পুঁজিবাজারের উন্নয়ন ও গভীরতা বাড়াতে অভিন্ন প্রস্তাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্টক এক্সচেঞ্জ ও স্টেকহোল্ডারদের চারটি সংগঠন। গতকাল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই), ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ) ও বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) বৈঠক শেষে এমন সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন ডিএসইর একাধিক পরিচালক।
এ ছাড়া পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত যেসব কোম্পানির উদ্যোক্তা ও পরিচালকরা ঘোষণা ছাড়াই শেয়ার বিক্রি করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ডিএসই। এ বিষয়ে ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন জানিয়েছেন, ঘোষণা ছাড়া শেয়ার বিক্রি করা উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের তালিকা তৈরি করতে ডিএসইর চিফ রেগুলেটরি অফিসারকে (সিআরও) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ওইসব উদ্যোক্তা ও পরিচালক ঘোষণা ছাড়া শেয়ার বিক্রি করার কারণে স্টক এক্সচেঞ্জ ও সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তাদের একটি তালিকা করে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) কাছে পাঠানো হবে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য।
এদিকে যেসব তালিকাভুক্ত কোম্পানির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ শেয়ার নেই, সেসব কোম্পানির জন্য আলাদা ক্যাটাগরি ঠিক করেছে ডিএসই। এসব কোম্পানির শেয়ারের লেনদেনের জন্য ‘ডি’ ক্যাটাগরি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ডিএসইর শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা।
পুঁজিবাজারের চলমান বিভিন্ন বিষয়ে সমন্বিত সিদ্ধান্ত নিতে গতকাল ডিএসইর উদ্যোগে অন্যান্য স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ বৈঠকেই ডিএসই, সিএসই, ডিবিএ ও বিএমবিএ’র শীর্ষ নেতাদের নিয়ে একটি সমন্বয় কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ কমিটি পুঁজিবাজারসংক্রান্ত যেকোনো ইস্যুতে একটি সমন্বিত প্রস্তাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং আগামীতেও একসঙ্গে কাজ করবে।
গতকালের সভায় কোম্পানির ব্যাংকঋণ সংক্রান্ত বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে প্রস্তাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন জানান, যেসব তালিকাভুক্ত কোম্পানির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ শেয়ার নেই, সেসব কোম্পানিকে ব্যাংকঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে প্রস্তাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা। একই সঙ্গে অতালিকাভুক্ত কোম্পানিকে ব্যাংকঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ইক্যুইটির পরিবর্তে পরিশোধিত মূলধন বিবেচনায় নেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হবে।
ইমন বলেন, পুঁজিবাজারের উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে, বাজারের গভীরতাও বাড়ছে। কিন্তু ব্রোকারেজ হাউসের শাখা বাড়ানো যাচ্ছে না। ২০১০ সালের পর থেকে শাখা বাড়ানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ব্রোকারেজ হাউসের এক্সটেনশন অফিস ২ কিলোমিটারের মধ্যে রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আমরা এটা ২০ কিলোমিটার করার দাবি কমিশনে জানাব।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগে না জানিয়ে উদ্যোক্তা-পরিচালকরা শেয়ার বিক্রি করতে পারলেও এখন আর সেটা সম্ভব নয়। কারণ এরই মধ্যে এই সমস্যা রোধে বিএসইসি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে।
বৈঠক শেষে ডিএসই নেতারা জানান, ডিএসই, ডিবিএ, সিএসই ও বিএমবিএ’র মধ্যে বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সবার মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা। যাতে আগামীতে পুঁজিবাজার নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রস্তাব না দিয়ে সমন্বিতভাবে অভিন্ন একটি প্রস্তাব দেওয়া যায়। এ লক্ষ্যে ডিএসইর পক্ষে মিনহাজ মান্নান ইমন, ডিবিএ’র পক্ষে শাকিল রিজভী, সিএসইর পক্ষে ছায়েদুর রহমান ও বিএমবিএ’র পক্ষে নাসির চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান থেকে তিনজন করে প্রতিনিধি থাকবেন। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে প্রতিনিধি ছাড়াও চার প্রতিষ্ঠানের নেতারা সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
ইমন বলেন, গত কিছুদিন নানা ধরনের সংস্কারের পরও পুঁজিবাজার গতি পাচ্ছে না। মনে হচ্ছে কোথাও কোন গ্যাপ আছে। সেটা সমন্বয়ের অভাব বলেই আজকের সভায় মনে হয়েছে। এ জন্য সবাই একসঙ্গে কাজ করার উদ্যোগে একমত হয়েছি।
বৈঠক শেষে ডিএসইর পরিচালক রকিবুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বিএসইসি গত ২৯ এপ্রিল অনেকগুলো সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। কমিশন উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের ন্যূনতম শেয়ার ধারণে কড়াকড়ি আরোপ, সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া বোনাস শেয়ার ঘোষণা বন্ধ, উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের শেয়ার বিক্রি নিয়ন্ত্রণে ব্লক মডিউল তৈরিসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে বিএসইসি বেসিক জায়গায় সংস্কার করেছে। বিএসইসি চেয়ারম্যানের এসব উদ্যোগকে আমরা পূর্ণ সমর্থন জানাচ্ছি।
শাকিল রিজভী বলেন, আমরা বিভিন্ন বিষয়ে সংস্কার চাইতেই পারি। তবে শেয়ারের দর ওঠানামার জন্য কাউকে দায়ী করা ঠিক হবে না। সূচকের ওঠানামায় বিএসইসির ভূমিকা থাকে না। তাদের কাজ আইনকানুন ঠিকমতো মানা হচ্ছে কি না, তা দেখা।