বরফ ঢাকা পাহাড়ের শৃঙ্গ হোক, কিংবা হোক গহিন কোনো জঙ্গল। মানুষের পদচারণা সব জায়গায়। কিন্তু পৃথিবীতে এমন কিছু জায়গা রয়েছে যেখানে মানুষের প্রবেশ প্রায় নিষিদ্ধ। কারণটা অনেক সময় ঐতিহাসিক, কখনো নিরাপত্তা বা বিপদের কোনো আশঙ্কা। বিজনেস ইনসাইডার অবলম্বনে এরকমই কিছু নিষিদ্ধ জায়গা নিয়ে লিখেছেন লায়লা আরজুমান্দ
ফোর্ট নক্স ভল্ট যেন আলীবাবার গুপ্তধন
সারি সারি করে রাখা সোনার বার। মাটি থেকে ছাদ পর্যন্ত কোথাও সোনা ছাড়া আর কিছু নেই। দেখে মনে হবে যেন আলীবাবার গুপ্তধন। ভাবছেন এমন জায়গা সত্যি আছে নাকি? এমন জায়গা কিন্তু সত্যি রয়েছে। জায়গাটা এতই সুরক্ষিত যে সাধারণ মানুষের প্রবেশের কোনো ধরনের সুযোগ নেই।
জায়গাটির অবস্থান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকি অঙ্গরাজ্যের ফোর্ট নক্স আর্মি পোস্টে। জায়গার সঙ্গে মিলিয়ে এই জায়গার নাম রাখা হয়েছে ফোর্ট নক্স ভল্ট। বলা হয়ে থাকে বিশ্বের সব থেকে বেশি সোনার মজুদ রয়েছে এই ভল্টেই। সেই সোনার পরিমাণ কত সেটা জানলে চোখ কপালে উঠে যাবে। ২০১৮ সালের হিসাব অনুযায়ী এই ভল্টে রয়েছে ১৪৭ মিলিয়ন আউন্সেরও বেশি স্বর্ণ। যার বাজার মূল্য ২৬১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ২২ লাখ ১ হাজার ৮শ কোটি টাকারও বেশি। এই ভল্টে শুধু সোনাই নয় রয়েছে ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ দলিলও যা এখনো ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে। যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার দলিল, ম্যাগনাকার্টার, বিল অফ রাইটস-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ কাগজ।
১৯৩৫ সালে মার্কিন সরকার সোনা সংরক্ষণের জন্য গড়ে তোলে এই ভল্ট। সে সময়েই এটি তৈরি করতে খরচ হয়েছিল ৫ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার। এত স্বর্ণ আর ঐতিহাসিক দলিল রয়েছে যেখানে তার সুরক্ষা ব্যবস্থা কেমন হবে তা আর নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না। এই ভল্টের নিরাপত্তার জন্য নিয়োজিত রয়েছে দেশটির মিন্ট পুলিশ বাহিনী ও সেনাবাহিনী। ভল্টের চারদিকে রয়েছে উঁচু কাঁটাতারের বেড়া ও বিদ্যুতায়িত কাঁটাতারের বেড়া। রয়েছে অ্যালার্ম, ভিডিও ক্যামেরা, মাইন ফিল্ডও। এই ভবনের দেয়াল তৈরি করা হয়েছে চার ফুট পুরু গ্রানাইট এবং ৭৫০ টন ইস্পাত দিয়ে। যার ফলে এটা বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব না। ভেতরে যে মূল ভল্ট রয়েছে তার দরজা প্রায় ২ ফুট পুরু। দরজায় রয়েছে লক কম্বিনেশন সিস্টেম। আর এই লকের পাসওয়ার্ড কোনো একজনের কাছে থাকে না। কয়েকজন ব্যক্তির কাছে একটু একটু অংশ থাকে। তাই দরজা খুলতে হলে সবাইকে হাজির থাকতে হয়। এত খুব স্বাভাবিক যে এখানে অনুমতি ছাড়া কোনো মানুষ প্রবেশ করতে পারবে না। এবং পারেও না।
সাপের রাজ্য
