মাঠে সোনালি ধান ঢেউ খেলছে। আর তার পাশে বসে কাঁদছে কৃষক। কীভাবে ঘরে তুলবে ধান? গত বছরের মতো এবারও আমন ও বোরোতে বাম্পার ফলন। ধানের শিষে ফুল আসতেই যে কৃষক স্বপ্ন দেখেছিল মেয়ের বিয়ে দেবে অথবা নতুন ঘর তুলবে এবং পরিবারের সদস্যদের আরও কত বায়না পূরণ করবে। এই ধান মৌসুমকে ঘিরেই কৃষক পরিবার এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে আনন্দ-উদ্দীপনা দেখা যায়। তার ওপর এবার বাম্পার ফলন। কিন্তু এই বাম্পার ফলনই এখন কাল হয়েছে। আর সঙ্গে যোগ হয়েছে উদ্বৃত্ত সেই আমদানি করা ৩৯ লাখ মেট্রিক টন চাল।
ধান ঘরে তোলার আগেই ধাক্কা খেল কৃষক। এক মণ ধানের বিক্রয়মূল্য এখন ৫৫০ টাকা। আর এক মণ ধান কাটতে যে
কৃষিশ্রমিক কাজ করবে তার পারিশ্রমিক ৭০০ থেকে ৮৫০ টাকা। সরকারিভাবে ধান সংগ্রহের মূল্য ১০৫০ টাকা নির্ধারণ করলেও এখনো ধান সংগ্রহ অভিযান শুরু করতে পারেনি সরকারপক্ষ। আবার গত বছর হাওরের ফসল নষ্টের কারণে আমদানি করা হয়েছিল ৩৯ লাখ মেট্রিক টন চাল। সেই চালে গুদাম এখনো বোঝাই হয়ে আছে। সরকারপক্ষ, কৃষক, সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধান-চাল সংগ্রহে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ক্রাশ প্রোগ্রাম না এলে কৃষি ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়বে। এরই মধ্যে কৃষকরা প্রতিবাদ জানিয়েছেন। সম্প্রতি টাঙ্গাইলের একজন কৃষক ধানক্ষেতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন। ধান উৎপাদনকারী জেলা নওগাঁ, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনাসহ সব কটি জেলায় কৃষকদের মধ্যে হাহাকার। তারা ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী মৌসুম থেকে আর ধান আবাদ করবেন না।
কৃষকরা এর জন্য সরকারের ধান-চাল সংগ্রহের নীতিমালাকে দায়ী করছেন। তারা বলছেন, গত বছর হাওরে ফসল নষ্ট হওয়ার কারণে মাত্র ছয় লাখ মেট্রিক টন চালের ঘাটতি ছিল। সেটি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কৃষকদের দাবি, মিল মালিকরা হাওরের এই দুর্যোগের সুযোগ নিয়েছেন। কৃত্রিম সংকট তৈরি করে আমদানিতে বাধ্য করেছে। সেই আমদানি আজ কৃষকদের জীবনের বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
বিভিন্ন জেলার কৃষকদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যমতে, প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৪৪০ থেকে ৬৫০ টাকা। কিন্তু জমিতে ধান রোপণ, আগাছা পরিষ্কার, সার-কীটনাশক প্রয়োগ, ধান কাটা, মাড়াই ও ঘরে তোলায় প্রতি মণে খরচ হয়েছে অনেক বেশি। স্বদেশ বিশ্বাস নামে বাগেরহাটের এক কৃষক বলেন, ছয় বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছি। ৭০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছে। ৪৫০ টাকা করে ধান বিক্রি করলে আমার খরচের টাকা উঠে। কিন্তু ধান কাটা ও মাড়াইয়ের জন্য শ্রমিকদের টাকা বাড়ি থেকে এনে দিতে হবে। ধানের দাম এত কম থাকলে, ধান চাষ বন্ধ করে দিতে হবে। ১২ থেকে ১৫ টাকায় ধান বিক্রি করে ৪৫ টাকা চাল কিনে খেতে হয়।
অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশ কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে চালের বদলে ধান সংগ্রহের পরামর্শ দিয়েছেন। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, উজানের কারণে ২০১৮ সালে ছয় লাখ মেট্রিক টন বোরো ধান নষ্ট হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বালাই আক্রমণে ফসলহানির ঘটনায় ব্যবসায়ীরা ১৮ লাখ মেট্রিক টন ঘাটতি দেখান। কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই না করে শুল্ক ছাড়াই চাল আমদানির সুবিধা দেয় অর্থাৎ নগদ টাকা ছাড়াই চাল আমদানির ঋণপত্র খোলার সুযোগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এছাড়া আমদানির শুল্ক ও কর কমিয়ে ১০% করা হয়। এখন কৃষককে বাঁচাতে সরকারের ক্রাশ প্রোগ্রাম হাতে নেওয়া উচিত। কৃষক যদি উৎপাদন থেকে মুখ তুলে নেয় তাহলে অর্থনীতিতে ভঙ্গুর পরিস্থিতি হবে। যেকোনো উপায়ে হোক কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে।
নওগাঁ জেলার ধান-চাল আড়তদার সমিতির সভাপতি নীরদ বরণ সাহা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ১০ বা ১২ লাখ মেট্রিক টন ঘাটতি দেখানো হয়েছে। অথচ আমদানি হয়েছে ৩৯ লাখ মেট্রিক টনের ওপর। এই যে ৩০ লাখ মেট্রিক টন চাল আমাদের দেশে ঢুকেছে এটাই বড় ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এবারের আমনের বাম্পার। তিনি বলেন, আমাদের দেশে সাধারণত আমন প্রতি বিঘা ১২ থেকে ১৫ মণের মতো হয়। কিন্তু গত আমনে আমাদের বিঘাপ্রতি ২২ থেকে ২৪ মণ ফলন হয়েছে। প্রতি বিঘায় ৭/৮ মণ বেশি উৎপাদন হয়েছে তাও আমাদের উদ্বৃত্ত। এটা সরকারের জানা আছে। এখন মিলারদের পেট ভরা। তারাও ধান নিচ্ছে না। আবার সরকার মাত্র ৫০ হাজার মেট্রিক টন ধান ও ১২ লাখ মেট্রিক টন চাল সংগ্রহ করবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকার এই পরিমাণ ধান-চাল সংগ্রহ করলেও কৃষকের দুঃখ কাটবে না। আবার কাঁচা ধান সংগ্রহে রাখার সামর্থ্য নেই আমাদের কৃষকদের। আর এই সুযোগ ফড়িয়ারা। কৃষক ঠকানোর এই প্রক্রিয়া একমাত্র সরকার সরাসরি বন্ধ করতে পারে। ধান উৎপাদন করতে নওগাঁ জেলার কৃষক নেতা একুশে পরিষদের সভাপতি ডি এম আবদুল বারী বলেন, ধান উৎপাদনে যে সার কীটনাশক এবং পানির দাম কৃষককে দিতে হয় তার জন্য মহাজনের কাছ থেকে যে ঋণ নিতে হয় তা এবার পরিশোধ করতে পারবে না কৃষক। মহাজনের টাকা শোধ করতে এবার ঘরের জিনিস বেচতে হবে। কৃষকের মরণ অবস্থা। এই অবস্থায় যদি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে না দেখে বাংলাদেশের কৃষির অবস্থা এবং ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে বাধ্য।
হবিগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আবদুস সালাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকার চিন্তা করেছে প্রত্যেক জেলাতে একটি করে ধান সাইলো দেবে। যাতে করে কৃষকরা কাঁচা ধান রাখতে পারে এবং শুকাতে পারে। এখন জরুরি কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে তা আমাদের জানা নেই।
কাগজে-কলমে ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়েছে ২৫ এপ্রিল। আগামী ৩০ আগস্ট পর্যন্ত এই অভিযানে ৫০ হাজার মেট্রিক টন ধান এবং ১২ লাখ মেট্রিক টন চাল সংগ্রহ করার কথা।
বাগেরহাটের কৃষক সমিতির নেতা হারুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখানে ৯৮ শতাংশ কৃষকদের ধান কাটা ও মাড়াই সম্পন্ন হয়েছে। সরকারিভাবে এখনো ধান ক্রয় শুরু করতে পারেনি খাদ্য বিভাগ। বাধ্য হয়ে কৃষকরা উৎপাদন খরচের থেকে কম দামে মিল মালিক ও ব্যবসায়ীদের কাছে ধান বিক্রি করছে। তিনি বলেন, বাম্বার ফলন পেয়েও যদি কৃষক ন্যায্যমূল্য না পায় তাহলে আগামীতে পরিস্থিতি খুব খারাপ হবে। সরকারের জরুরি উদ্যোগ চায় কৃষক।
