বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙল বিজেপি নিন্দায় মুখর বাংলা

কলকাতার বুকে ভোটের রাজনীতির ‘বলি’ হয়ে গেলেন স্বয়ং বিদ্যাসাগর। বিজেপি সভাপতি অমিত শাহর রোড শো ঘিরে বিজেপি-তৃণমূল রাজনৈতিক সংঘাতের জেরে উত্তপ্ত হয়ে উঠল কলেজ স্ট্রিটে কলকাতা বিশ^বিদ্যালয় চত্বর, আক্রান্ত হলো ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাসাগর কলেজ। কলেজের ভেতর ঢুকে তা-ব চালাল রাজনৈতিক গুণ্ডারা, আগুন লাগাল বাইকে এবং ভেঙে টুকরো টুকরো করল বিদ্যাসাগরের আবক্ষ মূর্তি। মাসচারেক পরই, আগামী সেপ্টেম্বরে তার দ্বিশত জন্মবার্ষিকী। তার প্রাক্-মুহূর্তে নারীর মর্যাদা ও শিক্ষাবিস্তারে তার অনন্য অক্লান্ত অবদানের পুরস্কার দিয়ে দিল এই বাংলা। বর্ণপরিচয়ের  শ্রষ্টার মূর্তি ভেঙে ছত্রাখান হয়ে ছড়িয়ে রইল তারই নামাঙ্কিত কলেজ ক্যাম্পাসের মাটিতে। ছি! এই সংক্ষিপ্ত শব্দেই মঙ্গলবারের এই ঘটনার নিন্দায় মুখর হয়েছে বাংলার চিন্তাশীল সমাজ। প্রশ্ন উঠেছে,    

 

 সহিংস প্রতিস্পর্ধী রাজনীতির এ কোন নতুন বর্ণপরিচয়ের পাঠ শুরু করল বাংলা? সত্তরের উত্তাল দশকে এই কলেজ স্কোয়ারে বিদ্যাসাগরের মূর্তির মু-চ্ছেদ করে রেখে গিয়েছিল নকশালপন্থিরা। কিন্তু সেই অতিবাম আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও কার্যকারণ ছিল পৃথক। বস্তুত, অমিত-দম্ভের ছত্রচ্ছায়ায় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় যে কা-টা ঘটিয়ে দিল গেরুয়াধারী বিজেপি কর্মীরা, তা কার্যত এক অশনিসংকত এঁকে দিল বাংলার ক্ষমতালিপ্সু রাজনীতির মেঘাচ্ছন্ন আকাশে। এমনটাই মনে করছেন চিন্তাশীল মহল।

কিছুদিন আগেই সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছিলেন দুই বর্ষীয়ান বামপন্থি নেতা, তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। প্রথমজন, পশ্চিমবঙ্গের বাম জমানার শেষ কর্ণধার বুদ্ধদের ভট্টাচার্য এবং অন্যজন, ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার। বুদ্ধবাবু দলের কর্মী-সমর্থকদের সতর্ক করে বলেছিলেন, তৃণমূলের অপশাসন থেকে বাঁচতে বিজেপিকে বেছে নেওয়ার অর্থ গরম কড়াই থেকে জ¦লন্ত উনুনের মধ্যে গিয়ে পড়া। একই সতর্কবার্তা উচ্চারিত হতে শোনা গেছে মানিকবাবুর কণ্ঠেও। এই বাংলায় ভোট প্রচারে এসে তিনি বলেন, বিজেপিকে বাংলায় জমি ছেড়ে দেবার আগে ত্রিপুরার দৃষ্টান্তের কথা মাথায় রাখবেন। তার রাজ্যে ক্ষমতা দখল করে যে ধারাবাহিক সন্ত্রাস চালিয়েছে বিজেপি, তার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন মানিকবাবু। ত্রিপুরার বিলোনিয়াতে লেনিনের এক পাঁচ ফুট ফাইবার গ্লাসের মূর্তি বুলভোজার চালিয়ে ভেঙে দেওয়া হয়। সম্প্রতি বিশালগড়ে ভাঙা হয় কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের মূর্তি। বাংলায় এখনো ক্ষমতায় আসেনি বিজেপি। এরই মধ্যে ভূলুণ্ঠিত বিদ্যাসাগর।

অমিত শাহর রোড শোয়ে শক্তির আস্ফালন যখন চলছে, তখন কলকাতা বিশ^বিদ্যালয়ের গেটে এবং বিধান সরণির বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে ‘প্ররোচনা ছিল সামান্যই’। প্রত্যক্ষদর্শীরা এমনটাই বলছেন। কতিপয় তৃণমূল ছাত্র পরিষদের সদস্য কালো পতাকা দেখিয়ে, ‘গো ব্যাক মোদি’ বা ‘চৌকিদার চোর হ্যায়’ লেখা পোস্টার হাতে নিয়ে প্রতিবাদ জানাতে গিয়েছিলেন। এতেই অসহিষ্ণু হয়ে একাংশ বিজেপি কর্মী অমিত শাহর মিছিল থেকে তেড়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে পুলিশি ব্যারিকেড ভেঙে। বিদ্যাসাগর কলেজের পাঁচিল টপকে গিয়ে তা-ব চালায় গোটা ক্যাম্পাসে। একটি সূত্রের দাবি, রোড শোয়ের আগে লেনিন সরণিতে যখন বিজেপির ব্যানার খুলতে আসা পুরসভার গাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয়, তখনই খবর এসে গিয়েছিলÑ কলেজ স্ট্রিটে কালো পতাকা নিয়ে কোমর বাঁধছে তৃণমূলের ছেলেরা। প্রতিস্পর্ধী আক্রমণের প্রস্তুতি তখনই নিয়ে ফেলেছিল গেরুয়া শিবির।

উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, ঝাড়খ- থেকে লোক এনে বিজেপি কলকাতায় অশান্তি পাকিয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এ অভিযোগ কিন্তু একেবারে উড়িয়েও দেওয়া যাচ্ছে না। এ দিন সিপিএম পলিটব্যুরো সদস্য বিমান বসু বলেন, ‘বাংলার মানুষ এটা করতে পারে না। কারা করেছে, তার স্বাধীন তদন্ত হওয়া দরকার। এ ঘটনার লজ্জায় মুখ ঢেকেছে বাংলা।’ ঘটনার পরই বিদ্যাসাগর কলেজে চলে  যান মমতা। তার সক্ষোভ উক্তি, ‘ওরা বাংলার হেরিটেজ, বাংলার মনীষীর গায়ে হাত দিয়েছে। আমার থেকে ভয়ংকর কেউ হবে না। তোমাদের দম্ভ আমি ভাঙবই।’ ঘটনার পরই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজা। দোষারোপ, পাল্টা দোষারোপের পালা। বিজেপি ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে অভিযোগের তর্জনী তুলেছে তৃণমূলের দিকে। উভয় দলই পরস্পরের বিরুদ্ধে নালিশ নিয়ে দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হয় বুধবার। পশ্চিমবঙ্গের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে এদিনই বিশেষ বৈঠক ডাকে কমিশন। কেননা, কলকাতার দুই কেন্দ্রসহ পার্শ^বর্তী এলাকার মোট দশ আসনে ভোট আগামী রবিবার। শেষ দফার এই ভোট পর্ব নিয়ে আশঙ্কার পারদ চড়ছেই।

তবে কেন্দ্র ও রাজ্যের দুই শাসক দলকেই এই পরিস্থিতির জন্য অভিযোগের কাঠগড়ায় তুলছেন বাম ও কংগ্রেস নেতৃত্ব। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আক্রমণ ও বিদ্যাসাগরে মূর্তি ভাঙায় প্রতিবাদে এদিন কলেজ স্কোয়ার থেকে হেদুয়া পর্যন্ত ধিক্কার মিছিল করেন বাম নেতৃত্ব। ছিলেন শীর্ষ বাম নেতারা। সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি বলেন, ‘যিনি বাংলা, তথা ভারতকে সুস্থ সংস্কৃতির দিশা দেখিয়েছিলেন, সেই বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙল ভারতীয় ঐতিহ্যের স্বঘোষিত চৌকিদাররা। বিজেপি ও তৃণমূল এ নিয়ে তু-তু ম্যায়-ম্যায় করছে। দুই দলেরই লক্ষ্য সামাজিক মেরুকরণ ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল সুনিশ্চিত করা। এই চক্রান্তের ফাঁদে মানুষ যেন পা না দেন।’

আর এই সাক্ষাৎ নৈরাজ্য দেখে কী বলছে সুশীল সমাজ? ‘ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। অধঃপতনের আর কোন স্তর পর্যন্ত দেখতে হবে জানি না’Ñ শঙ্খ ঘোষ থেকে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এই অনাগত দিনের আশঙ্কায় বুক কাঁপছে সকলেই। বুধবার পুলিশ জানায়, ওই ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ৫৮ জন। বিভিন্ন জায়গায় ধিক্কার মিছিল বার করে তৃণমূল। পথে নামেন মমতাও। তার ও দলের নেতাদের হোয়াটসঅ্যাপ প্রোফাইলে এদিন দেখা যায় বিদ্যাসাগরের ছবি। এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির পর এদিন নরেন্দ্র মোদির জোড়া সভা বসিরহাট ও ডায়মন্ড হারবারে। তবে কোনো রাজনৈতিক ভাষ্যে ঢাকার নয় এই ক্ষত বলছে মানুষ।

১০ কেন্দ্রের নির্বাচনী প্রচারের সময়সীমা নজিরবিহীনভাবে কাটছাঁট করল নির্বাচন কমিশন। শনিবারের পরিবর্তে প্রচার শেষ হবে শুক্রবার বিকেলে। বাংলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দেখে এই সিদ্ধান্ত কমিশনের। ভোটের কাজে হস্তক্ষেপের অভিযোগে সরানো হয়েছে রাজ্যের স্বরাষ্ট্রসচিব অত্রি ভট্টাচার্যকেও। এই প্রথম ৩২৪ ধারা প্রয়োগ করল কমিশন। জানান উপনির্বাচন কমিশনার সুদীপ জৈন। সিআইডি-প্রধানের পদ থেকে সরানো হয়েছে মমতার ঘনিষ্ঠ রাজীব কুমারকেও।’