ঈদের আগেই ঈদ আনন্দ

বাংলাদেশ : ৩৩০/৬ (৫০ ওভার)  দক্ষিণ আফ্রিকা : ৩০৯/৮ (৫০ ওভার)  ফল : বাংলাদেশ ২১ রানে জয়ী।

বিশ্ব অবাক তাকিয়ে রয়। বিস্ময়ের শেষ কোথায়? কেবল কি শুরু? দক্ষিণ আফ্রিকা চোকার তাই বলে কি? না। এটা সেই বাংলাদেশ যার থেকে কেউ নিরাপদ নয়। ২ জুন, ২০১৯-এ বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচ সেই ঘোষণা দিয়ে গেল। এ তো বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের মতো এক দলের খেলা। দেখল গোটা ক্রিকেট ধরণী।

দুনিয়ার চোখে ২০১৯ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই বাংলাদেশ খুব শক্ত একটা স্টেটমেন্ট দিয়ে দিল। বিশাল বার্তা। বাংলাদেশ সেমিফাইনালে খেলতে পারে বা ১৯৯৬-এর বিস্ময় শ্রীলঙ্কার মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়নও হয়ে যেতে পারেÑ তা শুনে হেসেছিলেন? অন্তত লর্ডসের ওভালে যে বিস্ময়কর, অবিশ্বাস্য, পেশাদার, নিঃস্বার্থ, মনোহর ক্রিকেট খেলল মাশরাফী মোর্ত্তজার দল তা দেখে এর চেয়ে কী বলতে পারে? শেষ বলে ২৪ রান দরকার দক্ষিণ আফ্রিকার। টার্গেট ছিল ৩৩১। তারা শেষ ৮ উইকেটে ৩০৯ রানে। এই বিশ্বকাপে         

 এখন পর্যন্ত সেরা জয়। বাংলাদেশের তো বটেই। ব্যবধান হোক না ২১। ৬ উইকেটের বীরোচিত পারফরম্যান্সে যে রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়া হয়েছিল বাংলাদেশের দুরন্ত ব্যাটসম্যানদের উইলোতে। কিন্তু ইংল্যান্ডের পর একই মাঠে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারতে হলো বাংলাদেশের কাছে। হ্যাঁ, পেন্ডুলামের মতো ম্যাচটা কখনো এদিকে, কখনো ওদিকে ঝুলেছে কিন্তু ফলটা শেষে বাংলাদেশের। এত রান করে যা করতে হলে বিশ্বকাপের রেকর্ড হয়, প্রোটিয়াদের কাছে ম্যাচে হারলে বাংলাদেশের ওপর কি ক্রিকেট বিধাতার অন্যায় হতো না?

ব্যাটসম্যানরা ভিত্তি গড়েছেন। শেষে মাহমুদউল্লাহ ও মোসাদ্দেক হোসেন মিলে যে ফিনিশিং দিয়েছেন সেটার কিছুটা দক্ষিণ আফ্রিকা দিলে ওই পেন্ডুলামের ঘণ্টাটা তাদের দিকেও ঘুরে যেতে পারত নিশ্চয়ই। যখন ২৫০ রান করলেও তাড়া করে জেতা যায় তখন এই প্রোটিয়ারা অস্ট্রেলিয়ার ৪৩৪ তাড়া করে জিতেছিল। ২০০৬ সাল তখন। ওটা এখনো রেকর্ড। চার নম্বরে আছে ওই দক্ষিণ আফ্রিকারই ৩৭২-এর টার্গেট জয় করার ইতিহাস। প্রতিপক্ষ সেই অস্ট্রেলিয়াই আবার। ২০১৬।

কুইন্টন ডি কক মাহমুদউল্লাহর কল্যাণে শুরুতে জীবন পেলেন। ডেভিড মিলারের ক্যাচ ছাড়েন সৌম্য সরকার। মিস ফিল্ডিং হয়। এভাবে ভয় ধরাতে থাকে। কিন্তু আর্লি উইকেট দরকার ছিল। দলের ৪৯, কক (২৩), মার্করাম (৪৫) ১০২ রানের সময়। কী হলো? অধিনায়ক ফাফ ডু প্লেসি (৬২) আর অভিজ্ঞ জেপি ডুমিনি (৪৫)। সাকিব ৫০০০ রান ও ২৫০ উইকেটে দ্রুততম রেকর্ড করে অলরাউন্ড পারফরম্যান্সে ম্যান অব দ্য ম্যাচ।

তারপরও ভয়। ফিজ বা কাটার মাস্টার মোস্তাফিজুর রহমানের ইংল্যান্ডে আগের খরা ঘুচবে বুঝি এবার। প্রয়োজনে দুর্দান্ত বোলিং, রানে কম খরচ, ভেরিয়েশন আর ঠিক আকাশে ঘোর মেঘ জমার কাছাকাছি সময়ে ব্রেক থ্রু, দরকার আর কাকে বলে। সাইফউদ্দিন পেলেন ফন ডার ডুসেনকে (৪১)। ৪০ ওভারে পা রাখার আগে ৫ উইকেটে ২২৮। পেস আক্রমণ বাড়াতে গিয়ে যে ভুলটা ছিল তার মাশুল কি শেষে এমন? কে জানে?

