শতভাগ প্রাপ্তবয়স্ককে মানসম্পন্ন ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির কৌশলপত্র তৈরি করছে সরকার। ন্যাশনাল ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন স্ট্র্যাটেজি-বাংলাদেশ (এনএফআইএস-বি) নামে ইতিমধ্যে কৌশলপত্রের খসড়া তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানের ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে ২০৩০ সালে টেকসই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা, ২০৪১ সালে উন্নত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা ছাড়াও স্বাধীনতার বর্ষপূর্তিতে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা ও ২১০০ সালে নিরাপদ ব-দ্বীপ হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে এতে। ৫টি ‘সি’ বা কমিটমেন্ট, কো-অপারেশন, কো-অর্ডিনেশন, কো-এক্সিসট্যান্স ও কম্প্রেহেনসিভ (প্রতিশ্রুতি, সহযোগিতা, সমন্বয়, সহ-অস্তিত্ব ও ব্যাপকতা) নিশ্চিত করে লক্ষ্য অর্জনের কথা বলা হয়েছে খসড়া কৌশলপত্রে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ গতকাল ৫৯ পৃষ্ঠার খসড়া কৌশলপত্র ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে। ১৯৭৩ সালে দেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে কৌশলপত্রের শুরুতেই বলা হয়েছে, এই কৌশলপত্র প্রণয়নে বঙ্গবন্ধুর ওই দর্শন মূলনীতি হিসেবে কাজ করেছে। ৬৫টি লক্ষ্য সামনে রেখে ১২টি কৌশলের মাধ্যমে তা অর্জন করার কথা বলা হয়েছে এতে।
কৌশলপত্রের খসড়ায় বলা হয়েছে, গত প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশ ৬ শতাংশের বেশি হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে, এখন যা ৮ শতাংশে পৌঁছেছে। আগামী বছরগুলোতে প্রবৃদ্ধি আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো আর্থিক অন্তর্ভুক্তি। মানসম্পন্ন ও সহনীয় আর্থিক সেবা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে দরিদ্র ও হতদরিদ্রদের আয়ের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে তাদের জীবনমানের উন্নয়ন করা সম্ভব হবে। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের অন্যতম শর্ত হলো অ্যাক্সেস টু ফাইন্যান্স বা আর্থিক খাতে সহজে প্রবেশাধিকার। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো বিভিন্ন নতুন নতুন পণ্য ও সেবা সৃষ্টি করছে আর্থিক খাতে। তরুণ ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে ভিত্তি করে নতুন এসব সেবা সরবরাহ হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির প্রসারের কারণে আর্থিক সেবার ধরন পাল্টাচ্ছে, ই-কমার্স সম্প্রসারিত হচ্ছে।
বাংলাদেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে তিনটি সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে উল্লেখ করে খসড়া কৌশলপত্রে বলা হয়েছে, প্রত্যন্ত এলাকার জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সেবায় অন্তর্ভুক্ত করতে না পারা; কম আয়, শিক্ষা ও আর্থিক খাত সম্পর্কে সচেতনতার অভাব; ব্যাংকের শাখাগুলোর অনেক দূরত্বে অবস্থান, অপ্রয়োজনীয় তথ্য চাওয়া ও জটিল প্রক্রিয়া, ব্যাংক কর্মকর্তাদের অসৌজন্য আচরণ। কৌশলপত্র প্রণয়নের মাধ্যমে অন্তত পাঁচটি ক্ষেত্রে ব্যাপকভিত্তিক সেবা নিশ্চিত করার কথা উল্লেখ করে এতে বলা হয়েছেÑ ঋণদান, আমানত গ্রহণ, বীমায় মানসম্পন্ন সেবা নিশ্চিত করা হবে। গ্রাহকের স্বার্থ সুরক্ষা করে ভোক্তাদের জন্য সহনীয় ও উপযুক্ত সেবা নিশ্চিত করা হবে। আর্থিক সেবা দেশের সব নাগরিকের জন্য সহজলভ্য করা ও আর্থিক অবকাঠামো, নিয়ন্ত্রণ কাঠামো এমনভাবে করা যাতে প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকের পছন্দকে প্রাধান্য দিয়ে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করে মানসম্পন্ন সেবা নিশ্চিত করে।
খসড়া কৌশলপত্রে ২০২০-২৪ সময়কে প্রথম ভার্সন হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, দেশকে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিতেই এই কৌশলপত্র প্রণয়ন করা হচ্ছে। এই সময়ে প্রযুক্তির মাধ্যমে দেশের সব প্রাপ্তবয়স্ককে নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত আর্থিক সেবায় হিসাব খোলার আওতায় আনা হবে। যৌক্তিক ফির বিনিময়ে প্রত্যেক হিসাবধারী যাতে নির্ধারিত দূরত্বের মধ্যেই ইলেকট্রনিক ফাইন্যান্সিয়াল সেবা পান, তা নিশ্চিত করা হবে। সব ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানকেও যৌক্তিক ফি ও চার্জের বিনিময়ে মানসম্পন্ন ঋণ ও আর্থিক সেবার আওতায় আনা হবে।
২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে বা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকীতে এই কৌশলপত্র চূড়ান্ত করে বাস্তবায়ন কাজ শুরু করা হবে। ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সময়কালে বাস্তবায়ন কাজ শেষ হবে।
খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য হ্রাসে কৌশলপত্রে কৃষিসহ সবুজ অর্থায়নে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কৌশলপত্র বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংক যেসব উদ্যোগ নেবে, তা তুলে ধরে বলা হয়েছেÑ ১১০টিরও বেশি ফসলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ দেবে। বর্গাচাষি, দুধ উৎপাদন ও পাটপণ্যসহ বিভিন্ন খাতে পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের আকার ১ হাজার কোটি টাকারও বেশি উন্নীত করা, নারী কৃষক ও উপজাতীয় কৃষকদের ভর্তুকি সুদে ঋণ দেওয়া, কনট্রাক্ট ফার্মিং ও ঘূর্ণায়মান শস্যঋণ সিস্টেম চালু করা হবে। ২০২১ সালের মধ্যে নারী উদ্যোক্তাদের মোট বিতরণ করা ঋণের অন্তত ২৫ শতাংশ দেওয়া, আটটি ক্যাটাগরিতে ৫২ সবুজ পণ্যে অর্থায়ন করা, গ্রিন ফাইন্যান্সিংয়ের ক্ষেত্রে স্থানীয় ও বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ নেওয়া হবে।
ব্যাংকগুলোকে কৃষকের ১০ টাকার হিসাব খোলার মতো আরও ১২টি ক্ষেত্রে ফিমুক্ত ব্যাংক হিসাব খুলতে উদ্বুদ্ধ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে শারীরিক প্রতিবন্ধী, স্কুল ব্যাংকিং, পথশিশু, সাবেক ছিটমহলের বাসিন্দা ও হিজড়া।