নিরাপদ ঈদযাত্রা এবং দুর্ঘটনা মুক্তির প্রার্থনা

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পরিসংখ্যান বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে কী দাঁড়াবে আমার জানা নেই। সে তালিকায় বাংলাদেশের নাম শীর্ষে থাকুক বা তলানিতে তা নিয়ে আমার কৌতূহল নেই। দেশের অসংখ্য অসহায় মানুষের মতো আমি কেবল এদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল দেখে হৃদয়ের রক্তক্ষরণ অনুভব করি। ঈদ এলে পরিবহনের সংখ্যা বাড়ে। সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ে দুর্ঘটনা। মৃত্যুর মিছিল আরও বড় হয়। একই সঙ্গে ক্রমাগত বেড়ে চলছে খুনোখুনি, সন্ত্রাসী ঘটনা আর ধর্ষণ। একদিকে দেশে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটছে আবার অন্যদিকে সমাজ জীবনের এক বিপন্ন দশা দেখতে হচ্ছে। দুর্ঘটনায় নিহত আহতদের অসহায় পরিবারগুলো অন্ধকার ভবিষ্যতে সঁপে দিচ্ছে নিজেদের। দুর্ভাগাদের আহাজারিতে প্রকম্পিত হচ্ছে চারপাশ।

 

বেপরোয়া যানবাহনের মালিকপক্ষ এবং চালকরা যে দুর্ঘটনা কমাতে সতর্কতা অবলম্বন করছেন বা রাষ্ট্রীয় শাসনে সতর্ক হচ্ছেন তা বাস্তব ক্ষেত্রে মনে হচ্ছে না। সরকারি ক্ষমতাবানদের বলতে ইচ্ছে করে যে দেশোন্নয়ন, অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাফল্যগাথা শুনতে আমাদের ভালো লাগে। আশাবাদী মানুষ আমরা উজ্জীবিতও হই। কিন্তু সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করতে পারলে এসব সাফল্য কি অসার হয়ে যায় না? প্রাকৃতিক দুর্যোগ-দুর্বিপাকে মানুষের নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। কিন্তু যেসব দুর্ঘটনা এড়ানো যায়Ñ কমানো যায় তা দেখভালের দায়িত্ব আছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও সরকারের। সে দায়িত্ব কি সংশ্লিষ্টরা পালন করছি? না দুর্ঘটনা ঘটে গেলে আহত নিহতদের পরিবারকে কিছু টাকা অনুদান দিয়ে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ‘শক্ত ব্যবস্থা নেব’ ধরনের ভাঙা রেকর্ড বারবার বাজিয়ে আর আইওয়াশের তদন্ত কমিটি গঠন করে দায়িত্ব শেষ করব? রাজনৈতিক ক্ষমতা আর অর্থনৈতিক প্রভাব বলয়ের সামনে সকল উদ্যোগেই তো শেষে ভাটা পড়তে দেখি।

 

প্রতিবারই ঈদযাত্রার আনন্দের সঙ্গে বিষাদও থাকে। আশঙ্কা হয় নাড়ির টানে এই যে ছুটছে মানুষ, সকলে নিরাপদে যার যার গন্তব্যে পৌঁছতে পারবে তো? আমি জানি না পরিসংখ্যান কী বলবে। প্রতিবার ঈদ যাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত নিহতের সংখ্যা নিতান্ত কম থাকে না। বাস-ট্রাক সংঘর্ষ, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসের খাদে পড়ে যাওয়া, ট্রাক বা বাসে চাপা পড়ে টেম্পো-স্কুটার চুরমার হয়ে যাওয়া, ট্রেনের ছাদ থেকে পরে মৃত্যুর ঘটনা সামান্য বিরতিতে ঘটে যাওয়া এসব খবর সংবাদ মাধ্যমে শুনে আর দেখে এদেশের মানুষ অভ্যস্ত। প্রতিনিয়ত এসব দেখে ও শুনে এবং দায়িত্বশীলদের কথার ফুলঝুড়িতে কর্তব্য চাপা পড়ার বাস্তবতায় সামনের আলো দেখব তেমন ভরসাও পাচ্ছি না। এবার ঈদুল ফিতরে সড়কপথে তুলনামূলক শৃঙ্খলা আশাব্যঞ্জক। অধিকাংশ চার লেনের কাজ শেষ হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সেতু সংস্কারও হয়েছে। এবার যদি যানবাহনের চালকরা নিয়ম মেনে ধৈর্যের সঙ্গে গাড়ি চালান তবে আমাদের দুর্ভাবনা অনেকটা কমে। ভয় এখানেই যে, সড়কপথে প্রতিদিন আইন না মানার প্রতিযোগিতা চলছে। ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলছে, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেক করছে, অদক্ষ ড্রাইভার লাইসেন্স কিনে বা লাইসেন্স ছাড়াই গাড়ি চালাচ্ছে। ট্রাফিক আইন মানার বালাই নেই। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থাকলেও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কোনো উদ্যোগ নেই। এভাবে চরম স্বেচ্ছাচারিতার মধ্যদিয়ে সড়কপথে পরিবহন চলছে।

