বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে চিকিৎসক নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ শেষাবধি আদালত পর্যন্ত গড়াল। মেডিকেল ও ডেন্টাল সার্জারি বিভাগে ২০০ মেডিকেল অফিসার নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা বাতিল করে পুনরায় তা গ্রহণের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার এ রিটের শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ডা. মো. আবদুর রহিমসহ ৭১ জন মেডিকেল অফিসার (এমবিবিএস) ও মেডিকেল অফিসার (ডেন্টাল সার্জারি) পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ডা. মো. জসিমউদ্দিন হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় রিট দুটি করেন। গত ২২ মার্চ হওয়া পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, ভুল প্রশ্নে পরীক্ষা গ্রহণ এবং নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলে তা বাতিল করে পুনরায় পরীক্ষা গ্রহণের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে আবেদনে। স্বাস্থ্যসচিব, বিএসএমএমইউর উপাচার্য, রেজিস্ট্রার,পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকসহ সংশ্লিষ্ট পাঁচজনকে রিটে বিবাদী করা হয়েছে।
রিটকারীদের আইনজীবী ব্যারিস্টার মো. হুমায়ুন কবির পল্লব দেশ রূপান্তরকে জানান, মঙ্গলবার বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও রাজিক আল জলিলের হাইকোর্ট বেঞ্চে এ বিষয়ে শুনানি হবে।
এদিকে বিএসএমএমইউ উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়–য়ার মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় তার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলা সম্ভব হয়নি। ফোন ধরেননি পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ইফতেখার আলম। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পরীক্ষার্থীদের বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ জবাব তৈরি করেছেন। সেটি গণমাধ্যমকে কীভাবে জানানো হবে, তা ঠিক হয়নি।
পরীক্ষার ১ মাস ২০ দিন পর গত ১২ মে মেডিকেল অফিসার নিয়োগের লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল হান্নান স্বাক্ষরিত এই ফলাফলে বলা হয়েছে, মৌখিক পরীক্ষার তারিখ পরে জানানো হবে।
ফল প্রকাশের পর পরীক্ষায় দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতিসহ ছয়টি অসংগতি তুলে ধরেন পরীক্ষার্থীরা। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ফল প্রকাশের দিন থেকেই ফল বাতিল ও পুনঃপরীক্ষা গ্রহণ এবং উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়–য়ার পদত্যাগের দাবিতে বিএসএমএমইউতে বিক্ষোভ শুরু করেন পরীক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে উপাচার্যের পদত্যাগ ও পরীক্ষায় অনিয়ম সংবলিত পোস্টার সাঁটানোর পাশাপাশি দেয়াল লিখনও করা হয়েছে। পাশাপাশি উপাচার্যের কাছে লিখিত অভিযোগও তুলে ধরেন তারা।
এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষের কোনো সাড়া না পেয়ে গত ১৮ মে অভিযোগের পক্ষে আরও সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণাদি নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন পরীক্ষার্থীরা। সর্বশেষ আদালতে রিট করেন তারা।
গত ২২ মার্চ সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত বুয়েটের মূল ক্যাম্পাস (পশ্চিম পলাশী ক্যাম্পাস) এবং ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি স্কুল অ্যান্ড কলেজে (বুয়েট ক্যাম্পাস) ওই লিখিত পরীক্ষা হয়। ২০০টি পদের মধ্যে মেডিকেল অফিসার (এমবিবিএস) হিসেবে ১৮০টি এবং মেডিকেল অফিসার (ডেন্টাল সার্জারি) হিসেবে ২০টি পদে নিয়োগ পেতে পরীক্ষায় অংশ নেন আট হাজার চিকিৎসক। নিয়ম অনুযায়ী, পরীক্ষার দিনই ফল প্রকাশের কথা থাকলেও পরীক্ষার ১ মাস ২০ দিন পর তা প্রকাশ করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ২০০ মেডিকেল অফিসার নিয়োগ দিতে ২০১৭ সালের ১ অক্টোবর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে কর্র্তৃপক্ষ। দীর্ঘদিন নিয়োগ বন্ধ থাকায় এ নিয়োগ পেতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে সরকারপক্ষের লোকজন। বিশেষ করে সরকার সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) ও বিভিন্ন গ্রুপ থেকে ১৮০০-এর মতো নাম আসে। পাশাপাশি পরীক্ষা ছাড়াই সরকারদলীয় চিকিৎসকদের নিয়োগ দিতেও চাপ দেওয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে। পরে বাধ্য হয়ে সে সময় নিয়োগ বন্ধ রাখা হয়। এরপর বর্তমান উপাচার্য পুনরায় নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করেন। কিন্তু এ সময়েও দুবার পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। অবশেষে এ বছরের ২২ মার্চ পরীক্ষা নেওয়া হয়। ফল প্রকাশ হয় গত ১২ মে।
ফল প্রকাশের পর থেকেই পরীক্ষার্থীরা উপাচার্যের বিরুদ্ধে পরীক্ষায় অনিয়মের নানা অভিযোগ আনতে শুরু করেন। প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ করা হয়। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ছেলে, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের জামাতা ও উপাচার্যের ব্যক্তিগত সহকারী-২-এর স্ত্রীসহ প্রশাসনিক বিভিন্ন কর্মকর্তার স্বজনরা উত্তীর্ণ হওয়ায় স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ওঠে। এসব অনিয়মের ব্যাপারে উপাচার্য ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে পরীক্ষার আগে ও পরে প্রমাণসহ লিখিত এবং মৌখিক অভিযোগ করেন পরীক্ষার্থীরা। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেগুলো আমলে না নেওয়ায় প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তারা।