ঈদ বা উৎসবে নাড়ির টানে বাড়ির পানে ছুটতে থাকে মানুষ। ধারণা করা হচ্ছে, ঢাকা থেকে প্রায় ৮০ লাখ, চট্টগ্রাম থেকে ৩০ লাখ, গাজীপুর থেকে ৩০ লাখ, নারায়ণগঞ্জ থেকে ২০ লাখসহ বিভিন্ন বড় শহর থেকে প্রায় দুই কোটি মানুষ ঈদে বাড়ি যাবে। অর্থাৎ প্রায় চার কোটি মানুষ ঈদে যাতায়াত করবে। গত বছর ঈদযাত্রায় সড়কপথে ২৭৭টি দুর্ঘটনায় ৩৩৯ জন নিহত এবং ১ হাজার ২৬৫ জন আহত হয়েছিলেন। এবারও তাই ঈদ আসছে বাড়ি যাওয়ার আনন্দ আর যাত্রাপথের উৎকণ্ঠা নিয়ে।
প্রতিদিন পত্রিকা বা টিভি খুললে যে খবর সবাইকে আতঙ্কগ্রস্ত ও ক্ষুব্ধ করে তোলে, তার মধ্যে অন্যতম হলো সড়ক দুর্ঘটনা আর দুর্ঘটনায় মৃত্যু। প্রতিদিন গড়ে ১২ জন মানুষের মৃত্যু আর তার চেয়েও বেশি মানুষের পঙ্গুত্বের কারণ এই সড়ক দুর্ঘটনা। কিন্তু এই দুর্ঘটনা ও মৃত্যু আমাদের যতটা ক্ষুব্ধ করে, ততটা সচেতন করে কি? যদি জিজ্ঞেস করা হয়, সড়ক দুর্ঘটনার কারণ কী? তাহলে একবাক্যে সবাই বলে ওঠে, এর একমাত্র কারণ বেপরোয়া গাড়ি চালনা এবং দায়ী হলো ঘাতক গাড়িচালক। যন্ত্রের শক্তি ব্যবহার করে সমাজ অগ্রসর হচ্ছে অথচ পণ্য পরিবহনের প্রধান বাহন ট্রাককে পত্রপত্রিকায় নিয়মিতভাবে উল্লেখ করা হয় যন্ত্রদানব বলে।
সড়ক দুর্ঘটনার মাত্রা যত বাড়ছে, গাড়িচালক ও পরিবহন শ্রমিকদের দায়ী করার প্রবণতাও তত বাড়ছে। নেতিবাচক প্রচারের জোয়ারে পরিবহন শ্রমিকদের শত্রু বা দানব ভাবার মন তৈরি হয়েছে সমাজে। এই ঘৃণার আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে যুক্তি, দুর্বল হচ্ছে কারণ অনুসন্ধানের মানসিকতা এবং দূরে সরে যাচ্ছে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ। সাধারণভাবে প্রতিদিন সারা দেশে কমপক্ষে ২০ লাখ মানুষ রাস্তায় কোনো না কোনো যানবাহন যেমন বাস, মিনিবাস, মাইক্রোবাস, কার, সিএনজিচালিত থ্রি-হুইলার ইত্যাদি ব্যবহার করে ভ্রমণ করছে। প্রতিদিন কমপক্ষে এক লাখ টন পণ্য ট্রাক দ্বারা পরিবহন হচ্ছে সারা দেশে। যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের জন্য প্রায় ৮০ হাজার বাস, ১ লাখ ৫০ হাজার ট্রাক, ১০ লাখ মাইক্রোবাস ও প্রাইভেট কার এবং ২৫ লাখ মোটরসাইকেল চলে। এর বাইরে অসংখ্য থ্রি-হুইলারসহ অনুমোদনবিহীন নসিমন, করিমন, ভটভটি, ইজিবাইক সড়ক-মহাসড়কে চলছে। দুর্ঘটনা নিয়ে আলোচনা করতে হলে এসব যানবাহনের কথা উপেক্ষা করা চলবে না।
কোনো দেশের অর্থনীতিতে কোন খাতের ভূমিকা প্রধান? এ প্রশ্নের উত্তরে অনেকে বলবেন কৃষি, কেউ বলবেন শিল্প আবার কেউ বলবেন সেবা খাত। কিন্তু এই তিন খাতকে এক সুতায় গাঁথে যে খাত তা হলো পরিবহন খাত। অনেকটা শরীরের রক্তপ্রবাহের মতো। পঞ্চেন্দ্রিয় আর অভ্যন্তরীণ সব অঙ্গ অচল হয়ে যায় রক্তপ্রবাহ বন্ধ হলে। তেমনি পরিবহন খাত ছাড়া অচল হয়ে যায় সারা দেশের অর্থনীতির চাকা। আবার যদি প্রশ্ন করা হয়, দেশের সবচেয়ে অবহেলিত, সবচেয়ে নিন্দিত খাতের শ্রমিক কারা। উত্তর দিতে দেরি হবে না। একবাক্যে উত্তর আসবে, কারা আবার, পরিবহন শ্রমিক। অবহেলিত, কারণ তাদের নিয়োগপত্র, পরিচয়পত্র, কর্মঘণ্টা, বিশ্রাম, মজুরি কাঠামো, অবসর, পেনশন কিছুই নেই। শ্রম আইনের কোনো কিছুই যেন পরিবহন শ্রমিকের জন্য প্রযোজ্য নয়। তবে অধিকার না থাকলেও অপবাদ কিন্তু কম নেই পরিবহন শ্রমিকদের। দুর্ঘটনাকে অপরাধ বলে বিবেচনা করা আর পরিবহন শ্রমিকদের খুনি হিসেবে চিহ্নিত করা দুটোই চলছে সমানতালে। তাদের জীবনের কষ্ট, কর্মক্ষেত্রের সমস্যার কথা আলোচনা না করলেও তাদের কীভাবে এবং কতভাবে শাস্তি দেওয়া যায়, সে ব্যাপারে উৎসাহের অভাব নেই। অথচ পরিবহন শ্রমিকরা জনগণ ও যাত্রীদের প্রতিপক্ষ নয়, বরং তাদের যাতায়াতের সহযোগিতাকারী। আমরা তাই মনে করি, কোনো দায়িত্বশীল মানুষ পরিবহন খাতের প্রয়োজন অস্বীকার করবে না। এই সেবামূলক খাত আর ৫০ লাখ শ্রমিককে গুরুত্ব না দিয়ে দেশের অর্থনীতির বিকাশ, সামাজিক যোগাযোগ আর পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা কোনোটাই সম্ভব নয়।
