বাংলাদেশের সবখানেই এখন দূষণ। শহরাঞ্চলের নদীগুলো দুর্গন্ধময় বিষাক্ত শিল্পবর্জ্যে ভরা; গ্রাম ও বনভূমিতে লাগানো হয়েছে নিষ্ফলা ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বিজাতীয় গাছ। গ্রামাঞ্চলের যে নদীগুলোতে বৈশাখ মাসেও হাঁটুজল থাকত সেগুলো এখন মরা। বিল ও জলাভূমিগুলো অতি নিষ্কাশনে শুষ্ক। এখন শুকনা মৌসুমে সারা দেশে ফসল উৎপন্ন হয়, কিন্তু খালে ও বিলে, এমনকি অনেক নদীতেও হাঁটুজলও আর নেই। অনেক জলাভূমি শুকিয়ে ফেলে ধানচাষ করা হচ্ছে। নদীগুলোকে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে লিজ দিয়ে জেলে সম্প্রদায়কে বিতাড়িত করা হয়েছে। বাংলাদেশ আগে জলময় ও বনময় ছিল। এখন আগের অনেক নদী আর খাল-বিলই মৃত। প্রাকৃতিক কারণে নয়, মানুষের কারণে এসব মৃত। বাংলাদেশের সর্বত্রই নদীগুলো দখল, দূষণ ও ভরাট হচ্ছে। আমাদের নদীগুলো দূষণমুক্ত করে সংরক্ষণ করাটা যে কতটা জরুরি তাই এখানে আলোচনা করতে চাই।
যে কেউই স্বীকার করবেন বাংলাদেশের নদীগুলো ক্রমশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। আগে বলা হতো নদীর একূল ভাঙে ওকূল গড়ে। তাও যে হচ্ছে না তা নয় তবে নদীগুলোর উজানে মানবসৃষ্ট বাধার জন্য নদীর প্রবাহ কমে যাচ্ছে, নদীগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চলে ষাটের দশকে দেওয়া বেড়িবাঁধ স্বাভাবিক নদীপ্রবাহ নষ্ট করেছে, ফলে নদীমুখ ভরাট হয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করেছে। সারা দেশে অনেক নদীতে পানি নিয়ন্ত্রণের জন্য বাঁধ ও স্লুইস গেট নির্মাণ এবং রাস্তা তৈরি করে নদীপ্রবাহে বাধা দেওয়া হয়েছে ও ভরাটের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ভারতের দেওয়া ফারাক্কার বাঁধের কারণে পদ্মা নদী বালিতে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। পদ্মা নদী ভরাট হওযার কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলো মরে যাচ্ছে। এভাবে ভারত-বাংলাদেশের অভিন্ন কিছু নদী যথাÑ তিস্তা, মহানন্দা, ধরলা, দুধকুমার, গোমতী ইত্যাদির অনেকগুলোতে ভারত ব্যারেজ ও ড্যাম নির্মাণ করে পানি সরিয়ে নেওয়ায় বাংলাদেশের অংশে ঐ সকল নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের সমতলে উজানের প্রায় ১৫ গুণ এলাকার বৃষ্টির পানি আসে, একই সঙ্গে আসে বছরে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মিলিয়ন টন পলি। এই পলির একটি অংশ প্লাবনভূমির ওপর পড়ে জমির উর্বরতা ও উচ্চতা বাড়ায়, বাকিটা সমুদ্রে পড়ে। কিন্তু এখন উজানে পানি সরিয়ে নেওয়ার কারণে বর্ষাশেষে হঠাৎ নদীর পানি কমে যায়, ফলে পলির অনেকাংশ সমুদ্রে না যেতে পেরে নদীর প্রবাহপথে জমা হয়ে যায়। এভাবেই নদীগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও অন্যান্য ছোট-বড় নগর-শহরের নদীগুলো ভরাট হচ্ছে আবর্জনায় ও শিল্প বর্জ্য।ে শহরের যত কঠিন বর্জ্য সরাসরি অথবা নর্দমা-নালা হয়ে শেষমেশ নদীতে গিয়ে পড়ছে। এর ফলে নদী তার নাব্য ও নিষ্কাশন ক্ষমতা হারাচ্ছে। ঢাকার সদরঘাটের কাছে বুড়িগঙ্গা নদীর তলা প্রায় ৩ মিটার চামড়া, প্লাস্টিক, কাপড়, ধাতু, কাচ ও বিল্ডিং ভাঙা আবর্জনা দিয়ে পূর্ণ। এই নদীতে উজান থেকে আসা পলির পরিমাণ খুবই কম। ঢাকা শহরের বালু, তুরাগ ও টঙ্গী নদী ক্রমশ আবর্জনায় ভরাট হয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে কোনো আইনের শাসন আছে বলেই প্রতীয়মান হয় না। কারণ দুর্বৃত্তরা সারা দেশের নদীর তলদেশ পর্যন্ত দখল করে নিচ্ছে। ঢাকা মহানগরীর চতুর্পার্শ্বসহ সারা দেশের নদী ও জলাভূমিসমূহ জনগণের মিলিত সম্পত্তি বা খাসজমি। সমাজের একটি বিশেষ মহল এই খাসজমিসমূহ ক্রমশ দখল করে নেওয়ায় জনগণ তাদের সম্পদের ওপর অধিকার তথা ঐতিহাসিকভাবে প্রাপ্ত সুবিধা হারিয়ে ফেলছে। দেশের পরিবেশবাদী সংগঠনসমূহ এবং মিডিয়া এই দখলবাজদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেও জনগণের সম্পত্তি দখল রোধ করা যাচ্ছে না।