ব্রাজিলের ইলহা দা কুয়েইমাডা গ্র্যান্ডে দ্বীপটি আসলে একটি মৃত্যুপুরি। ব্রাজিলের সাও পাওলো উপকূলবর্তী এই দ্বীপটিকে বলা হয় সাপের রাজ্য। কেউ কেউ এই দ্বীপটিকে স্নেক আইল্যান্ড হিসেবেও অভিহিত করে। সাও পাওলো থেকে এই দ্বীপের দূরত্ব প্রায় ৯৩ মাইল। জানা গেছে, প্রায় ১১ হাজার বছর আগে ব্রাজিলের মূল ভূখন্ড থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিল এই দ্বীপটি। তারপর থেকেই সেখানে
আস্তানা গড়ে সাপের দল। দ্বীপজুড়ে কেবল সাপ আর সাপ। একটি-দুটি নয়, হাজার হাজার সাপ এই দ্বীপে নিজেদের রাজ্য গড়ে তুলেছে। খুব স্বাভাবিকভাবেই সেখানে মানুষ নেই, নেই বসতিও। দ্বীপের একপাশ থেকে আরেক পাশ পর্যন্ত একই প্রজাতির সাপের বিচরণ। এই সাপের নাম ‘বোথরোপস ইনসুলারিস’। এদের বিষ এতই ভয়ানক যে মানুষের মাংসকে মুহূর্তে গলিয়ে ফেলতে পারে। রূপকথার মতো শোনালেও বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর ও বিষধর এই সাপের অস্তিত্ব রক্ষায় ব্রাজিল সরকার দ্বীপটিতে মানুষের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। সাপের এই রাজ্যে জনমানবের বাস না থাকলেও প্রতিবছর সাপের ওপর গবেষণা করতে কিছু বিজ্ঞানীকে সেখানে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। তাছাড়া সেখানে তৈরি করা হয়েছে একটি লাইট হাউজ। নৌবাহিনীর একটি দল বিশেষ গ্যাস এবং ওষুধ নিয়ে লাইট হাউসের বাতি ও ব্যাটারি পরিবর্তন করতে যায়।
১৭ হাজার বছর আগের লাসকো গুহা
১৯৪০ সালে লাসকো গুহাটি আবিষ্কার করেন মার্কেল রেভিডাট নামে ১৮ বছরের এক তরুণ। তার পোষা কুকুর একটি গর্তে পড়ে গিয়েছিল। কুকুরটিকে উদ্ধার করতে তিনি সেই গর্তে নামেন। সেখানেই তিনি দেখতে পান আরেকটি গর্ত চলে গেছে ভেতরের দিকে। কৌতূহলবশত তিনি প্রবেশ করেন সেই গর্তে। কিন্তু প্রবেশ করে দেখেন এটা আসলে একটি গুহা। খুব বেশি আলো না থাকায় ভেতরে কী রয়েছে ভালো করে দেখতে পারেননি তিনি। ফিরে এসে তিনি তার তিন বন্ধুকে নিয়ে সেই গুহায় আলো নিয়ে আবার প্রবেশ করেন। তবে তারা মাত্র ৪৭ ফুট পর্যন্ত যেতে পেরেছিলেন, তার পর থেকেই এই গুহার নাম ছড়িয়ে পড়তে থাকে।
গুহাটি অবস্থিত দক্ষিণ ফ্রান্সে। ধারণা করা হয় এই গুহাটি ১৭ হাজার বছর আগেকার। আর গুহার দেয়াল ও ছাদ জুড়ে আঁকা রয়েছে ৬০০ চিত্রকর্ম, যা আদিম যুগের মানুষদের আঁকা। ছবিগুলোকে তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা যায়, প্রাণী, মানুষ ও বিমূর্ত চিত্রকর্ম। ছবিগুলো আঁকার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে মোট তিন ধরনের রংÑ লাল, হলুদ ও কালো। গুহার মধ্যে থাকা প্রাণীদের ছবি এখন জীবাশ্ম গবেষণার অন্তর্ভুক্ত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৮ সালে আশপাশের এলাকাগুলো সংস্কার করে গুহাটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। কিন্তু কিছুদিন পরেই লক্ষ করা যায় ছবিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কিছু ছবি ঝাপসা হতে হতে প্রায় গায়েবই হয়ে যায়। তার কারণ হলো প্রতিদিন প্রায় ১২০০ মানুষ এই গুহায় প্রবেশ করত। আর এর ফলে ছবিগুলো কার্বন-ডাই-অক্সাইডের সংস্পর্শে আসছিল। তাছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে গুহার ভেতর লাইট জ্বলার কারণেও ছবি নষ্ট হচ্ছিল।
