এমনিতে বাংলাদেশের জন্য কার্ডিফ পয়া মাঠ। শুরুতে সৌভাগ্যের আভাসও পাওয়া যচ্ছিল। টস জিতলেন মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা। হালকা ঘাসে ঢাকা উইকেটে ফিল্ডিং নিলেন। ব্যাটিং করতে নামলেন শিখর ধাওয়ান আর রোহিত শর্মা। দুই বল খেলার পরই বৃষ্টি। ২০ মিনিট খেলা বন্ধ থাকার পর আবার মাঠে ফিরল ক্রিকেট। আর ফেরার পরেই বোঝা গেল টিপিক্যাল ইংলিশ সামারেই হচ্ছে বিশ্বকাপ। মোস্তাফিজুর রহমান সুইং পাচ্ছিলেন। সঙ্গে বাউন্স আর গতিও ছিল। অন্যপ্রান্ত থেকে মাশরাফীও ছন্দে ছিলেন। তাই প্রথম দশ ওভারে বিশ্বসেরা ব্যাটিং লাইনও কাঁপছিল। মুস্তাফিজের বলে লাইন মিস করে আউট হলেন ধাওয়ান। আর রুবেলের শর্ট বলে অলস ভঙ্গিতে ব্যাট চালিয়ে স্টাম্পে পা লাগালেন রোহিত শর্মা। মাত্র ১৩.৩ ওভারের মধ্যে ৫০ রানে ভারতের দুই উইকেট নেই তখন।
১৩ ওভারে মাত্র ৫০। ভারতের ব্যাটিং লাইনকে এভাবে আটকে রাখা বাংলাদেশের জন্য অনেক সাফল্যের। তা হলে কি বিশ্বকাপ প্রস্তুতিটা দারুণ হচ্ছে মাশরাফীদের! কিন্তু সেখান থেকেই মোড় বদল। প্রথম ঘণ্টা পার হওয়ার পর রূপ দেখাতে শুরু করল আসল ভারত। ব্যাটিং শক্তি দেখিয়ে সেই বিশাল স্কোর করেই থামল তারা। দিন শেষে ৫০ ওভারে ৭ উইকেটে ভারতের সংগ্রহ ৩৫৯। শুরুর বোলিংটা আর ধরে রাখতে পারেনি বাংলাদেশ। তাই বোলিং নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকল। পরে চিন্তা বাড়ল ব্যাটিং নিয়েও। ৩৬০ রানের লক্ষ্যে ছুটে বাংলাদেশ ২৬৪ রান করে অলআউট। ৯৫ রানে ম্যাচ জিতে নেয় ভারত। বিশাল স্কোর তাড়ার প্রস্তুতিটা হলো তেমন। মুশফিকুর রহিম ও লিটন দাশই যা একটু লড়াই করলেন। বাকিরা একদম হতাশার খাতাতেই।
মূল টুর্নামেন্ট শুরুর আগে মাত্র একটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলতে পারল বাংলাদেশ। কার্ডিফেই পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম প্রস্তুতি ম্যাচটি মাঠেই গড়ায়নি। ইংল্যান্ডের মাটিতে নিজেদের দেখে নেওয়ার সুযোগ পায়নি মাশরাফীরা। দ্বিতীয় প্রস্তুতিতে বৃষ্টির ভয় থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা কেটে যায়। এর ফলে পুরো ম্যাচ খেলার সুযোগ পায় বাংলাদেশ। এতে নিজেদের নিয়ে ভাবার অনেক দিকই খুলে গেল। সবচেয়ে বড় বিষয় ব্যাটিং। আয়ারল্যান্ডের মাটিতে যে ব্যাটিং পারফরম দেখিয়েছিল বাংলাদেশ, ভারতের সঙ্গে সে রকম কিছু করতে পারেনি। এ আসরে শক্তিশালী বোলিং অ্যাটাকগুলোর মধ্যে ভারত শীর্ষে। তাদের বিপক্ষে লড়াই করতে হলো বাংলাদেশকে। প্রায় ৫০ (৪৯) রানের উদ্বোধনী জুটি নিয়ে ভালো শুরুর ইঙ্গিত দিয়েছিল টাইগাররা। কিন্তু ওয়ানে নামা সাকিব আল হাসান প্রথম বলেই ফিরে যাওয়ার জোড়া ধাক্কা খেতে হয়। ওই অবস্থান থেকে দলকে টেনে নেন লিটন ও মুশফিক। দুজনে মিলে ১২০ রানের জুটি গড়ে জয়ের ক্ষীণ আশা জাগিয়ে তোলেন। ৯০ বলে অসাধারণ ৭৩ রানের ইনিংস খেলে আউট হন লিটন। তার চেয়েও দারুণ খেলেছেন মুশফিক। তবে দুর্ভাগ্য ১০ রানের জন্য সেঞ্চুরি পাননি। ৯৪ বলে ৯০ করে ফিরে যান। ইনিংসে ছিল ২টি ছয় ও ৮টি চার। এ দুই ব্যাটসম্যান ফেরার পর আর কোনো ব্যাটসম্যানই দাঁড়াতে পারেননি। নিচের দিকে মেহেদী হাসান মিরাজ ২৭ করেন শুধু।
