ট্রাম্প বনাম হুয়াউই : জিতবে কে?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুয়াউইয়ের ওপর সর্বশেষ জোরালো আঘাতটি করেছেন। গুগল ইতিমধ্যেই চীনা প্রতিষ্ঠানটিকে প্রযুক্তিসেবা বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। গত বছরের শুরু থেকেই এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এক অঘোষিত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে ট্রাম্প প্রশাসন। এই যুদ্ধ চীন-মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধের অংশ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। যুদ্ধে লড়ে যাচ্ছে হুয়াউই। যুদ্ধের দুই প্রতিপক্ষের অবস্থান নিয়ে লিখেছেন পরাগ মাঝি

 

হুয়াউইয়ের উত্থান

১৯৮৭ সাল। পকেটে মাত্র ৫ হাজার ৬০০ ডলার নিয়ে কী করা যায় এমন ভাবনা থেকেই রেন ঝেংফেই প্রতিষ্ঠা করেন হুয়াউই। প্রাথমিক পর্যায়ে এটি শুধু একটি টেলিকম্যুনিকেশন অপারেটরের লাইসেন্স পেয়েছিল। মাত্র ৩০ বছরের মধ্যেই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে হুয়াউই। বর্তমানে এটি পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ মানুষের যোগাযোগে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।

২০১৫ সাল থেকেই বিশ্বের বৃহত্তম টেলিকম নেটওয়ার্ক যন্ত্রপাতি নির্মাতা হুয়াউই। এ ক্ষেত্রে তারা প্রতিদ্বন্দ্বী এরিকসন, নকিয়া, জেডটিই ও দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাংয়ের চেয়ে এগিয়ে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে এটি মার্কিন স্মার্টফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যাপল’কে টপকে স্মার্টফোনের বাজারে দুই নম্বর অবস্থান দখল করে নেয় এবং এক নম্বরে থাকা দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিষ্ঠান স্যামসাংয়ের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করে।

মাত্র কয়েক বছর আগেই স্মার্টফোনের বাজারে প্রথম সারির কোম্পানিগুলোর তুলনায় অনেক কম আবেদন নিয়ে প্রবেশ করেছিল হুয়াউই। স্মার্টফোন ছাড়াও নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত অন্যান্য যন্ত্রপাতি নির্মাণেও কাজ করছিল প্রতিষ্ঠানটি। এটা খুব বেশিদিন আগে নয় যে, আইফোন এবং স্যামসাংয়ের মতো বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠানগুলোর তৈরি স্মার্টফোন যারা বেশি দামের জন্য কিনতে না পারত, তাদের জন্য কাছাকাছি সুবিধার ফোন হিসেবে অপেক্ষাকৃত কম দামে স্মার্টফোন বাজারে ছাড়ত হুয়াউই। বর্তমানে এই কোম্পানির সুপারস্পিডMate 10 Pro অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোনটি ইউরোপের বাজারে ১২০০ মার্কিন ডলারে দেদার বিক্রি হচ্ছে। আর সমান সুবিধা ও প্রযুক্তি সম্পন্ন স্যামসাংয়ের ‘গ্যালাক্সি নোট নাইন’ ১১১৫ মার্কিন ডলার দাম ধরা হলেও বর্তমানে দাম আরও কমিয়ে গ্রাহকদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে। রাজস্ব আয়ে মার্কিন স্মার্টফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আইফোনকেও পেছনে ফেলেছে হুয়াউই। ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠানটির রাজস্ব আয় ছিল প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার।

মার্কিন কুনজর

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রযুক্তি বাজারে সবাইকে ছাড়িয়ে হুয়াউইয়ের তরতর করে এগিয়ে যাওয়াই কাল হয়েছে। ক্ষমতায় আসার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধের ঘোষণা দেয়। আর এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী ভাবা হচ্ছে হুয়াউইকে। গত বছরের শুরু থেকেই একের পর এক বিপত্তির সম্মুখীন হয় প্রতিষ্ঠানটি। ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসে অনুষ্ঠিত প্রযুক্তি সম্মেলনে হুয়াউইয়ের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন ফ্ল্যাগশিপ ফোন Mate 10 Pro-এর বিক্রয় চুক্তি শেষ মুহূর্তে প্রত্যাহার করে নেয় এটিএন্ডটি। ট্রাম্প প্রশাসনের চাপের কারণেই এই চুক্তি বাতিল করা হয়। আমেরিকায় হুয়াউইয়ের স্মার্টফোন বিক্রি করতে সবচেয়ে বড় ডিলার ছিল এটিএন্ডটি। এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে হুয়াউইয়ের প্রধান নির্বাহী রিচার্ড ইউ বলেন, ‘কোম্পানির জন্য এটি একটি বড় ক্ষতি, তবে তারচেয়ে বড় ক্ষতি হলো ক্রেতাদের।’

