তিন ধাপ শেষে তিন রুটে পাচার

অবৈধভাবে ইউরোপে পাচারকালে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে বাংলাদেশি নিহতের ঘটনায় মানবপাচার চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। গতকাল শুক্রবার বিকেলে রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থার লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান জানান, গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে গতকাল ভোর পর্যন্ত রাজধানীর আবদুল্লাপুর, খিলক্ষেত ও বিমানবন্দর এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হলেনÑ শরীয়তপুরের আক্কাস মাতুব্বর (৩৯), সিলেটের এনামুল হক তালুকদার (৪৬) ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আবদুর রাজ্জাক ভূঁইয়া (৩৪)। তাদের মধ্যে এনামুল ও রাজ্জাক আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের সদস্য। একই চক্রের দেশীয় সদস্য হচ্ছেন আক্কাস।

কারওয়ানবাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে ওই সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, সম্প্রতি ভূমধ্যসাগরে নৌযান ডুবে ৩৯ বাংলাদেশি নিহতের ঘটনার তদন্তে নেমে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। ওই দুর্ঘটনার পর থেকেই তারা রাজধানীতে আত্মগোপনে ছিলেন এবং বিদেশে পালানোর সুযোগ খুঁজছিলেন। এই চক্রের সদস্যরা লোভের ফাঁদে ফেলে বাংলাদেশিদের অবৈধভাবে বিদেশে পাঠানোর নামে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছেন। তারা মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিলেন। তাদের সিলেটের জিন্দাবাজারে ইয়াহিয়া ওভারসিজ নামে একটি এজেন্সি রয়েছে।

গত ৯ মে লিবিয়ার জুয়ারা থেকে অবৈধভাবে ইতালি গমনকালে ভূমধ্যসাগরের তিউনিসিয়া উপকূলে নৌকাডুবিতে ৮৫-৯০ জন প্রাণ হারান। তাদের মধ্যে ৩৯ জন বাংলাদেশি ছিলেন। নিহত ও নিখোঁজ বাংলাদেশিদের বেশিরভাগের বাড়ি বৃহত্তর সিলেট, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, কিশোরগঞ্জ ও নোয়াখালীতে; তাদের মধ্যে ফেঞ্চুগঞ্জের চারজনসহ অন্তত ২২ জনের বাড়ি বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে। এ ঘটনায় স্বজনরা শরীয়তপুরের নড়িয়া ও সিলেটের বিশ্বনাথ থানায় দুটি মামলা করেছেন।

গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ফেঞ্চুগঞ্জ থানায় ২০ জনকে আসামি করে মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ দমন আইনে মামলা করেন ওই নৌকাডুবিতে নিহত আবদুল আজিজের ভাই মফিজউদ্দিন। এজাহারে সিলেটের রাজা ম্যানশনের নিউ ইয়াহিয়া ওভারসিজের মালিক গোলাপগঞ্জ উপজেলার পনাইরচক গ্রামের এনামুল হক, একই উপজেলার হাওরতলা গ্রামের ইলিয়াস মিয়ার ছেলে জায়েদ আহমেদ, ঢাকার রাজ্জাক হোসেন, সাইফুল ইসলাম, মঞ্জুর ইসলাম ওরফে গুডলাক ও তাদের ১০-১৫ জন অজ্ঞাত সহযোগীকে আসামি করা হয়েছে।

মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, ভূমধ্যসাগরে নিহত হওয়ার আগে বাংলাদেশিদের গত বছরের ৪ ডিসেম্বর থেকে লিবিয়ায় আটকে রেখে বিভিন্ন সময়ে মারধর করা হয়। দেশে তাদের স্বজনদের কাছ থেকে মুক্তিপণও আদায় করা হয়।

মুফতি মাহমুদ বলেন, ওই দুই মামলার পর র‌্যাব ছায়া তদন্ত শুরু এবং গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করে। একপর্যায়ে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মানবপাচারে জড়িত সংঘবদ্ধ চক্রের ওই তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই চক্রটি বিদেশি চক্রের যোগসাজশে অবৈধভাবে ইউরোপে মানবপাচার করে থাকে। সিন্ডিকেটটি তিনটি ধাপে কাজ করে থাকে। প্রথমে বিদেশে যেতে ইচ্ছুকদের তালিকা করে, এরপর তাদের বাংলাদেশ থেকে লিবিয়ায় পাঠানো হয়। তারপর তাদের ইউরোপে পাঠানো হয়। তারা বিদেশ গমনেচ্ছুদের একেকজনের কাছ থেকে ৭-৮ লাখ টাকা নিয়ে প্রতারণার ফাঁদ পাতে। এর মধ্যে সাড়ে ৪ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা যাওয়ার আগেই দিতে হয় তাদের। লিবিয়া যাওয়ার পর বাকি টাকা তাদের স্বজনদের কাছ থেকে নেওয়া হয়। টাকা দিয়েও অনেকে রক্ষা পায় না। তাদের আটকে রেখে দেশে স্বজনদের কাছ থেকে আরও টাকা নেওয়া হয়। অন্যথায় তাদের মারধর করা হয়।

তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে অন্তত ১০-১৫টি চক্র মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত। মানবপাচার চক্রের পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ করতে দুই মাস থেকে এক বছর পর্যন্তলাগে। প্রথমে ইউরোপ যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে এরা সারা দেশ থেকে লোক সংগ্রহ করে। এরপর তাদের সড়ক-বিমান পথ মিলিয়ে তিনটি রুটে লিবিয়ায় পাঠায়। সর্বশেষ নৌপথে লিবিয়া থেকে তিউনিসিয়ার উপকূল হয়ে তাদের ইউরোপে পাঠানো হয়। ভূমধ্যসাগরের ঘটনায় ১৪ জন জীবিত উদ্ধার হলেও বাকিদের এখনো খোঁজ নেই। পাঁচ থেকে ছয়টি চক্রের মাধ্যমে পাচার হওয়া বাংলাদেশিরা সেদিন নৌ-দুর্ঘটনায় পতিত হন বলে জানা গেছে। তাদের পাসপোর্ট তৈরি, ভিসা সংগ্রহ, টিকিট কেনাসহ যাবতীয় কাজ দালাল সিন্ডিকেটের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপে পাচারে তিনটি রুট ব্যবহৃত হয় জানিয়ে মুফতি মাহমুদ খান বলেন, রুটগুলো হলোÑ বাংলাদেশ-তুরস্কের ইস্তাম্বুল-লিবিয়া, বাংলাদেশ-ভারত-শ্রীলঙ্কা (৪-৫ দিন অবস্থান)-ইস্তাম্বুল (ট্রানজিট)-লিবিয়া এবং বাংলাদেশ-দুবাই (৭-৮ দিন অবস্থান)-আম্মান (জর্ডান) (ট্রানজিট)-বেনগাজি (লিবিয়া)-ত্রিপোলি (লিবিয়া)। এ ক্ষেত্রে সড়ক ও আকাশপথে তাদের লিবিয়া পাঠানো হয়। সর্বশেষ লিবিয়া থেকে নৌপথে তিউনিসিয়ার উপকূল হয়ে ইউরোপে পাচার করা হয়ে থাকে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, র‌্যাব প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত ২০৯টি অভিযান চালিয়ে মানবপাচারে জড়িত ৬০৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এছাড়া ৭০৪ জন পুরুষ ও ১১০ জন নারীসহ ৮১৪ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।

র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা জানিয়েছেন, প্রথমে ইউরোপ গমনেচ্ছুদের বাংলাদেশ থেকে বাসে কলকাতা এবং কলকাতা থেকে বিমানে দিল্লিতে পাঠানো হয়। সেখান থেকে বিমানে শ্রীলঙ্কায় নেওয়ার পর একই সিন্ডিকেটের দালালদের তত্ত্বাবধানে বেশ কয়েক দিন রাখা হয়। তারপর ত্রিপোলি (লিবিয়া) থেকে বাংলাদেশি একজন দালাল ‘ওকে টু বোর্ড’ ডকুমেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শ্রীলঙ্কার এজেন্টদের কাছে পাঠান। এরপর শ্রীলঙ্কার এজেন্টরা তাদের ওই ডকুমেন্ট হস্তান্তর করেন। পরে এজেন্টরা তাদের বিমানযোগে ইস্তাম্বুলে ট্রানজিট হয়ে ত্রিপোলি পাঠানোর ব্যবস্থা করে।

তারা আরও জানান, বাংলাদেশ থেকে দুবাই হয়েও তাদের লিবিয়ায় পাঠানো হয়। দুবাইয়ে পৌঁছার পর তাদের বিদেশি এজেন্টের তত্ত্বাবধানে ৭-৮ দিন রাখা হয়। বেনগাজিতে পাঠানোর লক্ষ্যে সেখান থেকে এজেন্টরা ‘মরাকাপা’ নামে একটি ডকুমেন্ট দুবাইতে পাঠিয়ে থাকে; যা দুবাইয়ে অবস্থানরত বিদেশি এজেন্টদের মাধ্যমে তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর ওই ডকুমেন্টসহ বিদেশি এজেন্ট তাদের আম্মান (জর্ডান) ট্রানজিট নিয়ে বেনগাজি পাঠায়। বেনগাজি থেকে বাংলাদেশি এজেন্ট তাদের ত্রিপোলিতে স্থানান্তর করে।

র‌্যাব জানায়, এনামুল হক ও রাজ্জাক একই সিন্ডিকেটের সদস্য। বিএ পাস এনামুলের সিলেটের জিন্দাবাজারে ইয়াহিয়া ওভারসিজ নামে একটি এজেন্সি রয়েছে। তিনি এ কাজে প্রায় ১০-১২ বছর নিয়োজিত। এইচএসসি পাস রাজ্জাক প্রায় ৪-৫ বছর ধরে এনামুলের ‘দালাল’ হিসেবে কাজ করছেন। অন্যদিকে আক্কাস মাতুব্বর ২-৩ বছর যাবত দালাল হিসেবে কাজ করেছেন।

লিবিয়া থেকে ইউরোপ : বিদেশ গমনেচ্ছুরা ত্রিপোলিতে পৌঁছার পর সেখানে অবস্থানরত বাংলাদেশি ‘গুডলাক ভাই’সহ আরও কয়েকজন এজেন্ট তাদের গ্রহণ করেন। তাদের ত্রিপোলিতে বেশ কয়েক দিন রাখা হয়। সেখানে অবস্থানকালে এজেন্টদের দেশীয় প্রতিনিধিরা তাদের স্বজনদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করেন। এরপর তাদের ত্রিপোলির বন্দর এলাকায় একটি সিন্ডিকেটের কাছে অর্থের বিনিময়ে ইউরোপে পাচারের উদ্দেশ্যে হস্তাান্তর করা হয়। ওই সিন্ডিকেট তাদের একটি নির্দিষ্ট স্থানে আটকে রাখে। তারপর তাদের নৌযান চালনা এবং দিকনির্ণয় যন্ত্র পরিচালনাসহ আনুষঙ্গিক বিষয়ের ওপর নানাবিধ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এরপর নির্দিষ্ট দিনে ভোর রাতে একসঙ্গে কয়েকটি নৌযান লিবিয়া হয়ে তিউনিসিয়া উপকূলীয় চ্যানেল হয়ে ইউরোপের পথে রওনা দেয়।