দৃশ্যমান হচ্ছে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার রেললাইন

চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের বাসিন্দাসহ পর্যটকদের স্বপ্নের ‘চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প’ এখন কিছুটা হলেও দৃশ্যমান। সরকারের ফাস্ট ট্র্যাকের অধীন এই মেগা প্রকল্পের বেশিরভাগ ভূমি অধিগ্রহণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। রেললাইন স্থাপনে মাটি ভরাট ও বৃহৎ সেতুগুলোর নির্মাণকাজ এখন জোরেশোরে এগিয়ে চলছে। পাহাড়ি এই রেলপথে হাতিসহ বন্য প্রাণীর অবাধ চলাচলে একটি ওভারপাস ও দুটি আন্ডারপাস নির্মাণের নকশা প্রণয়ন করা হচ্ছে। ১৮ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ১২ হাজার কোটি টাকা অর্থায়ন করছে। বাকি ৬ হাজার কোটি টাকা সরকারের তহবিল থেকে জোগান দেওয়া হচ্ছে। এই টাকা মূলত জমি অধিগ্রহণে ব্যয় হবে।

সম্প্রতি এই রেললাইন প্রকল্পের কাজের সার্বিক অগ্রগতি পরিদর্শনের জন্য চট্টগ্রামে আসেন রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন। ওই সময় রেলমন্ত্রী দোহাজারী এলাকা পরিদর্শন করেন। সেই সঙ্গে প্রকল্পে যুক্ত সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা ও প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। মন্ত্রী বলেন,  কক্সবাজারের সঙ্গে রেলপথ সংযুক্ত হলে এ অঞ্চলের যোগাযোগ-ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন হবে। পর্যটকরা অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যে কক্সবাজার ভ্রমণ করতে পারবেন। তিনি আরও বলেন, প্রকল্পের সার্বিক কাজ বর্তমানে সন্তোষজনকভাবে এগিয়ে চলছে।

রেলওয়ের প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, সরকারের সঙ্গে ঋণচুক্তির অধীনে এডিবি এরই মধ্যে ৩০ কোটি ডলার ছাড় করেছে এবং আজ বৃহস্পতিবার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সঙ্গে (ইআরডি) আরও ৪০ কোটি ডলার ঋণচুক্তি স্বাক্ষর হবে। এতে করে প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ আরও গতি পাবে।

খোঁজ  নিয়ে জানা যায়, এই প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রাম-দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত ডুয়েলগেজ রেললাইন স্থাপন করা হবে। অর্থাৎ তিন ট্র্যাকবিশিষ্ট এই রেললাইন মিটারগেজ ও ব্রডগেজ ট্রেন চলাচলের উপযোগী করে নির্মাণ করা হবে। এখানে জংশন স্টেশন হবে রামু। সেখান থেকে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী গুনদুম পর্যন্ত এই রেললাইনের বিস্তার হবে। ভবিষ্যতে মিয়ানমার ও চীনের কুনমিং হয়ে ট্রান্স এশিয়ান রেললাইনে সংযুক্তির সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা আছে। এর অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশক্রমে সিঙ্গেল মিটারগেজের স্থলে ডুয়েলগেজ রেললাইন স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অর্থসংকটসহ নানা জটিলতার কথা উল্লেখ করে প্রকল্প পরিচালক মফিজুর রহমান গত মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আজ থেকে প্রায় এক দশক আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রস্তাব অনুসারে, ২০১০ সালে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প সরকারের অনুমোদন পায়। ২০১১ সালের এপ্রিলে তিনি কক্সবাজারে এই মেগা প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। কিন্তু বহুদিন এই প্রকল্পে অর্থায়নে কোনো দাতা সংস্থার সাড়া মেলেনি। ২০১৫ সালে এই প্রকল্পের অর্থায়নে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) আগ্রহ প্রকাশ করে। ওই বছরের ডিসেম্বরে প্রকল্প বিনির্মাণে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়।’