এই ঘটনার পরের মাসেই আমেরিকার ছয়টি গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান হুয়াউইয়ের পণ্য ব্যবহার না করতে মার্কিন নাগরিকদের ওপর সতর্কতা জারি করে। এই গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল এফবিআই, সিআইএ এবং এনএসএ।

এফবিআই পরিচালক ক্রিস রে বলেন, ‘যেসব কোম্পানি বিদেশি কোনো সরকারের অনুগত সে সব কোম্পানির ঝুঁকি সম্পর্কে সরকার গভীরভাবে সচেতন।’

তবে হুয়াউইয়ের ওপর এ ধরনের সতর্ক দৃষ্টি বেশ আগে থেকেই রেখেছিল গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। কারণ হুয়াউইয়ের প্রতিষ্ঠাতা রেন ঝেংফেই চীনা সেনাবাহিনীতে একজন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাই হুয়াউইকে কার্যত চীনা সরকারের একটি হাতিয়ার হিসেবেই বিবেচনা করছিল ট্রাম্প প্রশাসন। তবে, এ ধরনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে চীনা কোম্পানিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘কোনো অনৈতিক কর্মকান্ডে হুয়াউই জড়িত নয়। এটি বিভিন্ন সরকার এবং ক্রেতাদের বিশ্বাস অর্জন করেই পৃথিবীর ১৭০টি দেশে বিক্রি হচ্ছে।’

২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসেই এটিএন্ডটি’র পথ অনুসরণ করে মোবাইল যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান ভ্যারিজোন ওয়্যারলেস হুয়াউইয়ের স্মার্টফোন থেকে শুরু করে কোনো নেটওয়ার্ক যন্ত্রাংশ বিক্রি করবে না বলে জানিয়ে দেয়। এর কয়েকদিন আগেই সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে হুয়াউইয়ের স্মার্টফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করে একটি বিল উত্থাপন করা হয়। একে একে বিক্রয় প্রতিষ্ঠান বেস্ট বাই থেকে শুরু করে আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান হুয়াউইয়ের পণ্য বর্জনের ঘোষণা দিতে শুরু করে। গত বছরের আগস্টে সরকারি কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠানের মাঝে হুয়াউইয়ের পণ্য ব্যবহার নিষিদ্ধ করার বিলে স্বাক্ষর করেন ট্রাম্প।

রেন-এর মেয়ে মেং ওয়াংঝুকে গ্রেপ্তার

হুয়াউইয়ের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে ২০১৮ সালের ১ ডিসেম্বর। সেদিন  হুয়াউইয়ের প্রতিষ্ঠাতা রেন ঝেংফেইয়ের মেয়ে মেং ওয়াংঝুকে যুক্তরাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুরোধে গ্রেপ্তার করে কানাডা। মেং হুয়াউইয়ের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা ও ডেপুটি চেয়ারম্যান। গ্রেপ্তারের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় হুয়াউইয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মেংয়ের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছে, সে সম্পর্কে তারা খুব বেশি জানে না। মিস মেং কোনো অপরাধ করেছেন বলে তাদের জানা নেই। মেং হংকং থেকে মেক্সিকো যাচ্ছিলেন। কানাডার ভেঙ্কুভার বিমানবন্দরে তার যাত্রাবিরতি ছিল। বছরের দুই সপ্তাহ তিনি কানাডায় থাকেন। সেখানে তার পারিবারিক সম্পত্তিও রয়েছে। ২০০২ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত কানাডায় বসবাস করেছিলেন তিনি। সেখানে তার ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করে।

কানাডার বিচার বিভাগের একজন মুখপাত্র বলেন, মেং একটি প্রকাশনা বাতিলের অনুরোধ করেছেন এবং আদালতের নির্দেশ অমান্য করেছেন। তার বিরুদ্ধে প্রতারণতার অভিযোগ আনা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদ মাধ্যমগুলোয় খবর প্রকাশিত হয়, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করায় হুয়াউইয়ের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে যুক্তরাষ্ট্র। গ্রেপ্তারের ১০ দিন পর জামিন নিলেও কার্যত এখনো বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন মেং। কারণ কানাডার আদালত তার জামিন আবেদন মঞ্জুর করে দেশটির ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় অবস্থান করার নির্দেশ দেয়। তার পায়ে একটি ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়া হয়। এই ট্যাগের মাধ্যমে তিনি কখন কোথায় যাচ্ছেন তার ওপর নজরদারি করছে কানাডার নিরাপত্তা সংস্থা। যে বাড়িটিতে মেং অবস্থান করছেন, রাত ১১টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত সেখান থেকে তার বের হওয়া নিষেধ।

