পাঁচ বছর আগেও যাত্রীর অভাবে উড়োজাহাজের অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট বাতিলের ঘটনা ঘটত অহরহ। যাত্রী ও উড়োজাহাজের অভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল অনেক বিমানবন্দরও। তবে পাঁচ বছরে লাফিয়ে বেড়েছে উড়োজাহাজের অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের যাত্রী। আকাশপথে পরিবহন সুবিধা দেওয়া এয়ারলাইনসগুলোর হিসাবে এ সময়ে যাত্রী বেড়েছে শতভাগ। সড়ক, নৌ ও রেলপথে ভোগান্তি বাড়ায় আসন্ন ঈদে আকাশপথে যাত্রীর চাপ মাত্রা ছাড়িয়েছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উড়োজাহাজের ভাড়াও বেড়েছে প্রায় ১৫০ গুণ। রুটভেদে কোনো কোনো জায়গায় বেড়েছে তারও বেশি। বিভিন্ন এয়ারলাইনসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এরই মধ্যে উড়োজাহাজের ৭৫ শতাংশ টিকিট শেষ। কিছু টিকিট অবশিষ্ট থাকলেও নিয়মিত ভাড়ার চেয়ে সেগুলো তিনগুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
এয়ারলাইনস সংশ্লিষ্টরা জানান, ঈদযাত্রায় ঢাকা-সৈয়দপুর রুটে যাত্রীদের ভাড়া (ওয়ানওয়ে) গুনতে হচ্ছে ৭ হাজার ৫০০ থেকে ৮ হাজার ৫০০ টাকা। অন্য সময়ে এই টিকিট বিক্রি হতো ২ হাজার ৭০০ থেকে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ২০০ টাকায়। একইভাবে ঢাকা-যশোর রুটের ২ হাজার ৫০০ টাকার টিকিট বিক্রি হচ্ছে ৭ হাজার ৫০০ এবং ঢাকা-বরিশাল ৩ হাজার টাকার ওয়ানওয়ে টিকিটের দাম রাখা হচ্ছে ৬ হাজার ৫০০ থেকে ৭ হাজার ৫০০ টাকা। এছাড়া ঢাকা-রাজশাহী রুটের টিকিট বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ৮ হাজার থেকে ৯ হাজার টাকা পর্যন্ত। একই টিকিটের দাম স্বাভাবিক সময়ে ৩ হাজার টাকা। চট্টগ্রামে ফ্লাইট বেশি থাকায় কিছুটা কমে বিক্রি হচ্ছে এ রুটের টিকিট। তারপরও ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার টাকা রাখা হচ্ছে টিকিটপ্রতি। কক্সবাজার রুটে এয়ারলাইনসগুলো টিকিট বিক্রি করছে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৭ হাজার টাকায়। সিলেট রুটে ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকায় টিকিট কিনতে হচ্ছে আকাশপথের যাত্রীদের।
ঢাকা থেকে অভ্যন্তরীণ সাতটি রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, ইউএস বাংলা, নভোএয়ার ও রিজেন্ট এয়ারওয়েজ। এর মধ্যে রিজেন্টের উড়োজাহাজ শুধু চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে চলাচল করে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস বর্তমানে ঢাকা-সৈয়দপুর ও ঢাকা-যশোর রুটে দৈনিক দুটি করে, ঢাকা-রাজশাহীতে একটি এবং বরিশালে সপ্তাহে চারটি ফ্লাইট পরিচালনা করছে। এছাড়া প্রতিদিন ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে পাঁচটি, ঢাকা-কক্সবাজার দুটি ও ঢাকা-সিলেটে একটি ফ্লাইট চলছে এয়ারলাইনসটির। নভোএয়ার দৈনিক ঢাকা-সৈয়দপুর রুটে চারটি, ঢাকা-যশোর তিনটি ও ঢাকা-রাজশাহী রুটে একটি ফ্লাইট চালাচ্ছে। আর ঢাকা থেকে দৈনিক চট্টগ্রামে ছয়টি ও কক্সবাজারে চারটি ফ্লাইট পরিচালনা করছে এয়ারলাইনসটি।