তারপর ১৯৬৩ সাল থেকে সেই গুহায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করে ফ্রান্স সরকার। তবে কয়েকজন বিজ্ঞানী মাত্র কয়েকদিনের জন্য এই গুহায় প্রবেশের অনুমতি পান। ১৯৭৯ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক ‘বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী স্থান’-এর মর্যাদা পেয়েছে এই গুহা।
রহস্যে ঘেরা নর্থ সেন্টিনেল দ্বীপ
রহস্যে ঘেরা একটি দ্বীপ নর্থ সেন্টিনেল। দ্বীপটি অবস্থিত বঙ্গোপসাগরের আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে। এখানে চাইলেও কেউ যেতে পারে না। সভ্য জগতের মানুষের পদচিহ্ন প্রায় পড়ে না বললেই চলে। আর পড়লেও দেখা যায় অনেকে ক্ষেত্রে ফিরে আসা সম্ভব হয় না। এই দ্বীপের বাসিন্দারা হলো সেন্টিনেলি উপজাতি। এরা খুবই সংরক্ষণশীল এবং বাইরের জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। দ্বীপের ওপর দিয়ে যদি কোনো বিমান বা হেলিকপ্টার যায় তারা তীর দিয়ে আক্রমণ করতে থাকে।
প্রবাল প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত এই দ্বীপটির আয়তন ৭২ বর্গকিলোমিটার। ভৌগোলিক অবস্থান হিসেবে দ্বীপটি ভারতের জলসীমার অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু দ্বীপের ওপর ভারতের কোনো কর্তৃত্ব নেই। বহুবার চেষ্টা করেও তারা এ দ্বীপটিতে ঢুকতে ব্যর্থ হয়েছে। কেউ ঢুকতে গেলেই তারা সেখানকার অধিবাসীদের হিংস্রতার শিকার হয়। হত্যা করা হয়। বাইরের জগতের কেউ তাদের রাজত্বে নাক গলাক এটা মোটেও পছন্দ না এখানকার বাসিন্দাদের।
যেসব পর্যটক এই দ্বীপটিতে প্রবেশের চেষ্টা করেছেন কিংবা কাছে গিয়েছেন তারা প্রত্যেকেই উপজাতিদের দ্বারা হামলার শিকার হয়েছেন।
১৯৭৫ সালে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের একজন চিত্রগ্রাহক গিয়েছিলেন এই দ্বীপে। উপজাতিদের বিষ মাখানো তীরে মারাত্মকভাবে জখম হন। ১৯৯০ সালে আরও কিছু অভিযান পরিচালনা করা হয়। কিন্তু বাসিন্দাদের আক্রমণে প্রাণ হারান কিছু মানুষ। বিভিন্ন সময় তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় বিভিন্ন ধরনের উপহার যেমন খাবার, পোশাক ইত্যাদি দিয়ে। কিন্তু দ্বীপবাসীদের হিংস্র মনোভাবের কারণে বারবারই সেটা ব্যর্থ হয়।
২০০৬ সালে দুই জেলে ভুল করে চলে গিয়েছিল ওই দ্বীপে। তাদের মেরে ফেলা হয়। জেলেদের লাশ আনতে একটি হেলিকপ্টার গিয়েছিল সেখানে। তীর মেরে হেলিকপ্টারকেও তাড়িয়ে দেওয়া হয়। হতভাগ্য সেই জেলেদের লাশ আর সেখান থেকে ফেরত আনা হয়নি। বর্তমানে এই দ্বীপে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।
দ্বীপের বাসিন্দাদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানা যায় না। ধারণা করা হয় বর্তমানে এই দ্বীপের বাসিন্দা রয়েছে সর্বোচ্চ ৫০০। দ্বীপের বাসিন্দারা মূলত শিকার নির্ভর। সামুদ্রিক মাছ, প্রাণী, ফলমূল খেয়েই তারা বেঁচে থাকে।
ছিন শি হুয়াংয়ের সমাধি