মেং’কে চায় আমেরিকা

যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারা হুয়াউইকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে অভিযোগ করে এবং চীন সরকার এই প্রতিষ্ঠানকে তাদের গুপ্তচরবৃত্তির যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে বলে যুক্তি দেয়।

এছাড়া নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে ইরানে হুয়াউই লেনদেন করেছিল এমন অভিযোগে আমেরিকা চাইছে মেংকে তাদের কাছে হস্তান্তর করুক কানাডা। যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে দোষী সাব্যস্ত হলে ৩০ বছরের কারাদ- হতে পারে তার। মেং ওয়াংঝুকে গ্রেপ্তারের পর চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার কূটনৈতিক বাগ্যুদ্ধ চরমে পৌঁছে। এর জের ধরে পেইচিংয়ে কানাডার সাবেক এক কূটনীতিককে গ্রেপ্তার করে চীন। মেং-এর গ্রেপ্তারকে মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যায়িত করে তার মুক্তি দাবি করে পেইচিং। যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করেছে, স্কাইকম নামের এক অনানুষ্ঠানিক সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইরানের টেলিকম কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসা করছে হুয়াউই। এতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেওয়া নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করা হয়েছে। এছাড়াও জার্মান স্মার্টফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘টি-মোবাইল’-এর প্রযুক্তি চুরি করারও অভিযোগ তোলা হয় হুয়াউইয়ের বিরুদ্ধে।

এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে হুয়াউই বলেছে, তারা জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব আইনকানুন মেনে চলে। তারা মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বিচার বিভাগ সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারবে।

এদিকে, মেংকে গ্রেপ্তারের পর চীনে নিযুক্ত কানাডার রাষ্ট্রদূত জন ম্যাককালাম নিজ দেশের কাছে  মেং-এর সুবিচার দাবি করেন এবং বলেন, ‘কানাডার জন্য এটাই সবচেয়ে ভালো হবে, যদি আমেরিকা মেংকে প্রত্যর্পণের দাবি প্রত্যাহার করে নেয়।’ সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এমন অবস্থানের জন্য তৎক্ষণাৎ ম্যাককালামকে বরখাস্ত করে কানাডা।

অবাক করা ব্যাপার হলো মেংকে যখন গ্রেপ্তার করা হয়, তখন তার কাছ থেকে যেসব যোগাযোগ প্রযুক্তি বাজেয়াপ্ত করা হয় তার প্রায় সবই ছিল আইফোন পরিবারের। এসব যন্ত্রপাতির মধ্যে একটি ছিল ম্যাকবুক, একটি আইফোন এবং একটি আইপ্যাড। তবে, নিজ কোম্পানির সবচেয়ে আপডেট ভার্সনের একটি স্মার্টফোন Mate 10 Pro ছিল তার কাছে।

সর্বশেষ আঘাত

ট্রাম্প প্রশাসন একের পর এক নিষেধাজ্ঞা এবং মিত্র দেশগুলোকে হুয়াউই পণ্য বর্জন করার আহ্বান জানায়। এরই ধারাবাহিকতায় জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সর্বশেষ দেশ হিসেবে নিউজিল্যান্ড হুয়াউই থেকে সরঞ্জাম কেনার প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। ফাইভ জি নেটওয়ার্কে ব্যবহারের জন্য নিউজিল্যান্ডের একটি কোম্পানি হুয়াউই থেকে সরঞ্জাম কেনার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু দেশটির সরকার বলছে, এই চুক্তির ফলে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এর আগে অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা কয়েকটি দেশের আপত্তির মুখে পড়ে কোম্পানিটি।

সর্বশেষ হুয়াউইকে ট্রাম্প প্রশাসন এমন একটি কালো তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে, যার সঙ্গে বাণিজ্য করতে হলে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে লাইসেন্স নিতে হবে। এরপরই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সার্চ ইঞ্জিন প্রতিষ্ঠান গুগল হুয়াউইয়ের অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমে কিছু সেবার আর কোনো আপডেট ভার্সন দেবে না বলে ঘোষণা দেয়। এতে নতুন হুয়াউই স্মার্টফোনে গুগলের ইউটিউব, জি-মেইল, ক্রোম ব্রাউজার এবং গুগল ম্যাপস-এর মতো অ্যাপগুলো আর থাকবে না। এগুলো পেতে গুগলের সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তির প্রয়োজন হয়।

