আমদানি নিয়ন্ত্রণ করে রপ্তানিতে ভর্তুকির আশ্বাস অর্থমন্ত্রীর

ধানের যৌক্তিক মূল্য নিশ্চিতের দাবি দেশের বিভিন্ন স্থানে কৃষক, রাজনেতিক দল ও শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন এবং প্রতিবাদ কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। এসব কর্মসূচি থেকে সরাসরি কৃষকের থেকে ধান ক্রয়সহ সরকারিভাবে ঘোষণা দিয়ে দাম বাড়ানোর দাবি জানানো হয়। সরাসরি ও নির্ধারিত মূল্যে কৃষকের ধান কিনতে খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর আইনি নোটিস পাঠানোও হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, তিন দিনের মধ্যে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলে হাইকোর্টে মামলা করা হবে।

এদিকে ধানে যৌক্তিক মূল্য নিশ্চিত করতে সরকার চাল আমদানি নিয়ন্ত্রণ করবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এছাড়া চাল রপ্তানি করতে প্রয়োজনে ভর্তুকি দেওয়ারও আশ্বাস দেন তিনি।

এ বছর সরকার ২৬ টাকা কেজি দরে ধান কিনছে। সে হিসাবে প্রতি মণ ধানের দাম দাঁড়ায় ১০৪০ টাকা। অথচ এলাকাভেদে ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে কৃষকের ধান।

গতকাল রবিবার রাজশাহী, দিনাজপুর, সিলেটে ধানের যৌক্তিক মূল্য নিশ্চিতের দাবিতে করা মানববন্ধন, নীলফামারীতে সরাসরি কৃষকের ধান ক্রয় ও সচিবালয়ে ধানের আমদানি নিয়ে অর্থমন্ত্রীর আশ্বাসের খবর পাঠিয়েছেন দেশ রূপান্তরের প্রতিনিধি ও প্রতিবেদকরা।

কৃষকের ধান কিনতে আইনি নোটিস

সরাসরি ও নির্ধারিত মূল্যে কৃষকের ধান কিনতে খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর আইনি নোটিস পাঠানো হয়েছে। গতকাল সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইমদাদুল হক সুমন রেজিস্ট্রি ডাকযোগে এ নোটিস পাঠান। আগামী তিন দিনের মধ্যে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলে, প্রতিকার চেয়ে হাইকোর্টে মামলা করা হবে বলে নোটিসে উল্লেখ করা হয়েছে। নোটিসে কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে ধান ক্রয় করা, চাল আমদানির অনুমতি বাতিল করা এবং চাল রপ্তানির অনুমতি দিতে পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে কৃষকরা যেন ন্যায্যমূল্য পান, সে লক্ষ্যে একটি নীতিমালা তৈরি করতে সরকারকে উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে।

 

ধানের দাম ১১০০ টাকা মণ করার দাবি

ধানের দাম মণপ্রতি কমপক্ষে ১১০০ টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা। গতকাল রাজশাহী জেলা ও মহানগর ওয়ার্কার্স পার্টির এক সমাবেশে তিনি বলেন, দেশে একটা সময় দুর্ভিক্ষে মানুষ মারা যেত। প্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষকদের হাড়ভাঙা খাটুনিতে এখন কৃষির উন্নয়ন হয়েছে। কৃষকরাই দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছেন। অথচ কৃষক না খেয়ে মরছে। বাদশা বলেন, উন্নয়নের নামে দেশে বৈষম্য বেড়েছে। এই বৈষম্য দূর না হলে বঞ্চিত মানুষ রাস্তায় নামতে পারে। বৈষম্যহীন সমাজের জন্য গোটা দেশে সংগ্রাম গড়ে উঠতে পারে। তখন পরিস্থিতি ভালো হবে না। এজন্য সরকারকে এখনই ভাবতে হবে। কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। এই মুহূর্তে ধানের দাম কমপক্ষে ১ হাজার ১০০ টাকা নির্ধারণ করতে হবে।

 

সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনার দাবি

বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাতীয় কৃষক সমিতি দিনাজপুর জেলা শাখা সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে ধান ক্রয় করার দাবি জানিয়েছে। গতকালের কর্মসূচি থেকে প্রতিটি ইউনিয়নের হাটবাজারে ধান ক্রয় কেন্দ্র চালুর দাবিসহ চার দফা দাবিও জানানো হয় দলটির পক্ষ থেকে।

