বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধি ৫৭ মাসে সর্বনিম্ন

ব্যাংক খাতে তারল্য সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিলে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ ছিল ১২ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ, যা গত ৫৭ মাসে সর্বনিম্ন। এর আগে

২০১৪ সালের আগস্টে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ ছিল ১১ দশমিক ৩৯ শতাংশ। মূলত পর্যাপ্ত আমানত সংগ্রহের ব্যর্থতার কারণে সৃষ্ট তারল্য সংকটই বেসরকারি খাতে ঋণ কমে যাওয়ার প্রধান কারণ বলে জানা গেছে।

চলতি বছরের মার্চে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ ছিল ১২ দশমিক ৪৫ শতাংশ। এর আগের মাস ফেব্রুয়ারিতে এ খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশ। যদিও চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধ্বের মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের লক্ষ্যমাত্রা ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ ধার্য করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।   

বেসরকারি খাত জিডিপি’র লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় ভূমিকা পালন করে থাকে। এ খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে গেলে জিজিপি’র লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার আশঙ্কা বাড়তে থাকে। ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ কমে যাওয়া ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিশ্চল অবস্থার ঈঙ্গিত দেয়। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করা উচিত কেন বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণ কমে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি উত্তরণে বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে বলে জানান তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, চলতি বছরের এপ্রিলে বেসরকারি খাতের ঋণ দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৮৭ হাজার ৯২৯ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৮ লাখ ৮১ হাজার ৫১০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, আমানত কমে যাওয়ার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশানুযায়ী, অগ্রিম আমানত অনুপাত (এডিআর) সমন্বয়ের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণ কমে যাওয়ার প্রধান কারণ।

আমানতের সুদহার ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার বাধ্যবাধকতা থাকলে তারল্য সংকটের কারণে অধিকাংশ ব্যাংক আকর্ষণীয় সুদের প্রস্তাব দিচ্ছে। তারপরও ব্যাংকগুলো পর্যাপ্ত আমানত সংগ্রহ

করতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে চলতি বছরের মার্চে এডিআর সমন্বয়ের সময়সীমা আরও ছয় মাস বাড়িয়ে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে অগ্রিম আমানত অনুপাত (এডিআর) ৮৫ থেকে ৮৩ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। আর ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর জন্য আয়-আমানত অনুপাত (আইডিআর) ৯০ থেকে ৮৯ শতাংশে নামিয়ে আনার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ২২টি ব্যাংকের এডিআর বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশিত সীমায় রয়েছে। এর বাইরে কিছু ব্যাংক ঋণ বিতরণ সক্ষমতা কমিয়ে দিয়ে নির্দেশিত সীমার কাছাকাছি এডিআর বজায় রাখার চেষ্টা করছে।     

জানা গেছে, ব্যাংকের তুলনায় বেশি সুদ থাকায় সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারীদের ঝোঁক বেশি রয়েছে। সঞ্চয়পত্রে প্রায় ১২ শতাংশ সুদ পাচ্ছেন আমানতকারীরা। এটি ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট বাড়িয়ে তুলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ঋণ বিতরণের তুলনায় আমানতের পরিমাণও কমছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ৮৬ শতাংশ। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ।

খেলাপি ঋণের বিপরীতে উচ্চ হারে সঞ্চিতি সংরক্ষণও দেশের ব্যাংক খাতের তারল্য সংকটের অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। আবার খেলাপিদের নানা ধরনের সুবিধা দেওয়ায় এখন ভালো গ্রহীতারাও ঋণ পরিশোধে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। ফলে ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট আরও বাড়ছে।

এদিকে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণের কারণেও বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণে ব্যাংকের সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। চলতি বছরের ১৫ মে পর্যন্ত সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৭ হাজার ৯৯৮ কোটি টাকা ধার করেছে।

তারল্য সংকট মেটাতে ২০১৮ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের ৫ মার্চ পর্যন্ত রেপোর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলো ১৩ হাজার ৪৭৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা ধার নিয়েছে। যেখনে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রেপোর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর ধারের পরিমাণ ছিল ৫৭২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। আর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রেপোর মাধমে ব্যাংকগুলো ১১৫ কোটি ৬৭ লাখ টাকা ধার করেছিল।