পেছনের এসব কথা জানিয়ে প্রকল্প পরিচালক মফিজুর রহমান বলেন, ‘দোহাজারী-চকরিয়া এবং চকরিয়া-কক্সবাজার (লট-১ ও লট-২) এই দুই লটে চীনা প্রতিষ্ঠান সিআরইসি (চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন) ও দেশীয় তমা কনস্ট্রাকশন্স কোম্পানি ২ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা এবং চীনা প্রতিষ্ঠান সিসিইসিসি ও দেশীয় ম্যাক্স কনস্ট্রাকশন্স ৩ হাজার ৫০২ কোটি টাকায় যথাক্রমে ১ ও ২ নম্বর লটের কাজ পায়।’

জমি অধিগ্রহণ ও প্রকল্পকাজের অগ্রগতি নিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রকল্পটি বাস্তবায়নে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ৩৬৫ একর এবং কক্সবাজার অঞ্চলে ১ হাজার ২ একর জমি অধিগ্রহণে মূল্য বা চাহিদার বিপরীতে সর্বমোট ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনকে পরিশোধ করা হয়েছে। এ পর্যন্ত অধিগ্রহণকৃত ৬০ শতাংশ জমি আমরা (রেলওয়ে কর্র্তৃপক্ষ) বুঝে পেয়েছি। জেলা প্রশাসন পর্যায়ক্রমে জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ বা দায় শোধ করছেন। তবে ক্ষতিগ্রস্তদের পাওনা পরিশোধ এখনো সম্পন্ন না হওয়ায় প্রকল্প কাজের অগ্রগতি কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে।’

প্রকল্পের বাস্তব অবস্থা নিয়ে পরিচালক মফিজুর রহমান বলেন, ‘২০১৭ সালে আমরা ঠিকাদার নিয়োগ দিয়েছি। কিন্তু জমি বুঝে পেতে আমাদের অনেক দেরি হয়ে গেছে। এই বিলম্ব প্রকল্পর কাজ শুরু করতে অনেকটা সময় নষ্ট করেছে।’

এ পর্যন্ত প্রকল্পের ২৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বড় সেতুগুলোর নির্মাণকাজ চলছে এবং মাটি ভরাটের কাজও সমানতালে এগোচ্ছে। মাটি ভরাটের কাজ শেষ হলেই রেললাইন স্থাপনের কাজ শুরু হবে।’ তিনি আশাবাদী, এখন যে গতিতে কাজ চলছে, তাতে ২০২২ সালের ২০ জুনের নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হবে।

তিনি জানান, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে ছয়টি বড় সেতু এখন নির্মাণাধীন। এগুলো হচ্ছে ২৮০ মিটার দীর্ঘ সাঙ্গু সেতু, ৪৮০ মিটার দীর্ঘ মাতামুহুরী, ২৪০ মিটার দীর্ঘ মাতামুহুরী-২ ও ১৪০ মিটার দীর্ঘ ঈদগাঁও সেতু। তা ছাড়া এই রেলপথে আরও ১৪৫টি কালভার্ট ও ৯৬টি লেভেল ক্রসিং নির্মাণ করা হবে। স্টেশন হবে দোহাজারী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, হারবাং, চকরিয়া, ডুলাহাজারা, ইসলামাবাদ (ঈদগাঁও), রামু ও কক্সবাজার। কক্সবাজারে হবে ঝিনুক আকৃতির সুদৃশ্য রেল স্টেশন, যাতে বিশেষভাবে আকৃষ্ট হবে পর্যটকরা।

এডিপির শর্ত ও হাতি চলাচলের পথ : চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ বিনির্মাণ প্রকল্পে এডিপির অর্থায়নের প্রধান শর্ত ছিল, এ পথে হাতিসহ বন্য প্রাণী চলাচলের পথ নিরাপদ ও নির্বিঘœ করতে হবে। সরকার এ শর্ত মেনে নিয়েই এডিবির সঙ্গে ঋণচুক্তি স্বাক্ষর করে ২০১৬ সালের গোড়ার দিকে। এই শর্ত মেনে নিয়ে সরকার ঘনজঙ্গল পরিবেষ্টিত চুনতি এলাকায় একটি ওভারপাস এবং কক্সবাজারের মেধাকচ্ছপিয়া ও ফাসিয়াখালী এলাকায় দুটি আন্ডারপাস নির্মাণ করবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মফিজুর রহমান জানান, ‘বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। এই শর্তটি নতুন ও তাৎপর্যপূর্ণ। আমরাও প্রাণিসম্পদ, পরিবেশ সুরক্ষা ও হাতি চলাচলের নিরাপত্তা ও নির্বিঘœ চলাচলে ব্যবস্থা নিয়েছি। এজন্য চট্টগ্রামের রিজার্ভ ফরেস্ট চুনতিতে ৫০ মিটার প্রস্থের ও ১০০ মিটার দৈর্ঘ্যরে একটি ওভারপাস এবং কক্সববাজারের মেধাকচ্ছপিয়া ও ফাসিয়াখালী এলাকায় দুটি আন্ডারপাস (ভূগর্ভ পথ) নির্মাণের নকশা প্রণয়ন করছি।’ তার অভিযোগ, এজন্য ২০৭ একর জমির প্রয়োজন। বন বিভাগ এই জমির মালিক। তারা এই জমি এখনো বুঝিয়ে দেয়নি। এ কারণে প্রকল্পের অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে এবং এর বিস্তারিত নকশা চূড়ান্ত করা যাচ্ছে না।

চট্টগ্রাম-দোহাজারী লাইন নিয়ে সমীক্ষা : চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনটি হবে ডুয়েল গেজের। বর্তমানে চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেললাইন (যেটি প্রস্তাবিত কক্সবাজার লাইনের অগ্রবর্তী অংশ) মিটার গেজের। এই লাইনটিকে ডুয়েল গেজে রূপান্তরের জন্য বর্তমানে এডিবি সমীক্ষা চালাচ্ছে। রেলওয়ে সূত্র জানায়, এডিবির অর্থায়নে এই সমীক্ষা চলছে এবং এডিবির সমীক্ষা শেষে চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেলপথও ডুয়েলগেজ হবে। আর তাতে অর্থায়নও করবে এডিবি।

অতিসম্প্রতি দোহাজারী ও চন্দনাইশ এলাকা সরেজমিন পরিদর্শনের গিয়ে দেখা যায়, শঙ্খ নদে সেতু নির্মাণের কাজ চলছে। চন্দনাইশ এলাকায় রেললাইন স্থাপনে মাটিভরাটের কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলেছে। এলাকাবাসী তাতে ভীষণ খুশি। চন্দনাইশের বাসিন্দা আবুল হায়াৎ বলেন, শঙ্খে আরেকটা ব্রিজ হচ্ছে। এখন রেললাইনও হবে। সড়কে অনেক যন্ত্রণা। তারা রেলে কক্সবাজার যাবেন। সবাই তাতে খুশি।

শঙ্খ নদের তীরে বিপুল পরিমাণ সবজি চাষ হয়। শঙ্খতীরের এসব সবজির কদর সর্বত্র। তবে পরিবহন-সংকটে মূল্য মিলে না চাষির। দোহাজারী বাজারে কথা হয় শঙ্খপাড়ের চাষি জসীম আহমেদের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘যদি রেললাইন চালু হয়, আমাদের চেয়ে কেউ বেশি খুশি হবে না। আমরা আমাদের শাকসবজির ন্যায্যমূল্য পাব।’

অনিশ্চিত গুনদুম লাইন : চট্টগ্রাম-রামু-কক্সবাজার ডুয়েলগেজ রেললাইন রামু জংশন হয়ে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী উখিয়ার গুনদুম পর্যন্ত যাওয়ার কথা। এই রেলপথ মিয়ানমার পেরিয়ে চীনের কুনমিং হয়ে ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কথা। সেই লক্ষ্যেই প্রধানমন্ত্রীর নির্দের্শনায় এই রেলপথ ডুয়েল গেজে নির্মাণ করা হচ্ছে। কিন্তু দুই কারণে এখনই গুনদুম পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারিত হচ্ছে না বলে জানা যায়।

প্রথমত মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সম্পর্ক শীতল। ১১ লাখ রোহিঙ্গা এই সম্পর্ককে আরও জটিল করেছে। আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, একমাত্র চীন এই সমস্যার সমাধান করতে পারে। তবে মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ এখানে বাদ সেজেছে। তা ছাড়া, রামুতে নতুন সেনানিবাস হয়েছে। এতে রেললাইনটি গুনদুম পর্যন্ত টেনে নেওয়ার বিষয়টি আপাতত সরকারের মাথায় নেই বলেই জানিয়েছেন নাম প্রকাশ অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা।