বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসক নিয়োগ

বিজ্ঞপ্তি দিয়ে অভিযোগ অস্বীকার আদালতে যাচ্ছেন পরীক্ষার্থীরা

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে মেডিকেল অফিসার নিয়োগে লিখিত পরীক্ষা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ হয়েছে বলে দাবি করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। গতকাল মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পরীক্ষায় নানা অসংগতির অভিযোগ ভিত্তিহীন। ফলাফল বাতিলের দাবি অযৌক্তিক। লিখিত পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণরাই অনিয়মের অপপ্রচার চালাচ্ছে এবং পুনঃপরীক্ষা গ্রহণের অবকাশ নেই বলেও বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।

ফল প্রকাশের ৯ দিনের মাথায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পরীক্ষার্থীদের বিভিন্ন অভিযোগের জবাব দিলেন। বিজ্ঞপ্তিতে গত ১৮ মে পরীক্ষার্থীদের সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা সুনির্দিষ্ট ছয়টি অভিযোগের ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের অবস্থান তুলে ধরেছেন।

বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসনের এই বিজ্ঞপ্তিকে ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকার শামিল’ বলে মনে করছেন পরীক্ষার্থীরা। শিগগির এই বিজ্ঞপ্তির পরিপ্রেক্ষিতে অভিযোগগুলো আরও সুনির্দিষ্টভাবে গণমাধ্যমের কাছে তুলে ধরবেন বলে জানান আন্দোলনরত পরীক্ষার্থীদের প্রতিনিধি ডা. মাইদুল হাসান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই দুর্নীতিগ্রস্ত’ প্রশাসন যে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে তা স্রেফ মিথ্যাচার। ভালো করে এই প্রেস বিজ্ঞপ্তি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় এটি অনিয়মের স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য। এই বিজ্ঞপ্তির মধ্য দিয়ে অভিযোগের  মিথ্যা ও অযৌক্তিক ব্যাখ্যা  দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। শিগগির আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিজ্ঞপ্তির জবাব দেওয়া হবে।

পরীক্ষার আগে ও গত ১২ মে ফল প্রকাশের পর থেকেই পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষায় নানা অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির অভিযোগ করে আসছে। ফল বাতিল করে পুনরায় পরীক্ষা অনুষ্ঠান ও উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়–য়ার পদত্যাগ দাবিতে বিক্ষোভ করছেন পরীক্ষার্থীরা। এসব অভিযোগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পরীক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত       

আবেদনও জানিয়েছেন। গত ১৮ মে পরীক্ষার্থীরা সংবাদ সম্মেলন করে অনিয়মের সমস্ত তথ্য তুলে ধরেন। তারপরও বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় গত রবিবার আদালতে রিট করেছেন পরীক্ষার্থীরা। আগামীকাল রিটের শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।

গতকালের বিজ্ঞপ্তিতে বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন যে ছয়টি অভিযোগ অস্বীকার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান তুলে ধরেছেন; সেসব অভিযোগের ব্যাপারে দেশ রূপান্তরের কাছে আরও কিছু তথ্যপ্রমাণাদি দিয়েছেন পরীক্ষার্থীরা।

পরীক্ষার্থীদের প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, প্রশ্নপত্র মডারেশন, মুদ্রণ এবং প্যাকিং ও সিল করার জন্য গঠিত কমিটি অত্যন্ত সতর্কতা ও গোপনীয়তার সঙ্গে তাদের কার্যক্রম সুসম্পন্ন করেছেন। ওই কমিটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর এবং পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না এবং তাদের উপস্থিত থাকার বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার চার দিন পূর্বে কোনো বিশেষ কক্ষে প্রশ্নপত্রের সিল্ড প্যাকেট খোলার প্রয়োজন পড়ে না এবং খোলা হয়ওনি। এই অভিযোগটিও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

এ ব্যাপারে ডা. মাইদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ১৮ মার্চ সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টার মধ্যে উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. শাহানা আখতার রহমানের কক্ষে এক সভা হয়। সেখানে ডা. শাহানা আখতার রহমান, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ রফিকুল আলম ও উপ-উপাচার্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. শহিদুল্লাহ সিকদার এবং পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ইফতেখার আলম উপস্থিত ছিলেন। এ সময় সেখানে স্বাচিপ সভাপতি ও বিশ^বিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান উপস্থিত হন। প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সেখানে প্রশ্নপত্র খোলা হয়েছে।

বয়সসীমা লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রসঙ্গে বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন জানায়, সর্বোচ্চ বয়স ৩২ এর ঊর্ধ্বে ২ জন প্রার্থীর তথ্য পাওয়া গেছে। একজনকে লিখিত পরীক্ষার আগেই বাতিল করা হয়। অন্যজন ডা. বিদ্যুৎ কুমার সূত্রধরের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়েছে বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন।

