বেসরকারি গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭টি বিভাগের মধ্যে ৫টি বিভাগকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) অবৈধ ঘোষণা করায় প্রায় ১২০০ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী নতুন বিভাগ খোলার শর্ত পূরণ না হওয়াতেই অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে বলে দাবি ইউজিসির। তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষের দাবি, সব নিয়ম মেনেই বিভাগগুলো খোলার আবেদন করা হয়। সর্বোচ্চ আদালতও বারবার বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে রায় দিয়েছে। ২০১২ সাল থেকে আদালতের নির্দেশ নিয়ে বিভাগগুলো পরিচালিত হচ্ছে। তবে চলতি মাসের প্রথম দিকে ইউজিসির ওয়েবসাইটে বিশ্ববিদ্যালয়টির বিবিএ, এনভায়রনমেন্ট সায়েন্স, এমবিবিএস, বিডিএস এবং ফিজিওথেরাপি বিভাগকে অবৈধ ঘোষণা করায় হতাশ হয়ে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, ইউজিসি শিক্ষার্থীদের জীবন অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করেছেন, সাবেক ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর ওপর ক্ষোভ থেকেই অবৈধ ঘোষণা করেছেন। একই কারণে বিশ্ববিদ্যালয়টির ভিসি নিয়োগ আটকে রেখেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ রসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. ফুয়াদ হোসেন বলেন, ‘ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান ড. আবদুল মান্নান ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের ফলে রাষ্ট্রীয় পদকে ব্যবহার করে প্রতিহিংসাপরায়ণের যে
ঘটনা ঘটিয়েছে তা নজিরবিহীন। গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি প্রতিষ্ঠিত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সমস্যা সমাধানে সরকারের সর্বোচ্চ মহল হস্তক্ষেপ করবে বলে আমরা শিক্ষকরা আশা করছি।’
ইউজিসির সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন বিভাগ চালু করতে হলে ইউজিসিতে আবেদন করতে হয়। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ইউজিসি দেখে বিশ্ববিদ্যালয়টির সক্ষমতা আছে কিনা। পর্যাপ্ত শিক্ষক, ক্লাসরুম আছে কিনা। সব ঠিক থাকলে অনুমোদন দেওয়া হয়। ওই বিভাগগুলোতে সক্ষমতার সমস্যা ছিল। তবে বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ আদালত পর্যন্ত নিয়ে যাওয়াতে এখন আর ইউজিসির কিছু করার নেই। তবে শিক্ষার্থীদের জন্য আমার খারাপ লাগে।’
ডা. জাফরুল্লাহর সঙ্গে কোনো ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তিনি আমার অনেক সিনিয়র, আমি তাকে সম্মান করি। আমার সঙ্গে কোনো ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব নেই। তবে তিনিই আমাকে গণ বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে হুমকি দিয়েছেন।’
বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৯৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময়ই বিভাগগুলোর অনুমোদন নেওয়া হয়। শুরু থেকে সব বিভাগ চালু করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে ২০১২ সালের পর থেকে একে একে বিভাগগুলো চালু করতে গেলে বাধা দেয় ইউজিসি। ২০১০ সালের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনে বাধা দেওয়া হয়। এরপর নতুন করে আবার আবেদন করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ। কিন্তু অনুমোদন দেয়নি ইউজিসি। এরপর উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ। হাইকোর্টের নির্দেশে পরিচালিত হতে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়টি। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিবিএস ও বিডিএসে ছয় শতাধিক, বিবিএতে দুই শতাধিক, ফিজিওথেরাপিতে চার শতাধিক শিক্ষার্থী অধ্যায়ন করছেন। বিভাগগুলোতে ক্রমেই শিক্ষার্থী কমতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এদিকে চলতি মাসে ইউজিসির ওয়েবসাইটে ওই পাঁচটি বিভাগ অবৈধ ঘোষণা করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘গণ বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃক অননুমোদিতভাবে পরিচালিত বিবিএ, এনভায়রনমেন্ট সায়েন্স, এমবিবিএস, বিডিএস এবং ফিজিওথেরাপি প্রোগ্রামসমূহে মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশনের ছয় মাসের স্থগিতাদেশ থাকার জন্য (রিট পিটিশন নং ৭১৯৬/২০১৭) কমিশনের ওয়েবসাইটে আপলোড করা হয়েছিল। বর্তমানে উক্ত স্থগিতাদেশ এর কার্যকারিতা ভ্যাকেট হয়ে যাওয়ায় প্রোগ্রামসমূহ অনুমোদিত/বৈধ বলে বিবেচিত হবে না।’
বিবিএ বিভাগের এক শিক্ষক জানান, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী বিবিএ বিভাগ আগামী নভেম্বর পর্যন্ত বৈধ। এরপরও কীভাবে ইউজিসি এমন কাজ করল তা আমাদের বোধগম্য নয়।
বিবিএ তৃতীয় বর্ষের এক ছাত্রী বলেন, ‘আমরা ভর্তি হওয়ার পরই জানতে পারি বিভাগটির অনুমোদন নেই। কয়েক দফায় আন্দোলনও করেছি। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শুধু আশ্বাস দেয়। মনে হচ্ছে বিভাগটি বন্ধই হয়ে যাবে।’
গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক ডা. জাফরুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সব নিয়ম মেনে বিভাগগুলো খুলেছি। কিন্তু আবদুল মান্নান সাহেব খামখেয়ালি করে অনুমোদন আটকে রেখেছেন। তিনি ভিসি নিয়োগের বিষয়ে অহেতুক ঝামেলা করেছেন। বর্তমান ইউজিসির চেয়ারম্যান অত্যন্ত বিজ্ঞ ও ভালো মানুষ। আমার বিশ্বাস, বিভাগগুলোর নিয়ে যে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে তার সমাধান তিনি করবেন।’