদের পরিচালিত ছয়টি মিউচুয়াল ফান্ড থেকে বেআইনিভাবে ৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা নিয়েছে। এ ছাড়া কোম্পানি সম্পর্কিত বিভিন্ন আইন সংক্রান্ত খরচ হিসেবে বিধিবহির্ভূতভাবে আরো ৩১ লাখ টাকা ফান্ডগুলো থেকে নেয়।

এর বাইরে কোম্পানিটি যুক্তিসংগত কারণ ছাড়াই একই তহবিলের উচ্চসুদের এক ব্যাংক হিসাব থেকে ঘন ঘন টাকা উত্তোলন করে কম সুদের অন্য ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করেছে। এতে করে ওই টাকার বিপরীতে তহবিলগুলোর সুদ আয় কমেছে। অনেক ক্ষেত্রে উচ্চসুদের পরিবর্তে কম সুদে তহবিলের টাকা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে মেয়াদি আমানত রেখেছে। আবার বিধি ভঙ্গ করে এল আর গ্লোবাল নিজ পরিচালনাধীন চার মিউচুয়াল ফান্ড থেকে অন্য তিনটি ফান্ডে প্রায় ২৭ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে।

দেশের মিউচুয়াল ফান্ড খাতে বড় ধরনের কেলেঙ্কারির কারণে ২০১৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি এসইসির কমিশন সভায় এল আর গ্লোবালের ৫০ লাখ টাকার জরিমানা ধার্য করা হয়। অতালিকাভুক্ত কোম্পানিতে বেআইনিভাবে বিনিয়োগের অর্থ ফেরত আনতে চার মাসের সময় বেঁধে দেয় কমিশন। একই সঙ্গে এক বছরের জন্য নতুন তহবিল গঠনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এ ছাড়া অবৈধভাবে নেওয়া ‘অফিস ও প্রশাসনিক ব্যয়’ বাবদ ৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা ও ‘আইনসংক্রান্ত খরচ’ বাবদ ৩১ লাখ ৬২ হাজার টাকা সংশ্লিষ্ট মিউচুয়াল ফান্ডে ফেরত দিতে চার মাসের সময় বেঁধে দেয় এসইসি। তহবিলের অর্থ কম সুদের পরিবর্তে তুলনামূলক উচ্চ সুদহারের ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তরের নির্দেশনা দেওয়া হয়।

তবে এসইসি জরিমানা আরোপ করলেও এল আর গ্লোবাল গত চার বছরে মাত্র সাড়ে ৭ লাখ টাকা জরিমানা হিসেবে পরিশোধ করেছে। এসইসির নির্দেশে অধিকাংশ অতালিকাভুক্ত কোম্পানি থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করলেও এখনো থাইরোকেয়ার বাংলাদেশ লিমিটেড নামের ডায়াগনস্টিক কোম্পানিতে ৪ কোটি ৯৪ লাখ ৫৫ হাজার টাকার বিনিয়োগ রেখেছে। এখন অর্থ উপদেষ্টা মশিউর রহমানের ওই বিনিয়োগ বহালের অনুমতি পেতে চাইছে।

আগামী তিন বছরের মধ্যে কোম্পানিটি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির পরিকল্পনা রয়েছে বলে অর্থ উপদেষ্টাকে জানিয়েছে এল আর গ্লোবাল। এ ছাড়া ‘অফিস ও প্রশাসনিক ব্যয়’ বাবদ ৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা ফেরত না দিলেও ফান্ডে এসব ব্যয় চার্জ করা বন্ধ করেছে। অর্থ উপদেষ্টাকে চিঠিতে কমিশন কর্তৃক ৫০ লাখ টাকা জরিমানা মওকুফের আবেদন জানিয়েছে এল আর গ্লোবাল। এ ছাড়া কমিশনের সঙ্গে চলমান বিষয়গুলো নিষ্পত্তিতে অর্থ উপদেষ্টার সহায়তা চেয়েছে এল আর গ্লোবালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রিয়াজ ইসলাম।