এ ব্যাপারে ডা. মাইদুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাদশাহ আলমগীর নামে আরেকজনের বয়স ৩২ এর বেশি ছিল। তিনি পরীক্ষা দিয়েছেন, কিন্তু উত্তীর্ণ হননি। তা ছাড়া বয়সের তারতম্যের কারণে ৯২ জনের আবেদন বাতিল করেছে বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন। এর মধ্যে এমবিবিএসের ৭৩ জন ও ডেন্টালের ১৯ জন। ডেন্টালের পরীক্ষার্থী কম ছিল। এর মধ্যে ডা. বিদ্যুৎ কুমার সূত্রধর বাদ পড়লেন। অথচ তার সঙ্গে উপাচার্যের সেলফি আমরা ফেইসবুকে দেখেছি। এমনকি ডা. বিদ্যুৎ কুমারের জন্য সরকারদলীয় এক এমপি সুপারিশ করেছেন। এ থেকেই প্রমাণ হয় যে এখানে দুর্নীতি হয়েছে।

লিখিত পরীক্ষায় স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে উত্তীর্ণের অভিযোগ সত্য নয় বলে দাবি করেছেন বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রশ্নপত্র মডারেশন, মুদ্রণ এবং প্যাকিং ও সিল করার জন্য গঠিত কমিটিতে ভাইস-চ্যান্সেলর, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বা ভাইস-চ্যান্সেলরের পিএস-২ অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। সুতরাং তাদের সন্তান বা স্বজনদের অনিয়মের মাধ্যমে উত্তীর্ণ হওয়ার সুযোগও নেই।

এ ব্যাপারে ডা. মাইদুল হাসান জানান, উপাচার্য পরীক্ষা কমিটির সভাপতি ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ইফতেখার আলমও পরীক্ষার একটি কমিটিতে রয়েছেন। তা ছাড়া বিশ^বিদ্যালয়ের নিয়োগ পরীক্ষা একটু ব্যতিক্রম। এখানে এমসিকিউ পদ্ধতিতে পরীক্ষা হলেও রোল নম্বর ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর ছিঁড়ে নেওয়া হয় না, খাতায় থাকে। সে জন্যই সন্ধ্যায় ফল প্রকাশ করার কথা ছিল। কিন্তু তা না করে সন্ধ্যায় উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) একসঙ্গে বের হয়ে এসে জানান যে সেদিন ফল প্রকাশ করা হবে না। সুতরাং উপাচার্যের ছেলে, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের মেয়ের জামাই ও উপাচার্যের এপিএস-২ এর স্ত্রীর উত্তীর্ণের বিষয়টি স্বজনপ্রীতি ছাড়া কিছুই নয়। কারণ উপাচার্যের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো নয় বলেই বিশ^বিদ্যালয়ের দুই প্রভাবশালী সাবেক ও বর্তমান উপাচার্যের দুই ছেলেমেয়ে উত্তীর্ণ হননি। 

এমবিবিএসের প্রশ্নে ডেন্টালের পরীক্ষার বিষয়টি নিয়ে কোনো ধরনের বিতর্কের সুযোগ নেই উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পরীক্ষার হলেই তাৎক্ষণিকভাবে ডেন্টালের প্রশ্নপত্র সরবরাহ করা হয়।

বিষয়টি মিথ্যা উল্লেখ করে ডা. মাইদুল হাসান বলেন, ২১২ নম্বর কক্ষে এমবিবিএসের প্রশ্নে ডেন্টাল সার্জারি পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা দিতে হয়। সেখানে প্রশ্নপত্র বদলানো হয়নি। এ ব্যাপারে ডা. মো. জসীম উদ্দিন (রোল নং ১১৩৮৭) লিখিত আবেদন করলেও কোনো ব্যবস্থা না নিয়েই ফল প্রকাশ করা হয়েছে।

ফলাফল প্রকাশের আগেই পরীক্ষার রোল নম্বরসহ যে তালিকা পাওয়ার তথ্য সঠিক নয় ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন। কিন্তু ডা. মাইদুল হাসান বলেন, ফল প্রকাশ হয়েছে ১২ মে। অথচ আমার কাছে পুরো ফল এসেছে ৯ এপ্রিল। মিলিয়ে দেখেছি একই রেজাল্ট।

পরীক্ষা কেন্দ্রে বা হলে মোবাইল ফোন, ইলেকট্রনিক হাতঘড়ি বা অন্য কোনো ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করেছে বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ডা. মাইদুল হাসান বলেন, আমাদের কাছে প্রমাণ আছে কোন কক্ষে কীভাবে এসব ডিভাইস ব্যবহার হয়েছে এবং কর্মকর্তাদের কারা কারা জড়িত ছিলেন আমরা সবকিছু আদালতে বলব।