এক বিবৃতিতে গুগল জানায়, তারা আদেশ মেনেই কাজ করছে এবং এর প্রভাব পর্যালোচনা করছে। গুগলের নতুন এই সিদ্ধান্তের কারণে হুয়াউই গুগলের নিরাপত্তাবিষয়ক আপডেট ও প্রযুক্তিগত সহায়তা আর পাবে না। তবে ‘ওপেনসোর্স প্ল্যাটফর্ম’-এ থাকা সফটওয়্যারগুলোই শুধু সচল থাকবে হুয়াউইয়ের স্মার্টফোনগুলোতে। এ অবস্থায় গুগল প্লে-স্টোরের অ্যাকসেস থাকা বর্তমান হুয়াউইয়ের ডিভাইস ব্যবহারকারীরা এখনো গুগলের অ্যাপ্লিকেশনের আপডেট ডাউনলোড করতে পারছেন।

যেভাবে লড়ছে হুয়াউই

বিশ্লেষকরা বলছেন, গুগলের চুক্তি বাতিল করার ঘোষণা হুয়াউইয়ের ব্যবসার ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। পশ্চিমে হুয়াউইয়ের ব্যবসা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ, স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরা গুগল প্লে-স্টোর ছাড়া ফোন কিনতে আগ্রহী নাও হতে পারে।

ধারাবাহিক মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইউরোপে এতদিন তুমুল ব্যবসা করে এসেছে প্রতিষ্ঠানটি। এই মুহূর্তে প্রতিষ্ঠানটির সামনে দুটি চ্যালেঞ্জ। এক্ষেত্রে যে কোনো মূল্যে কানাডায় আটক রেন ঝেংফেইয়ের কন্যা মেং ওয়াংঝুকে নিজ দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায় হুয়াউই এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় গুগলের সেবা বন্ধ হলেও বিকল্প উপায়ে বাজার ধরে রাখতে চায়। কানাডায় অবস্থান করেই আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন মেং। গত মার্চে তিনি কানাডার বিরুদ্ধেই একটি অভিযোগ দায়ের করেন। দেশটির ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার সুপ্রিম কোর্টে ওই অভিযোগ দায়ের করেন মেং। রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ (আরসিএমপি), কানাডিয়ান বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সি (সিবিএসএ) ও মার্কিন সরকারের বিরুদ্ধে তার নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন করার অভিযোগে ক্ষতিপূরণ দাবি করেন তিনি। মেং জানান, গ্রেপ্তারের আগে সিবিএসএ কর্মকর্তারা তাকে অন্যায়ভাবে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং তল্লাশি চালায়।

চীন চাইছে, যেকোনো অবস্থাতেই মেংকে যেন আমেরিকার হাতে তুলে দেওয়া না হয়। এই ইস্যুতে তাকে নোংরা রাজনীতির শিকারে পরিণত করা হচ্ছে বলে দাবি করে দেশটি।

এদিকে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র থেকে স্মার্টফোন ব্যবসায় ব্যবহৃত মার্কিন যন্ত্রপাতি হুয়াউই না পায়, তবে তাদের ব্যবসা থমকে যেতে পারে। বর্তমানে স্মার্টফোনের বাজারে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে কোম্পানিটি। সম্ভাব্য পরিণতির কথা মাথায় রেখেই প্রস্তুতি নিচ্ছে হুয়াউই। বিগত কয়েক মাস ধরেই নিজস্ব স্মার্টফোন চিপ তৈরি করছে তারা। এছাড়াও গুগল চুক্তি বাতিল করতে পারে এই আশঙ্কাটি আরও কয়েকমাস আগেই করা হয়েছিল। তখন থেকেই নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেম নিয়ে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। তাই আগামী আগস্টে গুগলের সেবা বন্ধ হয়ে গেলেও নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেমে চলবে হুয়াউইয়ের স্মার্টফোন। হুয়াউই আশা করছে তাদের অপারেটিং সিস্টেম গুগলের শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠবে। তবে, প্রযুক্তিবিদরা আশঙ্কা করছেন, ট্রাম্প-হুয়াউই যুদ্ধে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যেতে পারে বিশ^ ইন্টারনেট ব্যবস্থা। সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও উন্নত প্রযুক্তি আর সেবা দিয়েই মানুষের আস্থা বজায় রাখার কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়ে এখনো লড়ে যাচ্ছে হুয়াউই।