কৃষকদের ক্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার পরামর্শ খাদ্যমন্ত্রীর

ধানের যৌক্তিক মূল্য না পেয়ে দেশের কয়েকটি জায়গায় ক্ষেতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন চাষিরা। করেছেন মানববন্ধন ও নানা প্রতিবাদ কর্মসূচি। ধানের যৌক্তিক মূল্য নিশ্চিতের দাবিতে কৃষকদের সঙ্গে মাঠে নেমেছেন শিক্ষার্থীরাও। গতকাল দেশের বিভিন্ন এলাকায় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ। ঢাকা, রাজশাহী, নোয়াখালী, দিনাজপুর, জয়পুরহাটসহ কয়েকটি এলাকার এসব কর্মসূচি থেকে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

এদিকে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার ধানের যৌক্তিক মূল্য নিশ্চিত করতে দুটি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছেন। গতকাল সিরাজগঞ্জ ও বগুড়ার দুটি পৃথক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, কার্ডধারী কৃষকদের ধান দ্রুত ক্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হলে এবং চাল রপ্তানির প্রক্রিয়া দ্রুত করা গেলে কৃষক ভালো দাম পাবেন।

গতকাল বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর প্রেস ক্লাব, নোয়াখালী প্রেস ক্লাব ও জয়পুরহাটে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ এবং কৃষকের নানা কর্মসূচি, সিরাজগঞ্জ ও বগুড়ায় খাদ্যমন্ত্রীর অনুষ্ঠানের খবর পাঠিয়েছেন দেশ রূপান্তরের প্রতিনিধিরা।     

ধানের ন্যায্যমূল্যের দাবিতে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ব্যানারে মানববন্ধন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ওই মানববন্ধন থেকে এ জন্য দ্রুত কমিটি করার আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহ-সভাপতি (ভিপি) নুরুল হক নুর।

এর আগে গত সোমবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ব্যানারে মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। সেখানে দেশব্যাপী এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। সেই ঘোষণার প্রেক্ষিতেই গতকালের এই কর্মসূচি পালন করে সংগঠনটি।

নুরুল হক নুর বলেন, যাদের উৎপাদিত পণ্য খেয়ে বেঁচে আছি, তাদের সঠিক মূল্য আমরা দিতে পারছি না। মন্ত্রীরা বক্তব্য দিচ্ছেন ধান বেশি হওয়ায় দাম কমে যাচ্ছে। অথচ চালের দাম ঠিকই বেশি। এটি কারণ নয়, সিন্ডিকেটের কারণে দাম কমে যাচ্ছে।

জিডিপি নয় ধানের দাম চাই

ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের দাবিতে রাস্তায় ধান ছিটিয়ে মানববন্ধন করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থীরা। গতকাল বুধবার দুপুরে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ব্যানারে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে তারা কর্মসূচি পালন করেন।

সে সময় বক্তারা বলেন, উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে টাঙ্গাইলে ধানের ক্ষেতে আগুন লাগিয়েছেন এক কৃষক; যা কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের জন্য লজ্জার। এক মণ ধান উৎপাদনে কৃষক যে পরিমাণ খরচ করেন, তারপর বিক্রি করে মূলধনও ফেরত পান না তারা।

বক্তারা বলেন, ধানের দরপতনের জন্য একশ্রেণির সিন্ডিকেট দায়ী। সরকার ২৬ টাকা কেজি দরে ধানের দাম নির্ধারণ করলেও ব্যবসায়ীরা ১২ থেকে ১৪ টাকা কেজি দরে কিনছে; আবার ব্যবসায়ীরাই সরকারের কাছে ২৬ টাকায় বিক্রি করছে।

এ সময় শিক্ষার্থীরা ‘জিডিপি নয় ধানের দাম চাই’, ‘ধানের দাম কমে, চালের দাম বাড়ে কেন?’, ‘কৃষি মেরে কৃষক মেরে উন্নয়ন মানি না’, ‘কৃষক যদি না করে ধান চাষ, দেখব শাসকগোষ্ঠী কি খায়’, ‘আমরা চাষা ধানের ন্যায্যমূল্য চাই’ লেখা প্ল্যাকার্ড বহন করেন।

সহজ শর্তে কৃষিঋণের দাবি

ধানের ন্যায্যমূল্য ও কৃষি খাতে পর্যাপ্ত ভর্তুকিসহ বিভিন্ন দাবিতে শিক্ষার্থীরা নোয়াখালী প্রেস ক্লাবের সামনের সড়কে মানববন্ধন করেছেন। বুধবার দুপুর আড়াইটায় বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ নোয়াখালী জেলা শাখার উদ্যোগে এ কর্মসূচি পালিত হয়। সেখান থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরাসরি ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং সহজ শর্তে কৃষিঋণ প্রদান করার দাবি জানানো হয়।

ঘণ্টাব্যাপী এ কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখেন, পরিষদের জেলা শাখার আহ্বায়ক আব্দুজ জাহের, সদস্য সচিব গালিব মাহমুদ, যুগ্ম আহ্বায়ক জিয়াউল হক মজুমদারসহ অনেকে।

কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশ

‘কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশ, গড়ব সোনার বাংলাদেশ’ স্লোগানকে সামনে রেখে গতকাল বুধবার দিনাজপুরে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে। মানববন্ধন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন দিনাজপুর হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং দিনাজপুর সরকারি কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

মানববন্ধনে ধানসহ সব কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ, কৃষি খাতে পর্যাপ্ত ভর্তুকি প্রদান এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের লাগাম টেনে ধরার দাবি জানানো হয়।

মানববন্ধনে সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের দিনাজপুর জেলা শাখার আহ্বায়ক মো. শহিদুল ইসলাম ফাহিম বলেন, ধানের ন্যায্যমূল্য কৃষকরা পাচ্ছে না। আমরা কৃষক পরিবারের ছেলে, আমাদের বাবারা ধান চাষ করেই আমাদের পড়ালেখা করায়। বাজারে ধানের দাম না থাকায় আমাদের বাবারা ধান বিক্রি করতে পারছেন না।

রাস্তায় ধান ছিটিয়ে প্রতিবাদ

বুধবার দুপুরে জয়পুরহাট জেলা শহরের জিরো পয়েন্টে রাস্তায় ধান ছিটিয়ে ও পুড়িয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন কৃষকরা। ধানের ন্যায্যমূল্যের দাবিতে তারা মানববন্ধনও করেন।

এ সময় বক্তারা অবিলম্বে মোটা ধানের দাম মণপ্রতি ৮০০ টাকা ও চিকন ধানের দাম ৯০০ টাকা করার দাবি জানান। এ কর্মসূচির আয়োজন করেন কৃষক ও ক্ষেতমজুর সংগ্রাম পরিষদ নামে একটি রাজনৈতিক সংগঠন।

চাল রপ্তানি করলে ধানের দাম পাবেন কৃষক

গতকাল সিরাজগঞ্জ ও বগুড়ার দুটি পৃথক অনুষ্ঠানে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেছেন, কার্ডধারী প্রান্তিক কৃষকদের তালিকা করে তাদের ধান দ্রুত ক্রয়কেন্দ্রে দেওয়া হলে এবং চাল রপ্তানির প্রক্রিয়া দ্রুত করা গেলে কৃষক ভালো দাম পাবেন।

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা খাদ্য গুদামে প্রান্তিক কৃষক এবং মিলারদের কাছ থেকে ধান ও চাল ক্রয়ের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন শেষে তিনি বলেন, সরকার দেশের চাহিদা মিটিয়ে বাংলাদেশের উৎপাদিত চাল বিদেশে রপ্তানি করার পরিকল্পনা করছে। চাল রপ্তানি করতে পারলে ধানের বাড়তি দাম পাবেন কৃষকরা।

বগুড়া সদর এলএসডিতে অভ্যন্তরীণ বোরো ধান ও চাল সংগ্রহ অভিযানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, কার্ডধারী প্রান্তিক কৃষকদের তালিকা করে ত্বরিতগতিতে ক্রয়কেন্দ্রে দেওয়া হলে কৃষকরা নায্যমূল্যে ধান দিতে পারবেন। এতে করে বাজারেও একটা প্রভাব পড়বে এবং সেখানেও তারা ভালো দাম পাবেন।