চীনের প্রথম সম্রাট ছিন শি হুয়াংয়ের সমাধি ঘিরে হাজার হাজার সৈন্য ও তাদের ঘোড়াগুলো সতর্ক পাহারা দিচ্ছে। অন্তত দেখলে এমনটাই মনে হবে। মোট ২০০০ টেরাকোটা সেনার ভাস্কর্য এখন পর্যন্ত আবিষ্কার করা হয়েছে। আরও রয়েছে ৮০০০ সেনার ভাস্কর্য। টেরাকোটা হলো শক্ত কাদামাটির আস্তরণে তৈরি মাটির মূর্তি। আবিষ্কৃত এই মূর্তিগুলোর বেশির ভাগের উচ্চতা ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি, কয়েকটা আবার বেশি। নেই কারও চেহারার সঙ্গে কারও মিল। শুধু চেহারা কেন তাদের মুখের ভাবভঙ্গিও একেক রকম।
সম্রাট মৃত্যুর পরও অমর থাকতে চেয়েছিলেন। আর সে জন্য প্রচুর সম্পদ ব্যয় করে মৃত্যুর আগেই নিজের জন্য নির্মাণ করেছেন সমাধি। জীবিতকালে অসংখ্য সৈন্য তাকে পাহারা দিয়েছে, যুদ্ধ করেছে। মৃত্যুর পরও অসংখ্য সৈন্য পাহারা দিচ্ছিল তাকে। সম্রাটের মৃত্যু হয় খ্রিস্টপূর্ব ২১০ সালে। আজ থেকে প্রায় দুই হাজার বছরেরও আগে।
কিন্তু এই সমাধি জনসম্মুখে আসে ১৯৭৪ সালে। মাউন্ট লিশান নামক জায়গায় এক কৃষক টিউবওয়েল বসাতে গিয়ে মাটির যোদ্ধার ভাঙা হাত-পা ও তীরের সন্ধান পান। সেই বছরই চীন সরকারের প্রতœতত্ত্ব বিভাগ এখানে অনুসন্ধান ও খননকাজ শুরু করে।
প্রায় সাড়ে ৬ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে রয়েছে সমাধির এই এলাকা। কিন্তু পুরো জায়গাটি এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। সম্রাটের মূল সমাধি পর্যন্ত পৌঁছানো যায়নি এখনো। সমাধি পর্যন্ত পৌঁছাতে এখনো লেগে যাবে আরও একশো বছর। তাই সেটা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাছাড়া খননকাজ এখন বন্ধ রাখা হয়েছে। তার কারণ হচ্ছে সমাধির ভেতরকার অবস্থা। একটু ছেঁাঁয়া লাগলেও হয়তো হারিয়ে বা নষ্ট হয়ে যেতে পারে হাজার বছরের ঐতিহ্য। তাই আসলে মূল সমাধি বা তার আশপাশে কী রয়েছে সেটা মানুষের অগোচরেই রয়েছে।
১৯৮৭ সালের ডিসেম্বর মাসে ইউনেস্কো এই বিশাল সমাধি এবং এর ভেতরের মাটির তৈরি সব সৈন্য মূর্তিগুলোকে ওয়ার্ল্ড কালচারাল হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
ভ্যাটিকান সিক্রেট আর্কাইভ
সপ্তদশ শতকে পোপ পঞ্চম পলের হাত ধরে শুরু হয়েছিল ভ্যাটিকান সিক্রেট আর্কাইভের যাত্রা। অষ্টম শতাব্দী থেকে এ পর্যন্ত পোপদের আদান প্রদানকৃত নানা চিঠিপত্র, অধ্যাদেশ এবং এমনই অনেক ঐতিহাসিক জিনিসপত্র সংরক্ষিত রয়েছে এখানে। আর্কাইভে পাওয়া ডকুমেন্টগুলোর মাঝে সবচেয়ে পুরনোটি ৮০৯ খ্রিস্টাব্দের। ধারণা করা হয় খ্রিস্টান, মিশনারি, প্যাগান আরও অনেক ধর্ম আর মতবাদের অনেক গোপন ডকুমেন্ট এখানে সংরক্ষিত আছে। পাঠাগারের ভেতরে প্রায় ৫৪ কিলোমিটার বইয়ের দীর্ঘ তাক রয়েছে। সেখানে রাখা আছে ৩৫ হাজার ভলিউম নথি।
১৮৮১ সালে পোপ ত্রয়োদশ লিওর অনুমোদনের আগ পর্যন্ত ভ্যাটিকানের এ সিক্রেট আর্কাইভে গবেষকদের প্রবেশাধিকার ছিল না। সেই নিয়ম এখনো খুব একটা বদলায়নি। সাধারণ মানুষের এই গ্রন্থাগারে প্রবেশের অধিকার নেই। খুব কমসংখ্যক প-িতের বা গবেষকের এখানে প্রবেশের সৌভাগ্য হয়। তাও পোপের অনুমতি ছাড়া সেটি একেবারেই অসম্ভব। আর সেই প্রক্রিয়া এতটাই জটিল যে কেউ পারতপক্ষে এই ঝামেলায় যেতে চান না।