তবে এমন ব্যাটিং সত্ত্বেও পারফরম্যান্স নিয়ে অসন্তুষ্টি ছিল না মাশরাফীর কণ্ঠে, ‘যতটুকু করেছি এটা প্রস্তুতি ম্যাচের জন্য যথেষ্ট। এখানে নিজেদের বিষয়গুলো ঝালিয়ে নেওয়াই মুখ্য। সেদিক থেকে আমরা ভালোই করেছি। টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচে বেশি দূরে নেই। এখন আমাদের ওই ম্যাচ নিয়ে ভাবতে হবে।’ এ ছাড়া ব্যাটিং নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল না মাশরাফীর। মূল ম্যাচে টপঅর্ডাররা জ্বলে উঠবে বলেই আশা রাখছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক, ‘আমাদের টপঅর্ডাররা রান করছে। সৌম্য টানা তিনটি হাফসেঞ্চুরি করেছে। লিটন আয়ারল্যান্ডে রান করেছে আজও করল। মুশফিক রান করেছে। সব মিলিয়ে আশা করি মূল ম্যাচে দ্রুত তারা নিজেদের দায়িত্ব বুঝে নেবে। আর আমাদের বেশ কিছু ইনজুরি সমস্যা আছে। যে কারণে আজ বোলাররা শতভাগ দিতে পারেনি। এটাও ম্যাচে কাটিয়ে উঠব আমরা।’
এর আগে শুরুর ধাক্কা সামলে বিরাট কোহলি চেষ্টা করছিলেন ইনিংস গোছাতে। ছন্দে থাকা ভারত অধিনায়ককে অসাধারণ এক ইয়র্কারে বোল্ড করেন মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন। চার নম্বরে ব্যাট করতে নেমে টিকতে পারেননি বিজয় শঙ্করও। ১০২ রানে ভারতের ৪ ব্যাটসম্যানকে ফিরিয়ে দিয়ে তখন কার্ডিফে ভালো কিছুর প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। সেই সময় উইকেটে এলেন মাহেন্দ্র সিং ধোনি। আগেই উইকেটে ছিলেন লোকেশ রাহুল। আস্তে আস্তে তারা দুজন ম্যাচের রাশ নিয়ে নিলেন নিজেদের হাতে। পঞ্চম উইকেটে তুললেন ১৬৪ রান। মাশরাফীদের মুঠোয় থাকা ম্যাচটা তখনই বেরিয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত রাহুল আর ধোনি দ্জুনই সেঞ্চুরি করেছেন। মাত্র ৭৮ বলে ১১৩ রান করে তিনি সাকিবের বলে আউট হন। ৭টি ছক্কা মেরেছেন। সঙ্গে ৮টি বাউন্ডারি। অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা রাহুল ৯৯ বলে ১০৮ রান করে আউট হন। বাংলাদেশের হয়ে দুটি করে উইকেট নেন সাকিব ও রুবেল। একজন ৯ এর ওপর রান দিয়েছেন। অন্যজন ওভারপিছু রান দিয়েছেন সাতের ওপর।
সংক্ষিপ্ত স্কোর :
ভারত : ৩৫৯/৭ (৫০ ওভার) (ধোনি ১১৩, রাহুল ১০৮; সাকিব ২/৫৮, রুবেল ২/৬২)
বাংলাদেশ : ২৬৪ (৪৯.৩ ওভার) (মুশফিক ৯০, লিটন ৭৩, সৌম্য ২৫, মিরাজ ২৭; কুলদীপ ৩/৪৭, চাহাল ৩/৫৫)
ফল : ভারত ৯৫ রানে জয়ী।