একই দাবি জানিয়েছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) শিক্ষার্থীরা। গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তারা বলেন, ন্যায্যমূল্যে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনতে হবে, প্রতি ইউনিয়ন হাটে সরকারি কেন্দ্র খুলে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয় করতে হবে, ক্ষতিতে ধান বিক্রয় করা কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, বিনা সুদে কৃষককে ঋণ প্রদান করতে হবে। এছাড়া ধান-চাল আমদানি বন্ধ করে রপ্তানির ব্যবস্থা করতে হবে।

 

সরকার চাল আমদানি নিয়ন্ত্রণ করবে

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জানিয়েছেন, কৃষক যাতে ধানের ন্যায্যমূল্য পায়, সেটি নিশ্চিত করতে সরকার চাল আমদানি নিয়ন্ত্রণ করবে। কৃষক বাঁচাতে প্রয়োজনে ভর্তুকি দিয়ে হলেও চাল রপ্তানি করা হবে। অর্থমন্ত্রী বলেন, কৃষক ও কৃষি আমাদের প্রধান চালিকাশক্তি। কৃষক হলো আমাদের প্রাণশক্তি। চাল আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করা যেহেতু যাবে না; তবে চাল আমদানি সীমিত করা হবে।

গতকাল রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে নিজ দপ্তরে কৃষি উন্নয়ন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজের সঙ্গে এক বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী বলেন, এ বছর খাদ্যশস্যের ব্যাপক উৎপাদন হয়েছে। আমন ও বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে। শুধু বাংলাদেশেই নয়; দেশের বাইরেও ব্যাপক খাদ্যশস্যের ফলন হয়েছে। তাই দেশে তো বটে, বাইরেও ধানের চাহিদা নেই।

অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে শস্য বীমা চালু করার কথা বলে আসছেন মুস্তফা কামাল। তবে গতকাল তিনি বলেন, শস্য বীমা চালু করে পৃথিবীর সব দেশ ব্যর্থ হয়েছে। এখন যেমন কৃষক আন্তরিকতার সঙ্গে খাদ্যশস্য ফলে, শস্য বীমা চালুর পর সে আন্তরিকতা আর থাকবে না। এতে করে বছরের পর বছর ধরে চলে আসা কৃষিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটবে।

 

‘মোর জীবনোত প্রথম সরকারের কাছোত ধান বেচানু’

নীলফামারীতে কৃষকের বাড়িতে গিয়ে ধান ক্রয় শুরু করেছে করছে খাদ্য বিভাগ। সেখানে সরাসরি ধান বিক্রি করতে পেরে উচ্ছ্বসিত অনেক কৃষক। জেলা সদরের টুপামারী ইউনিয়নের আদর্শপাড়া গ্রামের কৃষক রুবিনা বেগম স্বস্তি প্রকাশ করে বলেন, ‘মোর জীবনোত প্রথম সরকারের কাছোত ধান বেচানু। এর আগোত অনেক চেষ্টা করিয়াও সরকারের কাছোত ধান বিক্রি করির পাও নাই। অ্যাইজ সরকারের লোকজন মোর বাড়িত আসিয়া মোর কাছোত ধান কিনি নিয়া গেইল। মুই কোন দিন ভাবো নাই স্যারেরঘর মোর বাড়িত আসি মোর কাছোত ধান কিনেবে।’

রুবিনা জানান, এবার দুই একর জমিতে বোরো আবাদ করেন তিনি। চারা রোপণ থেকে শুরু করে কাটা-মাড়াই পর্যন্ত প্রতি বিঘায় তার খরচ হয়েছে ১৩ হাজার ৫০০ টাকা। প্রকৃতি অনুকূলে থাকায় দুই একর জমিতে অনেক ধান ফলেছে। ধান কাটা-মাড়াই শেষ করেছেন তিনি। কিন্তু উৎপাদন খরচের চেয়ে বাজারে ধানের দাম অনেক কম থাকায় বেশ উৎকণ্ঠায় ছিলেন। গতকাল বিকেলে কৃষক রুবিনা বেগমের সেই উৎকণ্ঠার অবসান ঘটে। সরকারের ধান ক্রয় কমিটির লোকজন বাড়িতে গিয়ে তার কাছ থেকে সরাসরি এক মেট্রিক টন ধান ক্রয় করায়।

গতকাল বিকেলে কৃষকের বাড়িতে গিয়ে ধান কিনে সরকারি ক্রয় অভিযানের উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক নাজিয়া শিরিন। তিনি বলেন, ধান ক্রয়ে আমরা অগ্রাধিকার দিচ্ছি নারী কৃষকদের। যারা স্বামীর সঙ্গে সরাসরি কৃষিতে জড়িত আছেন তারাও ওই তালিকার মধ্যে আসবেন। বাজারে ধানের নায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারি ক্রয়ের পাশাপাশি মিল মালিকদেরও কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয় করার জন্য অনুরোধ জানান তিনি।