কৃষক-শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি চলছে

সরাসরি ধান ক্রয়ে রাজনৈতিক বাধা আছে : কৃষিমন্ত্রী

ধানের যৌক্তিক মূল্য না পেয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছেন কৃষকরা। তাদের সঙ্গে মাঠে নেমেছেন শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও। গত বুধবার দেশের বিভিন্ন এলাকার প্রতিবাদ কর্মসূচির মতো গতকাল বৃহস্পতিবারও ধানের যৌক্তিক মূল্যের দাবিতে মানববন্ধন ও সড়কে ধান ছিটিয়ে প্রতিবাদ করেছেন কৃষক, শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক কর্মীরা।

এদিকে সরকার রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনতে পারছে না বলে স্বীকার করেছেন কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক। ধান নিয়ে বিদ্যমান এই সমস্যা নিরসনে ধান-চাল রপ্তানি, কৃষি উপকরণের দাম কমানো ও ধানের জাত উন্নয়ন করার পরামর্শ দিয়েছেন। এ বছর সরকার ২৬ টাকা কেজি দরে ধান কিনছে। সে হিসেবে প্রতি মণ ধানের দাম দাঁড়ায় ১০৪০ টাকা। অথচ এলাকাভেদে ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বোরো ধান। শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির এই সময়ে দাম কম হওয়ায় দিশেহারা কৃষকরা হতাশা ও ক্ষোভে আগুন দিয়েছেন ধানক্ষেতে। কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়ে ধান কেটে দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

গতকাল বৃহস্পতিবার ধানের যৌক্তিক মূল্য নিশ্চিতের দাবিতে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহীতে শিক্ষার্থী-রাজনৈতিক কর্মীদের মানববন্ধন, রংপুরে রাস্তায় ধান ছিটিয়ে কৃষকের প্রতিবাদ এবং সিলেটে শিক্ষার্থীদের ধান কেটে দেওয়ার খবর পাঠিয়েছেন দেশ রূপান্তরের প্রতিনিধিরা।

রংপুরে রাস্তায় ধান ফেলে বিক্ষোভ

ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত এবং সরকারি উদ্যোগে হাটে হাটে ক্রয়কেন্দ্র খুলে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয়ের দাবিতে বৃহস্পতিবার রংপুর নগরীর সাতমাথায় কৃষক সংগ্রাম পরিষদ মহাসড়ক অবরোধ ও ধান ফেলে বিক্ষোভ করে।

এ সময় বক্তারা বলেন, প্রতি বছর উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া কৃষকের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সার, ডিজেল, কীটনাশকসহ প্রতিটি কৃষি উপকরণের মূল্য দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষক আবাদ করতে গিয়ে ঋণের জালে জর্জরিত হচ্ছেন। এ বছর প্রতি মণ ধান উৎপাদনে কৃষকের ব্যয় হয়েছে ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা। অথচ দাম না থাকায় প্রতি মণ ধান কৃষক ৪২০ থেকে ৪৫০ টাকা দরে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। সরকার প্রতি মণ ধান ১০৪০ টাকা দরে ক্রয়ের ঘোষণা দিলেও এখন পর্যন্ত ক্রয় করা শুরু করেনি। এ অবস্থায় সরকারের উচিত মূল্য সহায়তা দিয়ে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয় করা।

গোপালগঞ্জে মানববন্ধন

ধানের ন্যায্যমূল্যের দাবিতে গোপালগঞ্জে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এ কর্মসূচি পালন করেন।

এ সময় ধানের ন্যায্যমূল্যের দাবিতে বিভিন্ন ধরনের লেখা প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন ও স্লোগান দেন মানববন্ধনকারীরা। এ সময় বক্তারা দেশের কৃষকদের বাঁচাতে ধানের ন্যায্যমূল্যের দাবি জানিয়ে বিদেশ থেকে চাল আমদানি বন্ধের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

ধানের ন্যায্যমূল্য দাও, কৃষক বাঁচাও

ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের দাবিতে রাজশাহী মহানগরের সাহেব বাজার জিরোপয়েন্টে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধন করেছে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন রাজশাহী মহানগর শাখা। এ সময় তাদের সেøাগান ছিল ‘কৃষকের ধানের ন্যায্যমূল্য দাও, কৃষক বাঁচাও।’