 

আমি মাঝে মধ্যেই ঢাকা থেকে আশুলিয়ার বিলের ওপরের রাস্তা দিয়ে সাভারের পথে যেতেই যানজটে স্থবির হয়ে পড়ি। হয়তো শেষ ব্রিজের মুখে একটু জ্যাম পড়েছে। ঢাকামুখী গাড়ি আটকে গেছে। দেখা যাবে সাভারমুখী গাড়ি মুহূর্তে চারটে লাইন করে ফেলল। আসলে আমাদের ড্রাইভাররা রাস্তা ফাঁকা থাকা দেখতে পছন্দ করেন না। উল্টো দিকের গাড়ি আসার পথ যে বন্ধ হয়ে গেল তা বিবেচনা করার অবকাশ নেই। সুতরাং এই হযবরল অবস্থায় অনেকক্ষণ চলাচল স্থবির হয়ে পড়াটাই স্বাভাবিক। এই যাতনা এদেশের মানুষ অহরহ দেখে অভ্যস্ত এখন। আর ভুক্তভোগী মানুষ মনস্তাপ করে, ভাবে ড্রাইভারদের না হয় বিবেচনা শক্তি লোপ পেয়েছে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্বশীলদের এমন অসহায় আত্মসমর্পণ কেন! আমরা বিশ্বাস করি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা অসম্ভব নয়। আমি ১৯৯০-৯৩ সালে গবেষণার কাজে কলকাতায় যেতাম। অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখতাম মানুষ লাইন ধরে বাস-মিনিবাসে চড়ে। তখনো আমাদের দেশে এই শৃঙ্খলা তৈরি হয়নি। একটি বাস ভিড়লে লাফিয়ে দাপিয়ে কার আগে কে উঠতে পারে তেমন বাস্তবতা ছিল। তখন অসহায় মনে ভাবতাম আমাদের দেশে বোধহয় লাইন ধরে এমন সুশৃঙ্খলভাবে বাসে ওঠার সংস্কৃতি সম্ভব নয়। কিন্তু তাও তো সম্ভব হলো। এখন এদেশের মানুষ টিকিট কেটে লাইনে দাঁড়িয়ে বাসে চড়ে। সুতরাং শক্ত নজরদারি করতে পারলে নিজ লেনের বাইরে গাড়ি ঢোকানোটা বন্ধ করা কঠিন কোনো কাজ নয়।

 

বিধি লঙ্ঘন করা স্পিড আর অবৈধ ওভারটেকিং অনেক দুর্ঘটনার কারণ। এগুলো বন্ধের জন্য শক্তভাবে আইন প্রয়োগ করার বিকল্প নেই। বাস, ট্রাক ড্রাইভার ও মালিক সমিতিরও কি কোনো দায়িত্ব নেই? তারা নিজ নিজ চালকদের যদি প্রশিক্ষিত করেন, আইন মানার ব্যাপারে উৎসাহ দেন তাহলে অনেকটাই মেঘ কাটতে পারে। এর বদলে কোনো চালক অন্যায় করায় তাকে সুনির্দিষ্ট কারণে গ্রেপ্তার করলে সড়কপথ অচল করার মতো গাড়ল কাজ করতে কুণ্ঠিত হন না সংশ্লিষ্টরা। উন্নত দেশের কথা বাদ দিলাম প্রতিবেশী দেশ ভারতেও ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনে কঠোর শাস্তির বিধান আছে। এসব বিধান শক্তভাবে আরোপও করা হয়। এজন্য রাস্তাঘাট বন্ধ করে দেওয়ার মতো বেআইনি আচরণ সাধারণত কেউ করেন না।

 

ইউরোপের অনেক শহরেই দেখেছি মাঝরাতে নীরব রাস্তায়ও ড্রাইভার নির্ধারিত স্পিডেই ট্যাক্সি চালাচ্ছেন। কোথাও কোনো গাড়ি বা মানুষের লেশমাত্র নেই। তবুও সিগন্যালে লালবাতি জ্বললে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকছে। উপায়ও নেই। সব জায়গায় ক্যামেরা আছে। আইন লঙ্ঘন হলে পরদিন স্বয়ংক্রিয়ভাবে জরিমানা কাটা হয়ে যাবে মালিকের অ্যাকাউন্ট থেকে। ইউরোপের রাস্তায় পুলিশ-ট্রাফিক পুলিশ চোখে পড়ে না বললেই চলে। তবুও নিয়মমাফিক যার যার লেনে গাড়ি চলছে। গাড়ির হর্ন প্রায় শোনাই যাবে না সেসব দেশে। আমাদের রাজধানী শহরেই রাস্তা পার হতে গিয়ে গাড়ির নিচে পিষ্ট হয়ে কতজন মারা যান। ক’ মাস আগে কুড়িলে পথ পার হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকে জেব্রাক্রসিংয়ে পিষে মারল বাস। অন্যদিকে ইউরোপে পথচারী পারাপার সবচেয়ে গুরুত্ব পায়। গাড়ির জন্য সবুজ সংকেত থাকলেও জেব্রাক্রসিংয়ে পথচারী থাকলে সকল গাড়িই নির্ধারিত দূরত্বে থেমে যাবে। হয়তো আর্থিক কারণে আমরা সবসময় ঝকঝকে তকতকে গাড়ি রাস্তায় নামাতে পারব না। কিন্তু ট্রাফিক আইন মানাতে বাধ্য করতে পারব না কেন!