নদী ও জলাভূমি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে, ডাঙা ও জলের জীববৈচিত্র্য ও জীবনচক্র রক্ষা করে, মানুষের খাদ্য জোগায়, যোগাযোগ ব্যবস্থায় ভূমিকা রাখে। কিন্তু শহর ও মফস্বলে নদীদূষণ এখন একটি সর্বগ্রাসী সমস্যা। সর্বস্তরের নাগরিকদের সামগ্রিক সচেতনতার অভাব ও ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা না করে এক শ্রেণির মানুষের হঠাৎ আয়বৃদ্ধির আকাক্সক্ষা নদীদূষণের অন্যতম কারণ। শহরাঞ্চলে এর প্রধান কারণ শিল্প-কলকারখানার অপরিশোধিত রাসায়নিক বর্জ্য নিক্ষেপ। গ্রামাঞ্চলের কারণ কৃষিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক বিষ। এইসব মিলিত দূষণ সারা দেশে বছরে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার মাছ উৎপাদন রোধ করছে। ঢাকার আশপাশের তুরাগ, বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও টঙ্গী নদীর পানি চরমভাবে বিষাক্ত এবং আলকাতরার মতো কালো। এই বিষাক্ত বর্জ্য নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ এলাকার নদীগুলো দূষিত করে জলজ প্রাণিসম্পদবর্জিত করেছে ও নিকটবর্তী মেঘনা নদীর মাছ প্রায় নিঃশেষ করে দিয়েছে।
বাংলাদেশের ছোট নদীগুলো যে বিশেষ দু’টি কারণে মরে যাচ্ছে তা হলো ‘অতি উত্তোলন’ ও ‘অতি নিষ্কাশন’। সত্তরের দশকে খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে সেচ সুবিধা বৃদ্ধির জোয়ার বয়ে যায়। সারা দেশের রাস্তার ধারের ‘বরোপিট’গুলো গমের বিনিময়ে কেটে ফেলার মহোৎসব হয়। এই সময় নদীর পানি ‘লো লিফট’ পাম্পের সাহায্যে উত্তোলন করে সেচ দেওয়া হয় এবং ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। এর ফলে অচিরেই ছোট ছোট নদীগুলোর পানি অতি উত্তোলিত হয়ে শুকিয়ে যেতে থাকে। আশির দশকে নতুন নতুন খাল খনন কর্মসূচিতে ভাটা পড়লেও পুরাতন খালগুলোর সংস্কারের নামে জলাভূমিগুলো নিঃশেষ করে ফেলা হয়। এভাবে জলাভূমির ভেতরে মাছের আশ্রয়স্থলগুলো শুকিয়ে ধানক্ষেতে পরিণত হয়।
বাংলাদেশে নদী ব্যবস্থাপনা বা সংরক্ষণ বিষয়ে কারোর কোনো মাথাব্যাথা আছে বলে প্রতীয়মান হয় না। ভূমি মন্ত্রণালয় যেহেতু জমিজমার রেকর্ড রাখে ও খাসজমি বিলিবণ্টনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সেহেতু এই মন্ত্রণালয়ের প্রতিভূ হিসেবে ডেপুটি কমিশনাররা বিনা দ্বিধায় খোলা নদীনালা ও জলাভূমি লিজ দিয়ে যাচ্ছেন। অথচ আইন অনুযায়ী তারা কেবল বদ্ধ জলমহালগুলোকেই লিজ দিতে পারেন। অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষও তাদের জাহাজ চলাচলের জন্য নদীর ওপর দাবিদার। অথচ বাংলাদেশ সরকারের রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী নদী ব্যবস্থাপনার জন্য দায়ী পানি উন্নয়ন বোর্ড, যা ‘পানি উন্নয়ন বোর্ড আইন-২০০০’ এর ৬ ধারায় বিবৃত করা হয়েছে। কিন্তু এই আইন অনুযায়ী কোনো বিধিমালা তৈরি না হওয়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ডকে ধরা যায় না, পানি উন্নয়ন বোর্ড কোনো দায়িত্বও গ্রহণ করে না। ফলে নদী ব্যবস্থাপনায় চরম বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। আইন অনুযায়ী দ্রুত বিধিমালা তৈরির মাধ্যমে আইনের প্রয়োগ, নদীকে অবৈধ দখলমুক্ত করা, নদী দখলকারীদের শাস্তি ও নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ঠিক রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা করা যেতে পারে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড নদীভাঙন প্রতিরোধ এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য কাজ করে। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে নদী দখল রোধ এবং বালু উত্তোলন নিয়ন্ত্রণের জন্যও দায়বদ্ধ হতে হবে। নদীতে অবাধে পয়ঃবর্জ্য ও শিল্পবর্জ্য ফেলা হচ্ছে। ফলে প্রতিটি শহর ও বন্দরের আশপাশের নদী চরমভাবে দূষিত হচ্ছে। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ অনুযায়ী ‘পরিবেশ অধিদপ্তর’ গঠন করা হয়েছে, কিন্তু পর্যাপ্ত লোকবল ও ক্ষমতা প্রয়োগের সীমাবদ্ধতার কারণে এই অধিদপ্তর কোনোই কাজ করতে পারছে না। তাছাড়া দূষণকারীর বিরুদ্ধে মামলা করতে মহাপরিচালকের অনুমতি লাগে বিধায় তিনি একা সারা দেশ সামলাতে পারেন না। তাই নদীর দূষণরোধে সংশ্লিষ্ট সকল স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে ক্ষমতাবান করা, নদী ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে শিক্ষাব্যবস্থার পাঠ্যসূচিতে নদীসংক্রান্ত বিষয়াবলি অন্তর্ভুক্ত করা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বিশেষ শিক্ষাক্রম চালু করা, নদীতে মাছধরার বিধিনিষেধগুলো প্রতিপালন করা, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের পরিবেশ সচেতনতা সৃষ্টি ও তাদের স্থাপনাসমূহের বর্র্জ্য দূষণমুক্ত করতে বাধ্য করা ইত্যাদি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত ‘রামসার কনভেনশন ১৯৭১’ এবং ‘রিও কনভেনশন ১৯৯২’ স্বাক্ষর করায় ভূমি ও জলজ পরিবেশ রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই কনভেনশন দু’টির প্রথমটি জলজ পাখির আবাস সংরক্ষণ সংক্রান্ত, যা নদী ও জলাভূমির প্রাকৃতিক পরিবেশকে রক্ষার লক্ষ্যে অতি প্রয়োজনীয়। দ্বিতীয়টি ভূমি ও জলের সকল প্রজাতির উদ্ভিদ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ সংক্রান্ত, যা একই লক্ষ্যে অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের টাঙ্গুয়ার হাওর ও সুন্দরবন এলাকা ‘রামসার সাইট’ হিসেবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। হাকালুকি হাওর এবং সুন্দরবনকে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ‘পরিবেশগত স্পর্শকাতর এলাকা’ ঘোষণা করায় ঐ দুই এলাকার নদী ও জলাভূমিসমূহ সংরক্ষণের বেলায় সরকারি দায়বদ্ধতা রয়েছে। কিন্তু এখনই আমাদের দেশের আরও অনেক জলাভূমি ‘রামসার সাইট’ হিসেবে এবং ‘পরিবেশগত স্পর্শকাতর এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করা উচিত।
বাংলাদেশের নদীগুলোর রক্ষায় পাহাড়, সমতল, মোহনা ও আন্তর্দেশীয় নদীগুলোকে পৃথকভাবে বিবেচনায় এনে ব্যবস্থা নিতে হবে। আমরা লক্ষ্য করি সাগরের মাছ মোহনায় এসে, মোহনার মাছ উজানে গিয়ে, নদীর মাছ বিলে উঠে, সমতলের মাছ পাহাড়ের পাদদেশে এবং পাহাড়ের মাছ ঝরনার কাছাকাছি ডিম ছাড়ে। অতএব কোনো একটি এলাকার নদী মরে গেলে বা দূষিত হয়ে গেলে ডাঙ্গায় বসবাসকারী মানুষ ও পশুসহ জলজ জীবের বহুমাত্রিক ক্ষতির কারণ হয়। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের কর্মসূচিতে এমনকি নির্বাচনী ইশতেহারেও নদীরক্ষা বিষয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ হতে দেখা যায় না। বাংলাদেশের নদী ও জলাভূমি বাঁচানোর জন্য এখনই জাতীয় সংসদে ‘নদী জলাভূমি দখল ও দূষণ প্রতিরোধ আইন জারি’ করে তার যথাযথ প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি।