রেলের ওয়েবসাইটে ঢাকা থেকে যশোর যাওয়ার চারটি টিকিট কেনেন যশোরের মাসুদুল। কিন্তু গতকাল বুধবার সকাল সোয়া ৯টার দিকে শোভন চেয়ারের চারটি টিকিটের মূল্য ১ হাজার ৭৪৫ টাকা কেটে নেওয়া হলেও তার টিকিট ক্রয়সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা আসেনি। বিড়ম্বনায় পড়ে রাজধানীর আগারগাঁও থেকে বেলা ১১টার দিকে কমলাপুর রেলস্টেশনে ছুটে আসেন; বিভিন্ন কাউন্টারে ঘোরাঘুরি করেও কোনো সমাধান পাননি তিনি। দুপুর ১২টার দিকে মাসুদুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘টাকা উধাও টিকিট নেই। কেউ আমাকে বলছে না আমি কী করব?’ অব্যবস্থাপনায় শুরু হওয়া ঈদে রেলের আগাম টিকিট বিক্রি শুরুর প্রথম দিনে গতকাল সরেজমিনে কমলাপুর রেলস্টেশনে গিয়ে পাওয়া গেছে মাসুদুলের মতো অনেক টিকিটপ্রত্যাশীর বিভিন্ন অভিযোগ।
গতকাল সকাল ৯টায় ৩১ মে’র টিকিট বিক্রির মাধ্যমে শুরু হয়েছে ঈদে আগাম টিকিট বিক্রি কার্যক্রম; চলবে ২৬ মে পর্যন্ত। এবারে কাউন্টার থেকে ৫০ শতাংশ ও বাকি ৫০ শতাংশ টিকিট অনলাইনে কেনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার পাওয়া যাবে ১ জুনের টিকিট। ২৪ মে ২ জুন, ২৫ মে ৩ জুন এবং ২৬ মে বিক্রি হবে ৪ জুনের টিকিট। ফিরতি টিকিট পাওয়া যাবে ২৯ মে থেকে ২ জুন।
ই-টিকিট সংগ্রহে ব্যর্থ হয়ে সকালে অনেকেই ছুটে আসেন কমলাপুর স্টেশনের কাউন্টারে; আগের রাত থেকে অপেক্ষমাণ টিকেটপ্রত্যাশীদের সঙ্গে যোগ দেন তারা। মোবাইল অ্যাপে টিকিট কিনতে ব্যর্থ হওয়া জেসি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কিসের অনলাইন, অনলাইনে তো সার্ভার ডাউন। সেখানে তো কেউ ঢুকতে পারছে না।’ নারীরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন দাবি করে গাইবান্ধার ডলি বলেন, ‘সারা দেশের টিকিট বিক্রি হচ্ছে তবুও নারীদের জন্য একটা লাইন (কাউন্টার)। ভোরবেলা টিকিট নিতে এসে দুপুর ১২টায় এখনো সিরিয়ালে আছি। এ পর্যন্ত দুবার সিরিয়াল ভাঙছে আবার নিজেরাই ঠিক করছি। এই যদি হয় সেবার মান তাহলে কী আর বলার!’
মালিবাগের আপেল মাহমুদ অভিযোগ করেন, ‘গতবার সকাল ৮টায় টিকিট দিলেও এইবার দেওয়া শুরু করছে ৯টায়। নতুন সময় সম্পর্কে আমরা জানি না; আবার টিকিট ইস্যু করতে অনেক সময় লাগছে। প্রতিটি টিকিটের জন্য সময় লাগছে ৭-৮ মিনিট।’ তবে কাক্সিক্ষত টিকিট হাতে পেয়ে উচ্ছ্বসিত দিনাজপুরের রুবেল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেক পরিশ্রমের পর টিকিট হাতে পেলাম, দারুণ ভালো লাগছে। না পেলে তো খারাপ লাগত।’
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কমলাপুর স্টেশনে টিকিট বিক্রির কার্যক্রম পরিদর্শনে এসে ই-টিকিটিংয়ের অব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতা স্বীকার করে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঈদযাত্রায় অ্যাপসের মাধ্যমে রেলের টিকিট বিক্রিতে কাক্সিক্ষত সাফল্য না পাওয়া ও যাবতীয় ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও সেবা দিতে না পারা দুঃখজনক। এর দায় রেলপথ মন্ত্রণালয় এড়াতে পারে না।’
তিনি জানান, অ্যাপস সেবাদাতা সংস্থা সিএনএসবিডিকে (কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেম) পাঁচ দিন সময় দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ই-টিকিটিং সেবা ঠিক না হলে অবিক্রীত টিকিটগুলো ২৭ মে কাউন্টারে দেওয়া হবে। রেলমন্ত্রী বলেন, ‘অ্যাপসে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান (সিএনএস) সঙ্গে ২০০৭ সাল থেকে আমাদের চুক্তি।’
এর আগে সকালে টিকিটপ্রত্যাশীদের কাছে ভোগান্তির অভিযোগ পেয়ে কমলাপুরে আসে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তিন সদস্যের একটি দল। রেল ও সিএনএসবিডির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে তারা। দুদকের উপসহকারী পরিচালক মনিরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হটলাইনে অভিযোগ পেয়ে আমরা এসেছি। তবে অভিযোগগুলো অ্যাপের মাধ্যমে ও অনলাইনে টিকিট কিনতে না পারার। কাউন্টারে টিকিট বিক্রি নিয়ে তেমন অভিযোগ নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা রেলওয়ের কর্মকর্তা ও সিএনএসবিডির কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করেছি। সিএনএসবিডির জেনারেল ম্যানেজার অপারেশন শামীমুল আলমের কাছ থেকে কোনো সদুত্তর পাইনি। তবে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কমিশনে আমাদের প্রতিবেদন জমা দেব।’ এছাড়া টিকিট কালোবাজারি রোধে রেলপথ মন্ত্রণালয়কে ভ্রাম্যমাণ আদালত চালানোর সুপারিশ করে দুদক প্রতিনিধি দল।
অনলাইন টিকিটিং সিস্টেমের সার্ভার রুমে দুদকের অভিযান প্রসঙ্গে রেলমন্ত্রী বলেন, ‘টিকিট কালোবাজারির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তারা কারও সঙ্গে যোগসাজশ করে কালোবাজারে টিকিট বিক্রি করছে কি না, তা দেখতে দুদক অভিযান চালিয়েছে।’
যাত্রীদের সুবিধার্থে এবার রাজধানীর পাঁচটি স্থান থেকে রেলের অগ্রিম টিকিট বিক্রি হচ্ছে। যমুনা সেতু দিয়ে পশ্চিমাঞ্চলগামী ট্রেনের টিকিট পাওয়া যাচ্ছে কমলাপুরে রেলস্টেশনে। চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীগামী সব আন্তঃনগর ট্রেনের টিকিট পাওয়া যাচ্ছে বিমানবন্দর স্টেশনে। ময়মনসিংহ ও জামালপুরগামী আন্তঃনগর ট্রেনগুলোর আগাম টিকিট সংগ্রহ করা যাবে তেজগাঁও রেলস্টেশন থেকে। নেত্রকোনাগামী মোহনগঞ্জ ও হাওড় এক্সপ্রেস ট্রেনের টিকিট সংগ্রহ করা যাবে বনানী স্টেশন থেকে। এছাড়া সিলেট ও কিশোরগঞ্জগামী সব আন্তঃনগর ট্রেনের টিকিট সংগ্রহ করতে হবে ফুলবাড়িয়া (পুরনো রেলভবন) থেকে। একজন যাত্রী চারটির বেশি টিকিট সংগ্রহ করতে পারবেন না। ঈদের অগ্রিম বিক্রীত টিকিট ফেরত নেওয়া হবে না। জাতীয় পরিচয়পত্র দেখিয়ে টিকিট সংগ্রহ করতে হবে।
যাত্রীদের ভোগান্তির বিষয়ে কমলাপুর রেলস্টেশনের ব্যবস্থাপক আমিনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সার্ভারের সমস্যার কারণে অনেকের টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে কিন্তু টিকিট পায়নি। তাদের টাকা সাত দিনের মধ্যে ফেরত দেওয়া হবে।’ তিনি আরও জানান, মন্ত্রীর নির্দেশের পর নারীদের জন্য আরও একটি কাউন্টার খোলা হয়েছে। এছাড়া কাউন্টারের মাধ্যমে ৫০ শতাংশ ও অনলাইনে ৫০ শতাংশ করে প্রতিদিন ২৫ হাজার ৫৭১টি টিকিট বিক্রি হবে বলে জানান তিনি।