 

আমাদের দেশে দুর্ঘটনায় মানুষ মৃত্যুর উপলক্ষের তো অভাব নেই। সম্ভবত বছর দুই আগে ঈদের ছুটির পূর্ব মহূর্তে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছিল টঙ্গীতে। অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল কারখানা বিস্ফোরণে হতভাগ্য ৩৫ শ্রমিক মারা যান, আহত হন অনেক। চকবাজার বা বনানীর টাওয়ার বিল্ডিংয়ের অগ্নিকা-ে মৃত্যুর মিছিলÑ এসবকে নিছক দুর্ঘটনা বলে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। রানা প্লাজাসহ আরও কয়েকটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পরও শিক্ষা নিল না কোনো পক্ষ। বয়লার বিস্ফোরণ হোক বা গ্যাস লিকেজ সংকট, এসব তো অভিন্নই। দুর্ঘটনার পর দেখা যায় শ্রমিকদের বেরুনোর একাধিক পথ নেই। দুর্বল নড়বড়ে ইমারত স্থাপনা। পুরনো ফ্যাক্টরির যন্ত্রপাতির সঠিক সংস্কার নেই। মালিক পক্ষ কেবল লভ্যাংশ গুনছে আর যেসব প্রতিষ্ঠানের যাদের অডিট করার কথা তারা দিবানিদ্রা দিয়েছে। বোদ্ধা মানুষ বলেন এসব মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটলে শুধু নিঃস্ব হয়ে যান গরিব শ্রমিক আর সাধারণ মানুষ। মালিকরা অনেক ক্ষেত্রেই ইনসিওরেন্স থেকে ক্ষতিপূরণ পেয়ে যান। ট্যাকের আর ক্ষমতার জোর থাকলে ব্যাংক সুদও মওকুফ করিয়ে নিতে পারেন। ঋণখেলাপি হয়ে দায়মুক্তিও নিতে পারেন। কিন্তু যেসব শ্রমিকের শ্রমে মিলের চাকা সচল থাকে তাদের পরিবারকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাবে কে? এক দুই লক্ষ টাকায় মৃত্যুর দায় মিটিয়ে পরিবারগুলোকে পর্দার অন্তরালে ছুড়ে ফেলা হয়। এমন অনিরাপদ অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে কত পরিবারকে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে হবে কে এর পরিসংখ্যান রাখে!

 

দুর্ঘটনা ঘটে গেলে দৌড়ঝাঁপের কোনো অর্থ হয় না। সড়ক দুর্ঘটনা হোক বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অথবা আবাসিক ভবনে অগ্নিকা- ঘটুক এ ধারার দুর্ঘটনাকে নিছক দুর্ঘটনা ভাবতে ইচ্ছে করে না। এসব যেন আরোপিত দুর্ঘটনা। বেশ কয়েক বছর আগে পুরান ঢাকায় নিমতলীতে রাসায়নিক দ্রব্যের গোডাউনে আগুন লাগে। অনেক মানুষ আহত নিহত হন। পাঠক নিশ্চয়ই সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার কথা ভুলেননি। তখন সরকারি বিধায়করা বলেছিলেন এধরনের লোকবসতিতে অমন রাসায়নিক কারখানা থাকতে পারবে না। ব্যস, ওই পর্যন্তই। পরবর্তী ভাষ্যের জন্য আবার চকবাজার দুর্ঘটনা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। এবার কেরানীগঞ্জে রাসায়নিক দ্রব্যের জন্য বিকল্প জায়গা দিচ্ছে সরকার। তারপরও পত্রিকার খবরে জানা যায় পুরান ঢাকার বসতি অঞ্চল ও মার্কেট থেকে রাসায়নিক দ্রব্য সরানো যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট মানুষদের অমন অমানবিক অসচেতনতা কারও কাম্য নয়। আমরা সমস্ত দুর্ঘটনা কমিয়ে আনার জন্য সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সচেতনতা ও সতর্কতা কামনা করি। এবার ঈদযাত্রাসহ সকল পর্যায়ে মানুষের জীবন নিরাপদ হোক এটিই হচ্ছে আমাদের একান্ত প্রার্থনা।