মূল্যবোধ ও ন্যায্যতা একটি জাতির জীবনীশক্তি। মূল্যবোধ ও ন্যায্যতাহীন সমাজ কাঠামো অন্তঃসারশূন্য হয়ে যায়। কোনো জাতির মূল্যবোধ চর্চা ও নৈতিক চরিত্র যখন ভঙ্গুর হয়ে পড়ে, তখন অবক্ষয়ের প্রাবল্য দেখা দেয়। ফলে সে জাতির পতন হয় অবশ্যম্ভাবী। তেমনি কিছু চিত্র দৃশ্যমান রমজানের শুরু থেকে পরিচালিত ভেজালবিরোধী অভিযানে। চলমান অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণ নাগরিক হিসেবে খুশি হওয়ার বদলে আমরা কিছুটা আতঙ্কিত বটে। কারণ নামিদামি হোটেল-রেস্তোরাঁ, নানাবিধ খাদ্য উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলোকে যে হারে শাস্তি দেওয়া হয়েছে, তাতে এতদিন আমরা কী খেয়েছি এটা ভেবে আঁতকে উঠছি। কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে নিজেরা অখাদ্য-কুখাদ্য খাওয়ার পাশাপাশি পরম মমতায় এসব খাইয়েছি সন্তানদের! ভাবলেই গা শির শির করে ওঠে!!
খাদ্যে ভেজালের বিষয়টি নতুন কিছু নয়। বাংলাদেশে বিশুদ্ধ খাদ্যপণ্য পাওয়া একপ্রকার দুষ্কর। চাল-ডাল, তেল-নুন, মাছ-মাংস, দুধ-বিস্কুট, জুস জাতীয় পানীয়, চকলেট, শিশুখাদ্য, ওষুধপাতি, ফল-ফলাদি ও পানি থেকে শুরু করে এমন কোনো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য নেই যাতে ভেজাল নেই। সম্প্রতি ৫২টি খাদ্যপণ্য অবিলম্বে বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। একই সঙ্গে এসব খাদ্যপণ্য বিক্রি ও সরবরাহে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ এবং পণ্যগুলো ধ্বংস করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। খাদ্যে ভেজাল নিয়ে আদালত যে নির্দেশনা দিয়েছে তা অত্যন্ত সময়োপযোগী। খাদ্যপণ্যে ভেজালের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ, অন্যায় এবং ন্যায়নীতির পরিপন্থী। মানবতার ধর্ম ইসলাম এটা সমর্থন করে না। পবিত্র কোরআন-হাদিসে এ বিষয়ে বিশদ বর্ণনা রয়েছে। বলা হয়েছে, খাদ্যে ভেজাল মেশানো পাপ, ওজনে কম দেওয়া পাপ, খারাপ খাবারকে ভালো বলে বিক্রি করা পাপ। ফাঁকি দেওয়া অন্যায়। নবী করিম (সা.) বলেছেন, যে ফাঁকি দেয়, ধোঁকা দেয় সে আমার দলভুক্ত নয়। ভেজালের আধিক্য দেখে ভেজাল খাদ্য প্রতিরোধে মৃত্যুদ-ের বিধান রেখে আইন প্রণয়নের দাবি উঠেছে। খোদ খাদ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে প্রশাসনের অনেক শীর্ষ কর্তা এর প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন।
যে ব্যক্তি সত্যিকারের মূল্যবোধ দ্বারা অনুপ্রাণিত, আর যাই হোক সে অন্যায় কিছু করবে না। মূল্যবোধের অনুপস্থিতি অবক্ষয়ের সূচনা করে। অবক্ষয় বলতে সামাজিক স্খলন ও বিচ্যুতিকে বুঝানো হয়। বাস্তবে এর ব্যাপ্তি আরও অনেক বেশি। সামাজিক মূল্যবোধ তথা সততা, কর্তব্যনিষ্ঠা, ধৈর্য, উদারতা, শিষ্টাচার, সৌজন্যবোধ, নিয়মানুবর্তিতা, অধ্যবসায়, নান্দনিক সৃজনশীলতা, দেশপ্রেম, কল্যাণবোধ ও পারস্পরিক মমতাবোধ ইত্যাদি নৈতিক গুণাবলি লোপ পাওয়াকে অবক্ষয় বলে। মূল্যবোধ ও অবক্ষয় পরস্পরবিরোধী। তাই মূল্যবোধ যেখানে দুর্বল, অবক্ষয় সেখানে প্রবল। আলো-আঁধারের মধ্যে যেমন সহাবস্থান নেই, তেমনি অবক্ষয় ও মূল্যবোধ একসঙ্গে চলতে পারে না। মূল্যবোধ বিবর্জিতদের বিচার-বুদ্ধি ক্ষুদ্র ও বৈষয়িক স্বার্থে কলঙ্কিত হয়। নিকটবর্তী স্থূল সুখই তাদের কাম্য। মূল্যবোধের অনুপস্থিতি মানুষের ব্যক্তিত্ব ও সৎ গুণাবলিকে নষ্ট করে। মূল্যবোধসম্পন্ন ব্যক্তির কাছে দূরবর্তী সূক্ষ্ম সুখ আর সৌন্দর্য প্রধান, তার কাছে নিজ স্বার্থ কোনো বিষয় নয়Ñ অপরের কল্যাণই মুখ্য। এই শ্রেণির লোকেরা আইনকে শ্রদ্ধা করেন সব আইনকানুন মেনে চলে। পক্ষান্তরে মূল্যবোধবিবর্জিতরা আইন অমান্য করে এবং মানুষের অকল্যাণকে প্রাধান্য দেয়। মূল্যবোধ এমনি এমনি জাগ্রত হয় না বরং পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পরিসরে এজন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে হয়। এক্ষেত্রে নৈতিক শিক্ষার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখতে হবে, মূল্যবোধের অনুপস্থিতি ও অবক্ষয়ের ব্যাপক বিস্তৃতির কারণে দেশে নিত্য-নতুন অবয়বে অপরাধ ও দুর্নীতি হচ্ছে। এ ধরনের অপরাধ এখন ক্রমবর্ধমান। এর লাগাম এখনই টানতে হবে। সমাজ বিশেষজ্ঞদের অভিমত হলো সামাজিক অনাচার ও যাবতীয় অবক্ষয়ের মূলে রয়েছে ধর্মবিমুখতা। সুতরাং দরকার ধর্মের যথাযথ চর্চা ও অনুশীলন। কারণ ধর্ম মানুষকে সভ্য, সংবেদনশীল ও পরিশীলিত করে। তাই নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন জাতি সৃষ্টি ও অবক্ষয়হীন সমাজ বিনির্মাণ করতে হলে নাগরিকদের মধ্যে জবাবদিহিতার অনুভূতি সৃষ্টি, ধর্মীয় মূল্যবোধের সম্প্রসারণ, লালন ও অনুশীলনের কোনো বিকল্প নেই।
লেখক : মুফতি, শিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক লেখক।