রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ বাসভূমিতে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের অবস্থানের প্রতি জাপান পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে। গতকাল বুধবার জাপানের প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের মধ্যে বৈঠকের পর এক যৌথ বিবৃতিতে এ সমর্থনের কথা জানানো হয়। বাংলাদেশের উন্নত দেশ হওয়ার স্বপ্নপূরণে জাপানের সহায়তা অব্যাহত রাখার আশ্বাসও দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। এ ছাড়া গতকাল বৈদেশিক উন্নয়ন সহায়তার (ওডিএ) আওতায় বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের ২৫০ কোটি ডলারের চুক্তি সই হয়েছে। এ চুক্তির আওতায় পাঁচটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের কার্যালয়ে তার ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে এ চুক্তি সই হয়। চুক্তির আওতায় যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে, সেগুলো হলো : মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প-১, ঢাকা মাস র্যাপিড ট্রানজিট উন্নয়ন প্রকল্প (লাইন-১), সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ উৎসাহিতকরণ প্রকল্প-২, জ্বালানি সক্ষমতা ও সংরক্ষণ উৎসাহিতকরণ অর্থায়ন প্রকল্প (ফেজ-২) ও মাতারবাড়ী আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প-৫।
এর আগে দুই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের পক্ষে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, প্রধানমন্ত্রী বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী ইমরান আহমেদ, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব নজিবুর রহমান, এসডিজি-বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ, পররাষ্ট্রসচিব শহীদুল হক প্রমুখ। জাপানের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে ছাড়াও দেশটির নীতিনির্ধারক ও সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
তারও আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পৌঁছালে তাকে স্বাগত জানান শিনজো আবে। এ সময় শেখ হাসিনাকে লালগালিচা সংবর্ধনা ও গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।
জাপান এককভাবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী। ১৯৭২ সাল থেকে দেশটির কাছ থেকে বাংলাদেশ মোট ১ হাজার ১৩০ কোটি ডলারের সহায়তা পেয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় এই নতুন উন্নয়ন সহায়তা চুক্তি সই হলো। চুক্তির পর দুই নেতা যৌথ বিবৃতি দেন। চতুর্থ বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গত জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর শেখ হাসিনার এটাই প্রথম জাপান সফর।
দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর দেওয়া যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, দুই নেতা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী পালিয়ে আসার ফলে উদ্ভূত দীর্ঘস্থায়ী সংকটের ‘একটি টেকসই ও আশু সমাধান’ নিয়ে আলোচনা করেন। শেখ হাসিনা এ সংকটে গভীরতা উপলব্ধির জন্য জাপানের প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আবে ও আমি এই মানবিক ও রাজনৈতিক সংকটের একটি টেকসই ও আশু সমাধান নিয়ে আলোচনা করেছি।’
তিনি বলেন, ‘জাপান অনুধাবন করে যে, এ সংকটের সমাধান বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ ভূমি মিয়ানমারে দ্রুত, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে ফিরে যাওয়ার মধ্যেই নিহিত রয়েছে। আর এজন্য মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।’ শেখ হাসিনা এ সংকট মোকাবিলায় উদার সমর্থন এবং মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত লোকদের দ্রুত প্রত্যাবাসনে সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের প্রচেষ্টার জন্য জাপান সরকারকে ধন্যবাদ জানান। দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক সম্পর্কে পররাষ্ট্রসচিব শহীদুল হক সাংবাদিকদের বলেন, সমুদ্র থেকে গ্যাস তোলার বিষয়ে জাপানের সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশ থেকে দক্ষ মানবসম্পদ নিতে জাপানকে অনুরোধ করেছেন তিনি। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশে মানবসম্পদ উন্নয়ন একাডেমি করারও প্রস্তাব দিয়েছেন শেখ হাসিনা। এ বিষয়ে শিনজো আবে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন বলে জানান শহীদুল হক। তিনি বলেন, মুজিব বর্ষ পালনের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ২০২০ সালে বাংলাদেশ সফরের জন্য জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। আবে আমন্ত্রণ গ্রহণ করে এটাকে ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবেন বলে জানিয়েছেন।
২০২২ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের নির্বাচনে বাংলাদেশ জাপানকে সমর্থন দেবে বলে জানান শহীদুল হক। রাতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া নৈশভোজে অংশ নেন শেখ হাসিনা। পররাষ্ট্রসচিব সাংবাদিকদের বিফিংয়ের সময় প্রধানমন্ত্রীর স্পিচ রাইটার নজরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
আজ ‘দ্য ফিউচার অব এশিয়া’ সম্মেলনে যোগ দেবেন শেখ হাসিনা। এ সম্মেলনে তিনি এশিয়ার সম্ভাবনা ও উত্থান নিয়ে নিজের ভাবনার কথা তুলে ধরবেন এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের রাজনীতিক, অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও তাত্ত্বিকদের সামনে। তথ্যসূত্র : বাসস