এয়ারলাইনস কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, স্বাভাবিক সময়ে অভ্যন্তরীণ ১০০টি ফ্লাইটে দিনে ছয় হাজার যাত্রী যাওয়া-আসা করেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। তবে ঈদে স্পেশাল ফ্লাইট বেড়ে যাওয়ায় এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ৪০ হাজারের কাছাকাছি। যাত্রী চাহিদা অনুযায়ী ফ্লাইট বাড়ানো হলেও ভাড়া বাড়ার কারণ হিসেবে তারা বলছে, ঈদের সময় শুধু ওয়ানওয়ে ফ্লাইটের যাত্রী পাওয়া যায়। ঈদের আগে যাওয়ার সময় থাকলেও ফিরতিপথে যাত্রী পাওয়াই যায় না। একইভাবে ঈদের পরে শুধু ঢাকামুখী যাত্রী পাওয়া যায়, কিন্তু যাওয়ার যাত্রী থাকে না।
ঈদ উপলক্ষে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস লিমিটেড ৩০ মে-৪ জুন পর্যন্ত ছয় দিনে নিয়মিত ফ্লাইটের পাশাপাশি অতিরিক্ত অর্ধশত ফ্লাইটের ব্যবস্থা করেছে। প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক কামরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভোগান্তি এড়াতে এখন মানুষের প্রথম পছন্দ আকাশপথ। চাহিদা বেশি থাকায় কম দামে কখনই টিকিট মিলছে না। আসলে ঈদের সময় ঢাকা থেকে যাত্রী পূর্ণ করে ছাড়ছে। কিন্তু ফ্লাইটগুলো ফিরবে একেবারে ফাঁকা। হিসাবের সময় তাই ফিরতি ফ্লাইটের হিসাবটাও থাকে।’
নভোএয়ার ঈদের আগে ছয় দিনে অতিরিক্ত ৩০টি ফ্লাইট পরিচালনা করবে। সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক এ কে এম মাহফুজুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের সক্ষমতা অনুযায়ী দিনে গড়ে দুই হাজার যাত্রী পরিবহন করতে পারি। তবে ঈদে এ সংখ্যা আরও বাড়বে। এবারের ঈদের ছুটি লম্বা হওয়ায় যাত্রীরা ডিস্ট্রিবিউট হয়ে গেছে। এজন্য ভাড়াও কিছুটা চড়া। তবে আগে এলে কম হতো।’
এয়ারলাইনস কর্র্তৃপক্ষ বলছে, ঈদের টিকিট বিক্রির নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। যেকোনো সময় যে কেউ টিকিট কাটতে পারেন। এক বছর আগেও এ সুযোগ থাকে। যাত্রীরা সুবিধাজনক সময়ে বিমান সংস্থাগুলোর বিক্রয়কেন্দ্র ও বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সি থেকে টিকিট কিনে থাকেন। অনলাইনে ক্রেডিট কার্ড ছাড়াও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেও টিকিট কিনে থাকেন অনেক যাত্রী। তাই এবারের ঈদের আগে ৩০ মে-৪ জুনের নিয়মিত ফ্লাইটগুলোর বেশিরভাগ টিকিট কয়েক মাস আগেই বিক্রি হয়ে গেছে। ফলে ভাড়ার বিষয়টি লাগামের বাইরে চলে গেছে।
তারা আরও জানিয়েছে, ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস প্রবাসীদের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনা করছে। এছাড়া ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর, কলকাতা, কুয়ালালামপুর রুটে বিশেষ উড়োজাহাজ নামিয়েছে সংস্থাগুলো। এতে প্রবাসীদের ভ্রমণ সহজসাধ্য হবে।