কিশোরগঞ্জে চলন্ত বাসে নার্স শাহীনুর আক্তার তানিয়াকে ধর্ষণ ও হত্যার পর ওই ঘটনাকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিতে কটিয়াদী থানার এসআই পার্থ শেখর ঘোষের চেষ্টা নিয়ে দৈনিক দেশ রূপান্তরে সংবাদ প্রকাশের পর তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে শুরু করেছে এলাকাবাসী। এলাকার বেশ কয়েকজন নিরীহ মানুষকে মাদক মামলার আসামি করার ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায়সহ নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে এই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এমনকি ‘ক্রসফায়ারে’ দেওয়ার ভয় দেখিয়েও তিনি মোটা অংকের টাকা আদায় করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এর আগে গতকাল শনিবার দৈনিক দেশ রূপান্তরে ‘তানিয়াকে ধর্ষণের পর হত্যা : ঘটনা ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টাকারী এসআই পার্থ বহাল’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ হয়। এ সংবাদ প্রকাশের পর ভুক্তভোগী অনেকেই হয়রানির শিকার হয়ে এসআই পার্থকে বড় অংকের অর্থ দেওয়ার কাহিনী এ প্রতিবেদকের কাছে তুলে ধরেছেন।
ভুক্তভোগীরা জানান, উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য জাহাঙ্গীর আলমকে মাদক মামলার আসামি করার ভয় দেখিয়ে ৩৫ হাজার টাকা আদায় করেন পার্থ। পরে ওই ইউপি সদস্য এ ঘটনার বিচার চেয়ে পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। অন্যদিকে কটিয়াদী পৌর এলাকার তরিয়াকোনা মহল্লার সংখ্যালঘু পরিবারের এক প্রবাসীকে মাদকসেবী সাজিয়ে এসআই পার্থ আশি হাজার টাকা আদায় করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে ওই প্রবাসীর এক আত্মীয় পুলিশ সুপারের শরণাপন্ন হলে অর্ধেক টাকা ফেরত দেন পার্থ। এছাড়া মানিকখালী এলাকার এক ব্যক্তিকে মাদকসেবী সাজিয়ে ১৫ হাজার টাকা আদায় করেন পার্থ। ওই ব্যক্তি পুলিশের সাবেক আইজি এবং বর্তমানে কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া আসনের সাংসদ নূর মোহাম্মদের দ্বারস্থ হলে টাকা ফেরত দেন পার্থ। এ ঘটনায় পরে পার্থ সাংসদ এবং ভুক্তভোগী ওই ব্যক্তির কাছে ক্ষমা চান।
এসব ঘটনার পর নতুন করে বিপদে পড়ার আশঙ্কায় অধিকাংশ ভুক্তভোগীই নাম প্রকাশ করে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি। তবে ভুক্তভোগীদের মধ্যে একজন বনগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য জাহাঙ্গীর আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি বেশ কয়েক মাস আগে এসআই পার্থের বিচার চেয়ে জেলার পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলাম। কিন্তু এখন পর্যন্ত তার কোনো প্রতিকার আমি পাইনি।’
কটিয়াদী পৌর জাতীয় পার্টির সভাপতি আদিলুজ্জামান ভূইয়া জানান, কয়েক মাস আগে তার ছেলে বাচ্চু মিয়াকে ইয়াবা ব্যবসায়ী সন্দেহে আটক করেন এসআই পার্থ। পরে ওইদিনই রাত তিনটার দিকে ৯৫ হাজার টাকা নিয়ে বাচ্চুকে ছেড়ে দেন পার্থ।
আদিলুজ্জামান ভুইয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘তার (এসআই পার্থ) বিরুদ্ধে এলাকায় অনেক অভিযোগ রয়েছে। অনেকেই বিচার চেয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগও দিয়েছে। কিন্তু প্রশাসনে পার্থ শেখরের হাত অনেক লম্বা, তাই এলাকাবাসী অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাচ্ছে না। সে আমার ছেলেকে সন্দেহমূলকভাবে ধরে থানায় নিয়ে যায়। পরে আমরা গভীর রাতে ৯৫ হাজার টাকা দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে আনি। কিন্তু এসব অভিযোগ আপনাদের কাছে দিয়ে কী লাভ হবে? সে তো অনেক সেয়ানা।’
সর্বশেষ গত সোমবার দুপুরে উপজেলার ফেকামারা গ্রামে একটি জুয়ার আসর থেকে এসআই পার্থসহ কটিয়াদী থানা পুলিশের ৮ সদস্যের একটি দল চারজনকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। এরা হলেন ফরিদ মিয়া (৪০), নান্টু মিয়া (৪২), আসাদ মিয়া (৪৫) ও কালাচান (৪০)।
আটকদের মধ্যে ফরিদ মিয়া অভিযোগ করেন, থানায় নিয়ে যাওয়ার পর স্থানীয় ইউপি সদস্য শাহজাহানসহ গ্রামের লোকজন তাদের ছাড়াতে থানায় গেলে এসআই পার্থ ৪ লাখ টাকা উৎকোচ দাবি করেন। আটকদের স্বজনরা এত টাকা জোগাড় করতে না পারায় বাড়ি চলে যাওয়ার পর গভীর রাতে তাদের চোখ বেঁধে মারধর করা হয়। এসময় তাদের ‘ক্রসফায়ারে’ দেওয়ার হুমকি দেয় পুলিশ। মারধর শেষে রাতেই তাদের কটিয়াদী হাসপাতালে নিয়ে যায় পুলিশ। সেখানে বলা হয়, আটক করার সময় উত্তেজিত জনতার পিটুনিতে আহত হয়েছেন তারা। পরে সকালে স্বজনরা এসে পুলিশকে ৬০ হাজার টাকা দেওয়ার পর তাদের জুয়া আইনের ৪ ধারায় আদালতে পাঠানো হয়।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এসআই পার্থ শেখর ঘোষ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে করা অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। সাংবাদিক ভাই, দেশ রূপান্তরের আপনি আর যুগান্তরের এই দুই রিপোর্টার ছাড়া তো আমার বিরুদ্ধে আর কেউ এমন ঘাঁটাঘাঁটি করে না। আমার পিছু লেগেছেন কেন ভাই? আমার মনে হয় আপনাকে আমার শত্রুরা হয়তো ব্যবহার করছে।’
এসআই পার্থের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মাশরুকুর রহমান খালেদ বলেন, ‘এসআই পার্থকে নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি আমার নজরে এসেছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখার সময় দেন। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হলে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’