বাগেরহাট জেলার খাদ্য কর্মকর্তা দাবি করেছেন, দুটি উপজেলায় সরকারিভাবে কৃষকদের কাছ থেকে ১০৪০ টাকা মণে ধান ক্রয় শুরু হয়েছে। বোরো মৌসুমে জেলায় ৫৬ হাজার হেক্টর জমিতে মোট ৩ লাখ ৯০ হাজার ৯৩০ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন হয়েছে। তবে সরকারিভাবে ধান ক্রয় করা হবে মাত্র ১ হাজার ৮৫৫ মেট্রিক টন। যার ফলে সব কৃষক সরকারের কাছে ধান বিক্রির সুযোগ পাবে না।
বাগেরহাট, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, হাওর এলাকা, টাঙ্গাইল, দিনাজপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় কৃষিশ্রমিকের সংকট। এমন ধানের দামের চেয়ে একজন কামলার দাম ৩০০ টাকা বেশি। তাই কৃষক মাঠ থেকে ধান আনার সাহসই পাচ্ছে না।
কৃষি অর্থনীতিবিদ আফরোজা চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, একদিকে কৃষক পর্যায়ে ফলন, খরচ, লাভযোগ্যতা নিয়ে শঙ্কা অন্যদিকে আপামর জনসাধারণের মধ্যে থাকে দাম ও মান নিয়ে শঙ্কা। দাম না পাওয়ায় নিরুৎসাহিত হয়ে ধানচাষে বিমুখ হয়ে পড়ছে কৃষকসমাজ, যা ভবিষ্যতে দেশের খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও কূটনৈতিক অবস্থানকে হুমকির মুখে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে।
সরকারের পক্ষ থেকে ধান-চাল সংগ্রহের যে পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে তার থেকে সরকারি গুদামের ধারণক্ষমতা অনেক কম। সেজন্য ১২ লাখ টন টার্গেট করা হয়েছে। সাড়ে তিন কোটি টন চালের মার্কেটে ১০ বা ১২ লাখ টন চাল কিনলে এর কোনো প্রভাব পড়বে না। এছাড়া কৃষকরা প্রত্যক্ষভাবে এর সুবিধাটা পায় না। ডিলাররা কিনলে তার একটা প্রভাব পড়ে।
সরকারি গবেষণা সংস্থা বিআইডিএসের গবেষক ড. নাজনীন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ফলন ভালো হলেই ক্ষুদ্র এবং মাঝারি কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। ধান-চাল কেনার প্রচলিত পদ্ধতিতে সরকারের নজরদারি বাড়ানো হলে কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তিনি বলেন, সরকার যদি তাদের চাল কেনার প্রক্রিয়া একটু আগে শুরু করে, তাহলে সেখানে ধানের দাম যেটা ঘোষণা করা হবে, তা ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য একটা বারগেইনিং পয়েন্ট হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন খরচ কমাতে কৃষককে প্রযুক্তির দিকে নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।
এ বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সরকার নিচ্ছে। তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য চাল রপ্তানির বিষয়কে সরকার সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে। তিনি বলেন, কৃষক আমন ধানও ভালো দামে বিক্রি করতে পারেনি এই অস্বাভাবিক হারে দাম কমে যাওয়ায়। এরই মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হাওর থেকেও ধান কাটা হয়ে গেছে। ফলে স্পষ্ট বোঝা যায়, অনেক ধান উদ্বৃত্ত থাকবে। মন্ত্রী আরও জানান, সরকার ৩৬ টাকা কেজি দরে চাল ক্রয় করলেও সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী, মিলার ও সরকারি কর্মকর্তাদের কারণে কৃষকরা প্রকৃত দাম পাচ্ছে না। তবে শিগগিরই চাল রপ্তানির পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, ২ কোটি ৬০ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে দেশে আউশ, আমন এবং বোরো ধান মিলিয়ে এবার ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ টন।