প্রতিটি দেশ তার নিজস্ব প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যকে বিবেচনায় রেখে পরিবহন নীতিমালা তৈরি করে থাকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪৮ বছর পার হয়ে যাচ্ছে কিন্তু এখনো কোনো ‘জাতীয় পরিবহন নীতিমালা’ প্রণীত হয়নি। যার ফলে সব সময়ই ক্ষমতাসীনরা জাতীয় স্বার্থের চেয়ে দলীয় ও ব্যক্তিস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে এই খাতকে পরিচালিত করেছে বলেই পরিবহন খাতের সমস্যা আজ প্রকট রূপ ধারণ করেছে। বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ, দেশটি উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে ঢালু, শত শত নদী পুরো দেশে জালের মতো ছড়িয়ে আছে। দেশের প্রবহমান নদীপথের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৪ হাজার কিলোমিটার। যদিও তার মধ্যে বর্তমানে নাব্য মাত্র ১০ হাজার কিলোমিটার। সে বিবেচনায় নদীপথ দেশের প্রধান পরিবহন খাত হওয়ার কথা ছিল। তারপরই গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তোলা যেত রেল পরিবহনকে। কিন্তু নদী ক্রমাগত ভরাট, দখল, সংকুচিত হয়ে যাওয়ার ফলে এবং রেলপথ প্রসারিত না হওয়ায় সড়ক পরিবহনই আজ যোগাযোগের প্রধান খাতে পরিণত হয়েছে। পরিবহন খাতের গুরুত্ব ও সক্ষমতা বাড়লেও পরিবহন শ্রমিকদের মর্যাদা, অধিকার ও স্বীকৃতি আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনার কারণসমূহ বিবেচনা না করে ঢালাওভাবে পরিবহন শ্রমিকদের দায়ী করার মানসিকতার কারণে সমস্যার কারণ দূর না করে বরং আড়াল করা হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনার কারণ খুঁজতে হলে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো এড়িয়ে গেলে চলবে না।
ক. সড়ক ও মহাসড়ক ব্যবস্থাপনা
দেশের ২২টি মহাসড়কে একই সঙ্গে ভারী, হালকা, দ্রুতগতি, ধীরগতির গাড়ি এবং নসিমন, করিমন, ভটভটি, সিএনজিচালিত ট্যাক্সি, ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক সবই একসঙ্গে চলে। গতির পার্থক্য ও চালকের দক্ষতার পার্থক্য দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। দুর্ঘটনা-সংক্রান্ত একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান দেখিয়েছে দেশের মহাসড়কে ২০৮টি ‘ব্ল্যাক স্পট’ আছে। ২৮ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে হাট-বাজারের কারণে, ১৮ শতাংশ ঘটে অবৈজ্ঞানিকভাবে নির্মিত বাঁকের কারণে।
খ. দ্রুত এবং সহজে মুনাফা অর্জনের তাগিদ
সড়ক পরিবহন সমাজের অন্যতম প্রধান সেবা খাত হওয়ার কথা থাকলেও একে মুনাফা অর্জনের প্রধান খাতে পরিণত করা হয়েছে। এই মানসিকতার কারণে পরিবহন খাতে কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী মুনাফা বাড়াতে পুঁজি বিনিয়োগ করায় অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয়। মালিকদের মুনাফা বাড়াতে চাকরি বাঁচানোর স্বার্থে শ্রমিকরাও প্রতিযোগিতায় নামতে বাধ্য হন। ফলে দুর্ঘটনার হারও বাড়ে।
গ. সড়ক পরিবহন শিল্প না বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান
শিল্পপ্রতিষ্ঠানের একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো থাকে। সড়ক পরিবহনকেও শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই শিল্পের অবস্থান কোথায়? ১৯৯৩ সালে আইন করে প্রতিটি জেলা ও মেট্রোপলিটন ‘আরটিসি’ (রোড ট্রান্সপোর্ট কমিটি) করা হয়েছে। আরটিসিতে রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্ত গাড়ির মালিকদের প্রতিষ্ঠানপুঞ্জ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। কিন্তু এই আইনে জাতীয়ভিত্তিক কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব না থাকার কারণে জাতীয়ভিত্তিক শ্রমিক সংগঠনের কাজ করা নিয়ে আইনি জটিলতা হয়। আবার পরিবহন শ্রমিকরা কোন প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছ থেকে নিয়োগপত্র পাবেন তাও সুনির্দিষ্ট নয়।
ঘ. পরিবহন শ্রমিকের শিক্ষা ও দক্ষতা এবং কর্মপরিবেশ
কৈশোরে গাড়ি ধোয়া-মোছার কাজ দিয়ে শিক্ষানবিশি পার করে ক্রমেই হেল্পার হয় একজন পরিবহন শ্রমিক। একটানা ১২-১৪ ঘণ্টা ডিউটি শেষে গাড়িতে বা টার্মিনালের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রাত কাটানো এমন তরুণ চার-পাঁচ বছর পরে গাড়ির চালকে পরিণত হয়। কেউ কেউ নেশাগ্রস্ত হয়ে যায়। শিক্ষা, স্নেহ, মর্যাদা কোনো কিছুই পায়নি যে তরুণ তার হাতে থাকে গাড়ির স্টিয়ারিং। তার যৌবনের উদ্যমতা ফুটে উঠে গাড়ির গতিতে। অভাবী পরিবারের প্রয়োজন, স্বীকৃতিহীন কাজ, মর্যাদাহীন পেশা, ভালোবাসাহীন যৌনতা, অনিশ্চয়তাময় জীবন তাকে বেপরোয়া করে তোলে। যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের চালক যদি ১০/১২/১৫ ঘণ্টা গাড়ি চালায়, তাহলে সে কতক্ষণ মনঃসংযোগ রক্ষা করতে পারবে? এসব না ভেবে শুধু চালকের ওপর দায় চাপিয়ে কি নিরাপদ সড়ক ও সড়কের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা যাবে?
ঙ. চালকের ওপর অর্থনৈতিক ও অন্যান্য চাপ
বাসের ভেতরের ৫০ জন বা বাইরের অসংখ্য মানুষের নিরাপত্তা, যার ঠাণ্ডা মাথায় গাড়ি চালানোর ওপর নির্ভর করে সেই চালকের যদি মানসিক চাপ থাকে, তাহলে সড়কের নিরাপত্তা বিঘিœত হবেই। চুক্তিভিত্তিক বাস চালানো, ভাড়া থেকে প্রাপ্ত আয়ের ৩৫ ভাগ কমিশনে ট্রাক চালানো, মালিক সংগঠনের বেঁধে দেওয়া সময়েই পৌঁছানোর তাড়া, যানজট, পথে চাঁদাবাজি, পুলিশি হয়রানি, অতিরিক্ত সময় কাজ করার ক্লান্তি, যাত্রীদের অশোভন আচরণ, পারিবারিক সংকট, সঠিক সময় ঘুম ও বিশ্রাম না নিতে পারা, চাকরির নিরাপত্তাহীনতা চালককে সব সময় উদ্বিগ্ন করে রাখে। ভালোভাবে গাড়ি চালানোর জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও চাপমুক্ত পরিবেশ। দু-এর কোনোটাই নেই পরিবহন শ্রমিকদের, অথচ দায় পুরোটাই বহন করতে হয়।
সড়ক পরিবহনকে বাদ দিয়ে বা পরিবহন শ্রমিকদের উপেক্ষা করে তো দেশ চলবে না। টাকা জোগাড় করে দ্রুত গাড়ি কেনা যত সহজ, একজন প্রশিক্ষিত চালক তৈরি করা তত সহজ নয়। একই সঙ্গে চালক ও হেলপারদের কর্মপরিবেশ উন্নত করা, তাদের চাকরি কাঠামো, বেতন ও মজুরি ব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়া পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা আসবে না। এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে ভেবে পরিবহন খাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত গাড়ি, সড়ক ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএ, চালক-শ্রমিক, মালিক, প্রশাসনকে বিবেচনায় না নিয়ে শুধু চালকদের জন্য কঠোর আইন ও শাস্তির ব্যবস্থা কোনোমতেই নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠা করবে না।