মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতির জন্য ন্যূনতম বয়সের বিধান বাতিল

মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতির ক্ষেত্রে ন্যূনতম বয়স নির্ধারণ করে সরকারের জারি করা পরিপত্র অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট। পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট আইন, ২০১৮ এর ২ (১১) ধারা অনুযায়ী সরকার কর্র্তৃক ওই বয়সসীমা নির্ধারণের বিধানকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছে আদালত।

বয়সসীমা নির্ধারণের ওই পরিপত্র চ্যালেঞ্জ করে ১৫ জন মুক্তিযোদ্ধার করা আলাদা রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দেওয়া রুল যথাযথ ঘোষণা করে গতকাল রবিবার

বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেয়। রায়ে আবেদনকারী মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা নতুন করে চালুসহ তাদের বকেয়া ভাতা পরিশোধ করতে বলেছে আদালত। রায়ের অনুলিপি পাওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে এ আদেশ কার্যকর করতে বলা হয়েছে।

আদালতে রিটকারীদের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী এ বি এম আলতাফ হোসেন ও ওমর সাদাত। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মোখলেছুর রহমান।

২০১৬ সালে সরকারি এক গেজেটে বলা হয়, মুক্তিযোদ্ধা নির্ধারণে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ পর্যন্ত ন্যূনতম বয়স হতে হবে ১৩ বছর। এরপর ২০১৮ সালের ১৭ জানুয়ারি পরিপত্রের মাধ্যমে ওই গেজেট সংশোধন করে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের ন্যূনতম বয়স হতে হবে ১২ বছর ৬ মাস।

এ দুটি গেজেট ও মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতির ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট আইন, ২০১৮ এর ২ (১১) ধারা চ্যালেঞ্জ করে ২০১৬, ’১৭ ও ’১৮ সালের বিভিন্ন সময়ে ১৫ জন মুক্তিযোদ্ধা রিট আবেদন করেন। রিটের ওপর শুনানি নিয়ে বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০১৮ সালের ১৫ জুলাই এক আদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের ন্যূনতম বয়স সাড়ে ১২ বছর নির্ধারণ কেন আইনগত কর্র্তৃত্ববহির্ভূত হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করে। সেই রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে গতকাল এ রায় হলো।

মুক্তিযোদ্ধাদের বয়সের ফ্রেমে বাঁধা যায় না : রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলে, ‘১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার যে ঘোষণা দিয়েছিলেন সেখানে ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে সকলকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। সেখানে বয়সের কোনো কথা উল্লেখ ছিল না।’

আদালত বলে, ‘মুক্তিযোদ্ধা ও বীর প্রতীক খেতাবধারী শহিদুল ইসলাম লালু মাত্র ১০ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। বঙ্গবন্ধু তাকে কোলে তোলে নিয়ে বীরপ্রতীক খেতাব দেন। কিন্তু বয়স নির্ধারণ করে দেওয়ায় তার নাম মুক্তিযোদ্ধা তালিকা থেকে বাদ রয়ে গেছে। এটি মেনে নেওয়া যায় না।’

হাইকোর্ট আরও বলে, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের সাড়ে ১২ বছর বয়স নির্ধারণ সংবিধানের প্রস্তাবনা ও সংবিধানের পঞ্চম তফসিলে বর্ণিত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’

মুক্তিযোদ্ধা নির্দ্দিষ্ট করতে বয়স নির্ধারণের ওই পরিপত্রকে ভ্রান্ত উল্লেখ করে আদালত বলে, ‘সরকারের এই পরিপত্রের কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের যাদের বয়স তখন সাড়ে ১২ বছরের কম ছিল তারা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বিবেচিত হবে না। কোনো রকম চিন্তা-ভাবনা না করেই এই বিধানটি করা হয়েছে।’

রায়ের একপর্যায়ে বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর দেওয়া স্বাধীনতার ঘোষণাটি পড়ার একপর্যায়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, ‘যে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর ভিত্তি করে দেশ স্বাধীন হয়েছে, সেই মুক্তিযোদ্ধাদের যদি আমরা অস্বীকার করি তাহলে দেশ হিসেবে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারব না।’

আদালত বলে, ‘শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর কোথাও মুক্তিযোদ্ধাদের বয়সের ফ্রেমে বাঁধা যায় না। মানুষ মুক্তিযুদ্ধ করে ভালোবাসা ও আবেগের তাড়না থেকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অনেকেই সাত, আট বছর বয়সেও যুদ্ধ করেছে। বাংলাদেশে অনেক বই ও সিনেমা তৈরি হয়েছে শিশু মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে।’