কর্মসূচি চলাকালে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন রাজশাহী মহানগরের নেতারা বলেন, কৃষকের ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। কালোবাজারি ও মধ্যস্থতাকারী সুবিধাভোগী গোষ্ঠীকে বিলুপ্ত করে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয় করতে হবে এবং সরকারি নীতি কৃষকবান্ধব করতে হবে। না হলে সবাইকে নিয়ে শিগগিরই কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

শেকৃবিতে মানববন্ধন 

কৃষকের উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য দিতে এবং ধানের দাম বৃদ্ধির দাবিতে মানববন্ধন করেছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন কলেজগেটে হাতে পাকা ধান নিয়ে এ কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। 

এ সময় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ ও মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান ড. কেবিএম সাইফুল ইসলাম, এগ্রোনমি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আনিসুর রহমান এবং শিমুল চন্দ্র সরকার।  

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে টাঙ্গাইলে ধানের ক্ষেতে আগুন লাগিয়েছেন এক কৃষক, যা কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের জন্য লজ্জার। এক মণ ধান উৎপাদনে কৃষক যে পরিমাণ খরচ করেন বিক্রি করে মূলধনও ফেরত পান না তারা।

সরাসরি ধান কেনায় বাধা রাজনৈতিক প্রভাব

সরকার রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বাজার থেকে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনতে পারছে না বলে স্বীকার করেছেন কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়, এরশাদের আমল থেকেই এই সমস্যা রয়েছে। সব সরকারই কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার উদ্যোগ নিয়েছিল, কিন্তু সবাই ফেল করেছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ঝাং জুয়ার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে কৃষিমন্ত্রী এ কথা বলেন। মন্ত্রী বোরো ধান নিয়ে বিদ্যমান সমস্যা নিরসনে তিনটি উপায়ের কথা বলেন। ১. ধান-চাল রপ্তানির বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। ২. ধান উৎপাদনে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি বা উপকরণের দাম কমাতে হবে এবং ৩. আরও উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত উন্নয়ন করতে হবে।

ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, বাজারে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার ক্ষেত্রে আরও সমস্যা রয়েছে। সেগুলো হচ্ছে, কৃষকের কাছ থেকে কেনা ধান সবসময় মানসম্পন্ন পাওয়া যায় না। কৃষকের কাছ থেকে কেনা ধান অনেক সময় ভেজা থাকে। তবে মিলারদের কাছ থেকে মানসম্পন্ন ধান পাওয়া যায়। সেই ভেজা থাকে না।

ধান কাটায় শ্রমিক না পাওয়া প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতির জন্য একটি শুভ সংবাদ যে দেশে শ্রমিক নেই। এটি একটি ভালো দিক। তিনি বলেন, সরকার প্রতি বছর সর্বোচ্চ ১২ থেকে ১৫ লাখ টন চাল কেনে, যা বাজারে তেমন কোনো প্রভাব ফেলে না। সরকার যদি ২০ লাখ টন চাল যদি কিনত তাহলেও উৎপাদিত এই সাড়ে তিন কোটি টনের ক্ষেত্রে তেমন প্রভাব ফেলত না।

কৃষকের ধান কেটে দিলেন শাবি শিক্ষার্থীরা

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) ক্যাম্পাসসংলগ্ন কৃষকের কিছু জমির বোরো ধান কেটে দিয়েছেন শাবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা। বোরো ধানের স্বল্পমূল্য ও শ্রমিকের অধিক মজুরির প্রতিবাদ হিসেবে তারা এই কর্মসূচি পালন করেন। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা থেকে তারা ক্ষেতের ধান কাটা শুরু করেন। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন ২১ শতক জমির ধান তারা কেটে দেন।

শিক্ষার্থীরা জানান, ধানের বিক্রয়মূল্যের চেয়ে উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় কৃষকরা গভীর সংকটে পড়েছেন। অথচ ফায়দা লুটছে মধ্যস্বত্বভোগীরা। এসব অনিয়মের প্রতিবাদে তাদের এই কর্মসূচি বলে জানান শিক্ষার্থীরা। ধান কাটা কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের ২৫ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন।