জেলেরা চাল পাক মৎস্য খাত এগিয়ে যাক

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের বিস্তৃতি প্রায় ৭১০ কিলোমিটার। দক্ষিণ এশিয়ার তিন বৃহৎ নদী গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনার মোহনায় আমাদের সামুদ্রিক জলসীমার পরিমাণ এখন প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার। সামুদ্রিক জলসীমার এই বিস্তৃত ক্ষেত্র থেকে সম্পদ আহরণে বিশাল সম্ভাবনার সুযোগ এখনো আমাদের অধরা রয়ে গেছে। এমনকি, সম্ভাবনাময় সামুদ্রিক অর্থনীতির প্রথাগত বিষয় সামুদ্রিক মৎস্য খাতের উন্নয়নেও এখনো অনেক কিছুই করা বাকি। তবে, আশার কথা যে, সম্প্রতি সমুদ্রসীমার বিরোধ নিষ্পত্তির পর সামুদ্রিক জলসীমার মৎস্যসম্পদ এবং সামুদ্রিক অর্থনীতির বিষয়ে মনোযোগ বেড়েছে এবং এ বিষয়ে নানা রকম উদ্যোগের কথা আলোচিত হচ্ছে।

সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের টেকসই আহরণ, সঠিক ব্যবহার ও চাষ ব্যবস্থাপনা-কৌশল দেশে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও রপ্তানি খাতে রাজস্ব বৃদ্ধিসহ জনসাধারণের নতুন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এখন দেশে মিঠা পানির মৎস্য প্রজাতির সংখ্যা ২৬০টি এবং বিদেশি মৎস্য প্রজাতির সংখ্যা ১২টি। মিঠা পানির চিংড়ির প্রজাতি ২৪টি। অন্যদিকে সামুদ্রিক মৎস্য প্রজাতির সংখ্যা ৪৭৫টি এবং সামুদ্রিক চিংড়ির প্রজাতি ৩৬টি। উপকূলীয় এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত যান্ত্রিক মৎস্য ট্রলারের সংখ্যা মাত্র ২৫৫টি। এর পাশাপাশি প্রায় ৩৩ হাজার যান্ত্রিক এবং ৩৫ হাজার অযান্ত্রিক ছোট নৌযান সমুদ্র উপকূলে মাছ ধরার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। মৎস্য রপ্তানি থেকে এখন ৪ হাজার ৮৯৮ দশমিক ২২ কোটি টাকা আয় হচ্ছে, যা মোট জাতীয় রপ্তানি থেকে প্রাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার মাত্র ২ দশমিক ০১ শতাংশ।

বাংলাদেশের মোট মৎস্য উৎপাদনে সামুদ্রিক মৎস্য খাতের অবদান ১৮ শতাংশ। এর মধ্যে ‘আর্টিশ্যানাল ফিশিং’ বা ছোট নৌকা ও জাল দিয়ে প্রথাগত পদ্ধতির মাধ্যমে আহরিত মাছের পরিমাণই ৯০ শতাংশ। এই সামুদ্রিক মৎস্য খাতের ওপর নির্ভর করে প্রায় ৫ লাখ মৎস্যজীবী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। ১৯৭৫-৭৬ সালে বঙ্গোপসাগরে যান্ত্রিক মৎস্য আহরণ শুরু হওয়ার পর থেকে অদ্যাবধি ফিশিং প্রচেষ্টার পরিমাণ প্রায় ২৫৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সরকারি উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, বিভিন্ন মাধ্যমে আহরিত মাছের পরিমাণ দিন দিন কমে যাচ্ছে। মৎস্য আহরণে আধুনিক যান্ত্রিক পদ্ধতির ব্যবহার প্রয়োজন অনুযায়ী না বাড়া এবং অন্যান্য আর্থসামাজিক কারণে উপকূলীয় মৎস্যজীবীদের জীবন ও জীবিকার কাক্সিক্ষত মানোন্নয়নও হয়নি।

এদিকে, প্রধান প্রজনন মৌসুমে বঙ্গোপসাগরে মৎস্য আহরণে নিষেধাজ্ঞা থাকায় প্রতি বছরই কয়েক মাসের জন্য উপকূলীয় জেলেদের জীবিকা সংকটের মধ্যে পড়ে। ২০১৫ সাল থেকে প্রতি বছর প্রজনন মৌসুমে ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ৬৫ দিন বাংলাদেশের সামুদ্রিক জলসীমায় বাণিজ্যিক ট্রলারসহ সব ধরনের নৌযান ব্যবহার করে মাছ, চিংড়ি ও চিংড়িজাতীয় মৎস্য আহরণ নিষিদ্ধ থাকে। ফলে এই সময়টাতে উপকূলের জেলে পরিবারগুলো জীবিকার সংকটে পড়ে যায়। মাছ ধরার আয় না থাকায় একদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ, অন্যদিকে দাদনদারদের কিস্তির চাপে পড়ে জেলেরা আইন অমান্য করে মাছ ধরতে বাধ্য হয়। এই পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ দিতে উপকূলের ৪ লাখ ১৪ হাজার ৭৮৪টি জেলে পরিবারকে এই সময়ে ৮৬ কিলোগ্রাম করে চাল দেওয়ার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। উপকূলের ১২টি জেলার ৪২টি উপজেলার জেলে পরিবারগুলোকে ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় এই খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে।

সামুদ্রিক মাছের প্রধান প্রজনন মৌসুমে জেলেদের জন্য এমন সহায়তার উদ্যোগ এবারই প্রথম নেওয়া হয়েছে, যা খুবই আশাব্যঞ্জক। যথাযথ নজরদারির মধ্য দিয়ে প্রকৃত জেলে পরিবারগুলোরকে এই খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হলে তাদের কাছে একটা ইতিবাচক বার্তা পৌঁছাবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ উপকূলীয় এলাকার নি¤œবিত্ত এই জেলে সম্প্রদায়ের মানুষদের জীবনমান উন্নয়নকে অবশ্যই অগ্রাধিকার বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। কেননা, আগামী দিনে সামুদ্রিক মৎস্য খাতের যেকোনো বড় ধরনের উন্নয়নে এই জেলে সম্প্রদায়কে সম্পৃক্ত করতে হবে। সামুদ্রিক মৎস্য খাতে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ এবং আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগের সঙ্গে উপকূলীয় জেলেদের বংশপরম্পরার প্রথাগত জ্ঞান ও কর্মদক্ষতাকে কাজে লাগাতে পারলে তা অবশ্যই সুদূরপ্রসারী ফল বয়ে আনবে। এই খাদ্যসহায়তা উপকূলীয় জেলেদের সক্ষমতাকে আরও দায়িত্বশীলভাবে কাজে লাগানোর একটি শুভ সূচনা হিসেবে বিবেচিত হবে।