অনুমতি নিতে গেলে সেখানকার কর্তৃপক্ষকে বোঝাতে সক্ষম হতে হবে যে আপনি বিশেষ কাজে সেখানে প্রবেশ করতে চান। যদি বোঝাতে সক্ষম হন কেবলমাত্র তখনই আপনি সেখানে প্রবেশের অনুমতি পাবেন। কিন্তু প্রবেশ করলেই যে সব দেখতে পাবেন এমন না। ভেতরে গিয়ে দায়িত্বরতদের জানাতে হবে ঠিক কোন বিষয়ের ওপর ডকুমেন্ট দেখতে চান। একদিনে তিনটির বেশি ডকুমেন্ট দেখার অনুমতি নেই।
ইতিহাসের সাক্ষী চেরনোবিল
উনিশশ ছিয়াশি সালের এপ্রিল মাসে ইউক্রেনের চেরনোবিলে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি চুল্লিতে বিস্ফোরণ ঘটে। যা ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুতর পারমাণবিক দুর্ঘটনা। বিস্তীর্ণ জায়গা জুড়ে শক্তিশালী তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ছড়িয়ে পড়ে। পারমাণবিক বিকিরণের মাত্রা জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ স্তরে পৌঁছে যায়। দুর্ঘটনার পরপরই এর পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তায় মারা যায় ৫৬ জন যাদের মধ্যে ছিল ৯ জন শিশু। মৃতদেহ থেকে তেজস্ক্রিয়তা ছড়ানোর সম্ভাবনা থাকায় কবর দেওয়ার আগে সিসা দিয়ে ঝালাই করে দেওয়া হয়েছিল অনেকের কফিন। পরবর্তী সময়ে আরও চার হাজার মানুষ এই তেজস্ক্রিয়তার কারণে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে। এক সপ্তাহের মধ্যে পারমাণবিক বিকিরণ কেন্দ্রের চারদিকের দশ মাইলের মধ্যে যতগুলো গ্রাম ছিল সব বাসিন্দাকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
অবস্থা এতই ভয়াবহ হয়েছিল বাসিন্দাদের সঙ্গে করে কিছুই নিয়ে যেতে দেওয়া হয়নি। পোষা প্রাণী কিংবা শিশুদের খেলনা কিছুই নয়। লোকজন যাতে আতঙ্কিত না হয় সে জন্য তাদের বলা হয়েছিল তিনদিন পর তারা ফেরত আসতে পারবেন। কিন্তু তাদের বেশির ভাগই আর কখনোই বাড়ি ফিরতে পারেনি। গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল অধিকাংশ বাড়ি।
বিকিরণ যাতে আর ছড়াতে যা পারে সে জন্য বিদ্যুৎকেন্দ্র তুলে তা মাটির নিচে চাপা দিয়ে কংক্রিট দিয়ে ঢালাই করে দেওয়া হয়। হেলিকপ্টার থেকে পানি ছিটিয়ে তেজস্ক্রিয় ধুলো যেন আর বাতাসে ছড়িয়ে না পড়ে সেই চেষ্টা করা হয়। শহরের সব কুকুর-বিড়ালকে মেরে ফেলা হয় যাতে তাদের মাধ্যমে আর তেজস্ক্রিয়তা না ছড়ায়। এক সময় দেখা গেল ওই এলাকার চারদিকে শুধু ১০ মাইল নয় ৩০ মাইল পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এরপর ৩০ মাইলের মধ্যে যারা ছিলেন সবাইকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
সেই থেকে চেরনোবিলের চারদিকের এলাকা এখনো সাধারণ মানুষের জন্য নিষিদ্ধ। সেখানে এখন গহিন জঙ্গল। ঘুরে বেড়ায় নানা ধরণের প্রাণী। তবে চেরনোবিলে যে একেবারেই মানুষ আসে না এমন নয়, অল্প কিছু মানুষ আছে যারা হয় গবেষণার কাজে, না হয় শ্রমিক হিসেবে কিংবা আসেন পর্যটক হিসেবে।
গবেষকদের মতে বিস্ফোরণের পরেও এই শক্তিকেন্দ্রে প্রায় ২০০ টনের মতো তেজস্ক্রিয় পদার্থ মজুদ থেকে গেছে। এই তেজস্ক্রিয় পদার্থ পুরোপুরি নিস্ক্রিয় হতে আরও প্রায় ১০০ থেকে ১০০০ বছর লেগে যাবে।