অনলাইন মার্কেটিংয়ের নামে প্রতারণা

রেক্স আইটি মালিক পলাশের সম্পদের সন্ধানে সিআইডি

অনলাইন মার্কেটিংয়ের নামে দেড় হাজার গ্রাহকের ২০০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ হাতিয়ে নেওয়া রেক্স আইটি ইনস্টিটিউটের মালিক আবদুস সালাম পলাশের সম্পদের সন্ধানে নেমেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণার মাধ্যমে গড়ে তোলা তার বিপুল সম্পদের সন্ধানও পেতে শুরু করেছে সংস্থাটি। এরই মধ্যে ঢাকা ও সাভারে ৫৮ কাঠা জমির তিনটি প্লট, ঢাকার মোহাম্মদপুরে একটি ফ্ল্যাট এবং পলাশ, তার স্ত্রী ও রেক্স আইটি ইনস্টিটিউটের নামে ১৬টি ব্যাংক হিসাবের সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব ব্যাংক হিসাব এর মধ্যেই ফ্রিজ করা হয়েছে। তবে এসব হিসাবে কী পরিমাণ অর্থ জমা আছে তা জানাতে পারেননি সিআইডি কর্মকর্তারা। পলাশ রেক্স আইটি ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে অনলাইন মার্কেটিংয়ের নামে প্রতারণা করে দেড় হাজার গ্রাহকের কাছ থেকে ২০০ কোটির বেশি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। এমনই একজন ভুক্তভোগীর ধানম-ি থানায় করা প্রতারণা মামলায় গত ১০ মে রাতে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় পলাশকে। তার বাড়ি লক্ষ্মীপুরের কল্যাণপুর চন্দ্রগঞ্জে। পলাশকে সহযোগিতার অভিযোগে তার স্ত্রী মনিরাতুল জান্নাত এবং মামাশ্বশুর আহমেদুল রহমানকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পলাশের প্রতারণার শিকার হয়ে সর্বস্বান্ত হওয়া অনেকেই এখন প্রতিদিন ভিড় করছেন সিআইডি কার্যালয়ে। প্রতারণার শিকার এসব বিনিয়োগকারীর অর্থ ফেরত পেতে সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা করার পরামর্শ দিচ্ছেন সিআইডি কর্মকর্তারা।

সিআইডির বিশেষ সুপার (অর্গানাইজড ক্রাইম) মোল্লা নজরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পলাশ কোথায় কোথায় সম্পদ গড়েছে তার অনুসন্ধান করছি আমরা। এরই মধ্যে বেশকিছু সম্পদের সন্ধানও পেয়েছি। অনুসন্ধান শেষে তার যে সম্পদ পাব তার হিসাব আমরা কোর্টে দিয়ে দেব। কোর্ট ঠিক করবে ভুক্তভোগীদের মধ্যে ওই সম্পদ কীভাবে বণ্টন করবে।’

পলাশের ব্যাংক হিসেবে কী পরিমাণ টাকা জমা আছে তা জানতে চাইলে এই সিআইডি কর্মকর্তা বলেন, ‘বিভিন্ন ব্যাংকে তার বেশকিছু অ্যাকাউন্ট পাওয়া গেছে। সেগুলো ফ্রিজ করা হয়েছে। টাকার পরিমাণ এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। এছাড়া অন্যান্য ব্যাংকে তার আরও অ্যাকাউন্ট আছে কি না তা জানতে সব তফসিলি ব্যাংকে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।’

মোল্লা নজরুল আরও বলেন, ‘ভুক্তভোগীদের আমরা বলেছি থানায় মামলা করতে। যে যেখানে পলাশকে টাকা দিয়েছেন, সেই স্থানের সংশ্লিষ্ট থানায় পলাশের বিরুদ্ধে মামলা করতে বলা হয়েছে।’

পলাশের প্রতারণার শিকার হওয়াদের মধ্যে একজন পটুয়াখালীর ফিরোজ শিকদার। থাকেন রাজধানীর মোহাম্মদপুরে। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘আইটি ভিশনে একটি কোর্স করার সময় ওই প্রতিষ্ঠানের শামীম নামে একজনের মাধ্যমে পলাশকে ২০১৭ সালে ১৫ লাখ টাকা নগদ দিই। ধারদেনা করে দেওয়া ওই টাকা যদি ফেরত না পাই তাহলে খুবই খারাপ অবস্থায় পড়ে যাব। টাকা ফেরত পেতে সিআইডি কর্মকর্তাদের কথা অনুযায়ী মোহাম্মদপুর থানায় একটি মামলা করেছি।’

হাসান মাহমুদ নামে আরেক ভুক্তভোগী বলেন, ‘পলাশের কথা অনুযায়ী আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে ধারদেনা করে ৫১ হাজার ৯০০ ডলার বিনিয়োগ করেছিলাম। এখন সর্বস্বান্ত হয়ে পথে বসেছি।’

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এ দুজনের মতো প্রায় দেড় হাজার লোক লোভে পড়ে স্বল্প সময়ে অধিক লাভের আশায় পলাশকে অর্থ দেন। কেউ দিয়েছেন ডলারে, আবার কেউবা টাকায়।

সিআইডির অনুসন্ধানে পলাশের নিজের নামে পূর্বাচলে ৪০ কাঠা ও ৬ কাঠা আয়তনের দুটি প্লট, সাভারে ১২ কাঠা জমি এবং রাজধানীর মোহাম্মদপুরের রোকেয়া গার্ডেনে একটি ফ্ল্যাটের সন্ধান পাওয়া গেছে। কয়েকটি দামি গাড়িও রয়েছে তার। এর মধ্যে রয়েছে একটি পাজেরো ভি-৬ (২০০৫ মডেল) এবং একটি এক্স-প্রিমিও। এছাড়া গ্রেপ্তারের সময় পলাশের কাছ থেকে ডেল ব্যান্ডের পাঁচটি ল্যাপটপ এবং ৬ লাখ ৭১ হাজার টাকা উদ্ধার করে সিআইডি। তার নিজের নামে সিটি ব্যাংকে আটটি, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকে তিনটি এবং রেক্স আইটির নামে ইস্টার্ন ব্যাংক ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে একটি করে অ্যাকাউন্ট রয়েছে। এই অ্যাকাউন্টগুলো এর মধ্যেই ফ্রিজ করা হয়েছে।

পলাশকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে সিআইডির এক কর্মকর্তা জানান, রেক্স আইটি ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে প্রথমে ফ্রি মার্কেটিং ক্যাম্পেইনে আগ্রহীদের নিয়োগ করা হতো। পরে তাদের পেইড মার্কেটিংয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া হতো। এসব লোককে বলা হতো, পেইড মার্কেটিংয়ের জন্য তাদের পেপাল অথবা ইন্টারন্যাশনাল গেটওয়েসহ কার্ড থাকতে হবে। আর বাংলাদেশে যেহেতু তখন পেপালের কার্যক্রম ছিল না তাই তারা তখন সরাসরি মার্কেটিং করতে পারবে না বলে জানানো হতো। তখন পলাশের বিদেশি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ক্যাম্পেইন চালানোর কথা বলে টাকা হাতিয়ে নেওয়া হতো। এভাবেই কোনো কোনো বিনিয়োগকারী অনলাইন মার্কেটিংয়ের নামে ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করে সর্বস্বান্ত হয়েছেন।