যেকোনো যৌথ সংসারে কিংবা কায়কারবারে সবার সুচিন্তিত মতামত প্রকাশের সুযোগ, কর্তব্যপালনে দৃঢ়চিত্ত মনোভাব পোষণ, উদ্দেশ্য অর্জন তথা অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর ঐকান্তিক প্রয়াসে সমর্পিতচিত্ত ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস যেমন জরুরি, এ কথা বলাবাহুল্য, জাতীয় উন্নয়ন প্রয়াস প্রচেষ্টাতেও সমন্বিত উদ্যোগের আবশ্যকতাও একইভাবে অনস্বীকার্য। জাতীয় সঞ্চয় ও বিনিয়োগে থাকা চাই প্রতিটি নাগরিকের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অবদান। অপচয়, অপব্যয় রোধ, লাগসই প্রযুক্তি ও কার্যকর ব্যবস্থা অবলম্বনের দ্বারা সীমিত সম্পদের সুষম ব্যবহার নিশ্চিতকরণে সবার মধ্যে অভ্যাস, আগ্রহ ও একাগ্রতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠা দরকার। নাগরিক অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা ও উপলব্ধির জাগৃতিতে অনিবার্য হয়ে উঠে যে নিষ্ঠা ও আকাক্সক্ষা, তা অর্জনের জন্য সাধনার প্রয়োজন, প্রয়োজন ত্যাগ স্বীকারের। দায়দায়িত্ব পালন ছাড়া স্বাধীনতার সুফল ভোগের দাবিদার হওয়া বাতুলতা মাত্র। ‘ফেল কড়ি মাখ তেল’ কথাটি এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রযোজ্য এ জন্য, উৎপাদনে সক্রিয় অংশগ্রহণ না করেই ফসলের ন্যায্য অধিকারপ্রত্যাশী হওয়া স্বাভাবিক এবং সংগত কর্ম ও ধর্ম নয়। কোনো কিছু অর্জনে বর্জন বা ত্যাগ স্বীকার যেমন জরুরি, তেমনি প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে বাস্তবতা এই জানান দেয় যে, ‘বিনা দুঃখে সুখ লাভ হয় কি মহিতে?’
অর্থনীতি হিসেবে স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীলে উত্তরণে বাংলাদেশের যোগ্যতা অর্জনের ঘোষণা এসেছে জাতিসংঘের সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) থেকে। শর্ত হিসেবে তিনটি সূচকেই নির্ধারিত মান অর্জন করেছে বাংলাদেশ। তবে এই উন্নতির ধারাবাহিকতা আরও তিন বছর বজায় রাখতে হবে। এরপর ২০২১ সালে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিল (ইকোসোক) স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা উত্তরণের সুপারিশ করবে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অনুমোদনের জন্য আরও তিন বছর অর্থাৎ ২০২৪ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে বাংলাদেশকে। এরপরই উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে জাতিসংঘের তালিকায় পাকাপোক্তভাবে থাকা হবে। প্রথমবারের মতো উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে যোগ্যতা অর্জন করার খবরটি বাংলাদেশের জন্য অবশ্যই ইতিবাচক। ১৯৭৬ সালে এলডিসিভুক্ত হওয়ার পর এই প্রথম অর্থনৈতিক উন্নতির বড় ধরনের স্বীকৃতি মিলল। প্রসঙ্গগত, এর আগে ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাংকের তালিকায় নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হয়েছে বাংলাদেশ। এর ফলে আগামী ৯ বছরে বাজারসুবিধায় তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না। ২০২৭ সাল পর্যন্ত শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা থাকবে। ওষুধশিল্পের মেধাস্বত্ব সুবিধা ২০৩৩ সাল পর্যন্ত থাকবে।
