যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্যযুদ্ধে সুর নরম করে সমাধানের চেষ্টায় ছিল চীন। তবে চীন যতই নরম হচ্ছিল, ততটাই চেপে বসছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ভীষণ ক্ষীপ্ত চীন ট্রাম্পের এ আচরণকে উল্লেখ করেছে বাণিজ্য-সন্ত্রাস হিসেবে। এবার যুক্তরাষ্ট্রকে বাগে আনতে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র প্রয়োগ করতে যাচ্ছে এশিয়ার পরাশক্তি চীন। স্মার্টফোন, এফ-২২ জঙ্গিবিমানসহ মূল্যবান অস্ত্র ও যন্ত্র তৈরিতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহার করা বিরল খনিজ পদার্থ সরবরাহ করা বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট শি চিন পিং।
এফ-২২ যুদ্ধবিমান তৈরিতে ব্যবহৃত হার্ডওয়্যার, স্মার্টফোনসহ বিভিন্ন সামরিক ও প্রযুক্তি যন্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত অতি দুর্লভ খনিজের বড় জোগানদার চীন। বিশে^ এই খনিজের ৯৫ শতাংশই উৎপাদন করে দেশটি। আর যুক্তরাষ্ট্র তার চাহিদার ৮০ শতাংশ নেয় চীন থেকে। তাই চীন এই খনিজ সরবরাহ বন্ধ করলে যুক্তরাষ্ট্রের আয়ের বড় উৎস অস্ত্র খাতে বিপর্যয় নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রিলিয়ন ডলারের শিল্প খাত দুর্লভ খনিজে নির্ভরশীল। তাই চীন খনিজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে দেশটির শিল্প খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, বলছেন বিশ্লেষকরা।
গত সপ্তাহে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিন পিং খনিজ পদার্থের কারখানা পরিদর্শন করে যুক্তরাষ্ট্রে তা রপ্তানি বন্ধের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ না করে বলেছেন, খনিজ সম্পদ আগে নিজেদের প্রয়োজনেই ব্যবহার করা উচিত। অন্য দেশের ন্যায়সংগত চাহিদা থাকলে পেইচিং তা মেটাবে। কিন্তু চীনের উন্নতিতে বাধা হবে, এমন কাউকে তা দিলে দেশের মানুষই অসন্তুষ্ট হবেন।
বৈদ্যুতিক গাড়ি ও উইন্ড টারবাইন উৎপাদনের মতো যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ প্রবৃদ্ধির খাতগুলোয় ব্যবহৃত কাঁচামালের শীর্ষ উৎপাদক চীন। ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে গত বছর এই খনিজগুলোকে দেশটির অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষা বিভাগের প্রধান চালক হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে দুর্লভ খনিজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টিতে বেইজিং বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বলে এক টুইটে জানিয়েছেন চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসের সম্পাদক।
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে বিরল খনিজ আমদানির প্রায় ৮০ শতাংশ হয় চীন থেকে। এস্তোনিয়া, ফ্রান্স ও জাপান থেকেও কিছু খনিজ আমদানি হয়। তবে প্রকৃত আকরিক আসে চীন থেকেই। চীন খনিজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে যুক্তরাষ্ট্র বিকল্প পদক্ষেপ নিতে পারে। তবে তা সময় সাপেক্ষ। আশির দশক পর্যন্ত বিরল খনিজ উৎপাদনে শীর্ষে ছিল যুক্তরাষ্ট্র। এর আগেও খনিজ রপ্তানি বন্ধ করেছিল চীন। ২০১০ সালে আঞ্চলিক বিরোধের কারণে জাপানে খনিজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল দেশটি।
১৭টি খনিজ উপাদানের গ্রুপ ‘বিরল খনিজ’ নামে পরিচিত। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ল্যানথেনাম, সিরিয়াম, প্রেসিওডিমিয়াম, গ্যাডোলিনিয়াম, ইত্রিয়াম, টারবিয়াম, ইউরোপিয়াম। ১৭ ধরনের বিরল এসব খনিজ শক্তিশালী ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। স্মার্টফোন ছাড়াও ট্যাবলেট ও স্মার্ট স্পিকার তৈরিতে এসব খনিজ লাগে। এছাড়া সামরিক অস্ত্রের মধ্যে লেজার, রাডার, ছোনার, নাইট ভিশন সিস্টেম, মিসাইল গাইডেন্স ও যুদ্ধ বিমানসহ সামরিক যান তৈরিতে এসব খনিজ জরুরি বলে গতকাল ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য তৈরি করা এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে পেন্টাগন।
চীন বিরল এসব খনিজ রপ্তানি কমাতে বা বন্ধ করতে পারেÑ এমন ধারণা ছড়িয়ে পড়ার পর গত কয়েকদিনে আন্তর্জাতিক বিশ্বে এসব খনিজের দর বাড়তে শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার সিডনিতে এসব খনিজের দর ১৫ শতাংশ বেড়ে গত ৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠেছে।
ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, এসব খনিজ সব জায়গায় সহজলভ্য না হওয়ায় এগুলোকে ‘বিরল’ বলা হয়। বিশে^র অল্প কিছু দেশে এর খনি রয়েছে বা উৎপাদন করা হয়। এসব খনিজ নিষ্কাশন কঠিন ও পরিবেশবান্ধবও নয়। বিশ্বব্যাপী এসব বিরল খনিজ উৎপাদনের প্রায় ৭০ শতাংশ হয় চীনে। মিয়ানমার, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ আরও কয়েকটি দেশে এসব খনিজ উৎপাদন হয় খুব অল্প পরিমাণে। পুনঃ নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিকস ও গ্লাস শিল্পের মতো বেশ কিছু খাতে এসব খনিজ ব্যবহার করা হয়। বিরল খনিজ আকরিক প্রক্রিয়াজাতেও এগিয়ে চীন। গত বছর বিশে^র প্রায় ৯০ শতাংশ খনিজ প্রক্রিয়াজাত করে তা ব্যবহারযোগ্য অক্সাইডে রূপান্তর করেছে দেশটি। চীনা পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, গত ৫ বছরে দেশটির বিরল খনিজ অক্সাইড রপ্তানি বেড়েছে দ্বিগুণ।