শোষণ বঞ্চনা আর বণ্টন বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার বাঙালির ঐতিহাসিক মুক্তির সংগ্রাম এর প্রকৃত অর্জন বা বিজয় বিবেচনার জন্য বিগত সাড়ে চার দশকের অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিবেশ পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে এই স্বীকৃতি বা অর্জন একটি প্রত্যয় ও প্রতীতি জাগাতে পারে। প্রথমেই আসে সমন্বিত উদ্যোগের প্রেরণার প্রসঙ্গ, যেমনটি মতবাদ হিসেবে করপোরেট কালচার আধুনিক শিল্প ও বাণিজ্য ব্যবস্থাপনায় বিশেষ বিবেচনা ও ব্যাপক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় অংশীদারত্ব হিসেবে শ্রমের মূল্যায়ন সরাসরি স্বীকৃত না হলেও, এটি অনিবার্য উপলব্ধিতে পরিণত হয়েছে যে, কোনো উৎপাদন ও উন্নয়ন উদ্যোগে ভূমি, শ্রম ও পুঁজি ছাড়াও মালিক, শ্রমিক সব পক্ষের সমন্বিত ও পরিশীলিত প্রয়াস প্রচেষ্টাই সব সাফল্যের চাবিকাঠি। মানবসম্পদ উন্নয়ন কার্যক্রমের দ্বারা দক্ষতা ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি ছাড়াও সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়াসকে সমাজবিজ্ঞানীরা জাতিগত উন্নয়নে প্রেরণা হিসেবে শনাক্ত করেন। স্থান-কাল-পাত্রের পর্যায় ও অবস্থানভেদে উন্নয়ন ও উৎপাদনে সবাইকে একাত্মবোধের মূল্যবোধে উজ্জীবিত করার প্রেরণা হিসেবে অনেক উন্নয়নশীল দেশের জাতীয় নেতৃত্ব অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশ্নে একে পুরো দেশবাসীকে ভাববন্ধনে আবদ্ধকরণের চেতনা হিসেবে দেখাতে চাইছেন।
ঈশ্বর চন্দ্র গুপ্ত যেমনটি বলেছেনÑ সবার ওপর মানুষ সত্য তার ওপরে নাই। মানুষই বড় কথা। এই মানুষের দায়িত্ববোধের দ্বারা কর্তব্যকর্ম সুচারুরূপে সম্পাদনের মাধ্যমে সমাজ সমৃদ্ধি লাভ করে। আবার এই মানুষের দায়িত্বহীনতার কারণে সমাজের সমূহ ক্ষতি হয়। মানবসম্পদ না হয়ে সমস্যায় পরিণত হলে সমাজের অগ্রগতি তো দূরের কথা, সমাজ মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য। মানুষের উদ্ভাবনী শক্তি সভ্যতার বিবর্তনে সহায়তা হয়। মানুষের সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ কিংবা মারণাস্ত্রে মানুষের ধ্বংস অনিবার্য হয়ে ওঠে। মানবতার জয়গান মানুষই রচনা করে আবার মানবভাগ্যে যত দুর্গতি তার স্রষ্টাও সে। মানুষের সৃজনশীলতা, তার সৌন্দর্যজ্ঞান, পরস্পরকে সম্মান ও সমীহ করার আদর্শ অবলম্বন করে সমাজ এগিয়ে চলে। পরমতসহিষ্ণুতা আর অন্যের অধিকার ও দাবির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার মাধ্যমে সমাজে বসবাস করার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সুতরাং সবার সহযোগিতা ও সমন্বিত উদ্যোগে সমাজ নিরাপদ বসবাসযোগ্য হয়ে ওঠে। সমাজবিজ্ঞানীরা তাই মানুষের সার্বিক উন্নয়নকে দেশ-জাতি-রাষ্ট্রের সব উন্নয়নের পূর্বশর্ত সাব্যস্ত করে থাকেন।
সমাজের উন্নতি, অগ্রগতি ও কল্যাণ সৃষ্টিতে মানুষের সার্বিক উন্নতি অপরিহার্য শর্ত। আগে সমাজ না আগে মানুষ, এ বিতর্ক সর্বজনীন। মানুষ ছাড়া মনুষ্য-সমাজের প্রত্যাশা বাতুলতামাত্র। সুতরাং একেকটি মানুষের উন্নতি সবার উন্নতি, সমাজের উন্নতি। একেক মানুষের দায়িত্ববোধ, তার কাণ্ডজ্ঞান তার বৈধ-অবৈধের উপলব্ধি এবং ভালোমন্দ সীমা মেনে চলার চেষ্টা-প্রচেষ্টার মধ্যে পরিশীলিত পরিবেশ গড়ে ওঠা নির্ভর করে। রাষ্ট্রে সব নাগরিকের সমান অধিকার এবং দায়িত্ব নির্ধারিত আছে। কিন্তু দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা অধিকার আদায়ের সম্ভাবনা ও সুযোগকে নাকচ করে দেয়। পণ্য ও সেবা সৃষ্টি না হলে চাহিদা অনুযায়ী ভোগের জন্য সম্পদ সরবরাহে ঘাটতি পড়ে। মূল্যস্ফীতি ঘটে সম্পদপ্রাপ্তিতে প্রতিযোগিতা বাড়ে। পণ্য ও সেবা সৃষ্টি করে যে মানুষ, সে মানুষই ভোক্তার চাহিদা সৃষ্টি করে। উৎপাদনে আত্মনিয়োগের খবর নেইÑ চাহিদার ক্ষেত্রে ষোলোআনা- টানাপড়েন তো সৃষ্টি হবেই। অবস্থা ও সাধ্য অনুযায়ী উৎপাদনে একেকজনের দায়িত্ব ও চাহিদার সীমারেখা বেঁধে দেওয়া আছে কিন্তু এ সীমা অতিক্রম করলে টানাপড়েন সৃষ্টি হবেই। ওভারটেক করার যে পরিণাম দ্রুতগামী বাহনের ক্ষেত্রে, সমাজে সম্পদ অর্জন ও ভোগের ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রমে একই পরিবেশ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে থাকে। সমাজে অস্থিরতা ও নাশকতার যতগুলো কারণ এ যাবৎ আবিষ্কৃত হয়েছে, তার মধ্যে এ সম্পদ অবৈধ অর্জন, অধিকার বর্জন এবং আত্মত্যাগ স্বীকারে অস্বীকৃতি মুখ্য।
অনেকে মনে করেন, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশ হলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের বাজারসুবিধা সংকুচিত হতে পারে। দাতাদের কাছ থেকে কম সুদে ঋণ পাওয়ার সুযোগও কমে যাবে। তাই অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সম্পদ বৃদ্ধির দিকেই বেশি মনোযোগী হতে হবে। আবার অভ্যন্তরীণ বাজার চাঙা করতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের আয় বাড়াতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে কাটাতে হবে অবকাঠামো দুর্বলতা। জোর দিতে হবে দক্ষ শ্রমশক্তি তৈরিতে। দাতাদের কাছ থেকে যেহেতু রেয়াতি সুদে ঋণপ্রাপ্তি কমে যাবে, তাই বিকল্প অর্থায়নের দিকেও জোর দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে কর আহরণ বৃদ্ধি করতে হবে। যেসব দেশ এলডিসি থেকে বের হয়েছে, তাদের বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশেরও দায়িত্ব ও সম্ভাবনা বেড়ে গেল। বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতি-ধারাবাহিকতা বজায় রাখার কোনো বিকল্প নেই। অর্থনীতিতে যে কাঠামোগত দুর্বলতা আছে, ব্যাংকসহ আর্থিক খাতে যে দুর্বলতা আছে, যে দুষ্টক্ষত বিরাজমান তা দূর করতে হবে। কেননা, এমন একসময় বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বের হবে, তখন বৈরী আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিস্থিতিও মোকাবিলা করতে হবে। সে সক্ষমতা অরজনে যতœবান ও প্রতিশ্রুতিশীল থাকতে হবে।
লেখক : সরকারের সাবেক সচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যান