কিন্তু টানা দুই ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার হার এই বিশ্বকাপকে তাদের জন্য কঠিন করে দিল। আসলে তা করল গতকাল বাংলাদেশ। ইতিহাসসেরা অন্যতম বিশ্বকাপ জয়ে উৎসব আর উৎসব। মানে পরের ম্যাচগুলোতে বাংলাদেশের আরও জ্বলে ওঠার সম্ভাবনা। ও, ২০০৩-এ এই দলের কাছে বাংলাদেশ হেরেছিল, পরের বিশ্বকাপে জিতেছিল, ২০১১-তে হার। এবার দুর্ধর্ষ জয়। প্রকৃতি তাহলে হিসাবটা কি এভাবে মিলিয়ে দিল বাংলাদেশের জন্য? ফিজ সুখবর। সাকিব ম্যাচের সেরা। আর কী চাই।

একি বিস্ময়! কল্পনার দৌড়ও যে অত দূরে পৌঁছতে চায় না। বাংলাদেশকে ২০১৯ বিশ্বকাপে তাদের প্রথম ম্যাচে হারাতে হলে দক্ষিণ আফ্রিকাকে গেল ১১ বৈশ্বিক আসরেরই রেকর্ড ভেঙে ফেলতে হবে। এত বেশি রান তাড়া করে যে বিশ্বকাপে আগে কোনো দলের জেতার রেকর্ড নেই।

৬ উইকেটে ৩৩০! লন্ডনের এই ওভালে সেদিন এবারের হট ফেভারিট স্বাগতিক ইংল্যান্ড ৮ উইকেটে ৩১১ করেছিল। আর সেখানে কি না বাংলাদেশের ইতিহাসসেরা রান! ওয়ানডে ইতিহাসে বাংলাদেশের আগের সর্বোচ্চটা ৩২৯। আর ২০১৫ বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডের ৩১৮ তাড়া করে ৬ উইকেটে জেতা ম্যাচটি শেষ করেছিল ৩২২ রানে। ওটা এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে রান তাড়া করে জেতার দ্বিতীয়সেরা রেকর্ড। সবার ওপরে ইংল্যান্ড-আয়ারল্যান্ডের ৩২৯। ২০১১ বিশ্বকাপে ইংলিশদের আইরিশরা কি অবিশ্বাস্যভাবেই না উড়িয়ে দিয়েছিল ৩২৭ রান তাড়া করে। আর গতকাল টস হেরেও দক্ষিণ আফ্রিকাকে এই আসরে টানা দ্বিতীয় হার উপহার দিল মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার দল। এই প্রোটিয়াদের বিপক্ষে বাংলাদেশের আগের সর্বোচ্চ দলগত স্কোরটা ছিল ২৭৮।

এক ম্যাচে কত প্রাপ্তি। তামিম ইকবাল চোট ভুলে খেললেন। ২৯ বলে ১৬। সাব্বির রহমানকে পেছনে ফেলে একাদশে আয়ারল্যান্ডে জাতীয় বীর হয়ে আসা মোসাদ্দেক হোসেন থাকলেন। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকা ডেল স্টেইনের অনুপস্থিতিতে পেস শক্তি বাড়িয়েছিল আরও। লুনগি এনগিডি নতুন বলে চার ওভার বল করে চোটে। তার আগে অবশ্য ঢের মার খেয়েছেন।

সৌম্য সরকার ‘লাইসেন্স টু কিল’ নিয়ে নামেন। শুরু থেকে তাই। রিভিউতে যদিও বেঁচেছেন। তামিম একটু দেখেশুনে। ৮.২ ওভারে ৬০ রানের জুটি মন্দ কি? ১৬ ওভারে দলের ১০০। শক্ত ভিত। আয়ারল্যান্ডে টানা তিন ফিফটির গৌরব নিয়ে আসা সৌম্য নিজের মতো দুর্বার ও স্বাধীন। স্ট্রোকে চোখ জুড়ায়। ৩০ বলে ৯ চারে ৪২। ৩৬ রানই বাউন্ডারিতে।

আর্লি উইকেট হারানো চলবে না। চলবে না স্বার্থপর খেলা। ভীতিহীন ক্রিকেটের বিকল্প নেই। স্ট্রাইক রোটেট করা চাই প্রচণ্ড প্রণোদনায়।

দুই ওপেনার ফিরলে ধারাবাহিক দুই স্তম্ভ সাকিব আল হাসান ও মুশফিকুর রহিম আগুন হয়ে ক্রিজ জ্বালান। সঙ্গে প্রতিপক্ষকে। বিশ্বখ্যাত প্রোটিয়া ব্যাটসম্যানদের টুইটারেও তখন তাদের দলের বোলিং নিয়ে হাহাকার। ১৪২ বলে ১৪২ রানের জুটি। মুশফিক-সাকিব এমনভাবে খেলছিলেন যেন বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ এক ইনিংসে দুটি সেঞ্চুরি পাবে বলেই মনে হচ্ছিল। কাগিসো রাবাদা হুমকি হচ্ছিলেন। ক্রিস মরিসকে এনে লাভ হয়নি তেমন। পেসাররা আসলে সৌম্য-সাকিব-মুশফিকদের সামনে এদিন অসহায় অনেকটাই। মুশফিক-সাকিবের দেশসেরা পাঁচ সেঞ্চুরি জুটির রেকর্ড হলো। আর তাদের ১৪২ হয়ে থাকল বিশ্বকাপে যেকোনো উইকেটে বাংলাদেশের নতুন সর্বোচ্চ।

সাকিব এ নিয়ে টানা চার বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে ফিফটি করলেন। তিন নম্বরে ব্যাট করছেন এখন। ওখানে ১৬ ম্যাচে ৭ ফিফটি হলো। এমনিতে গড় ৩৭-এর মতো হলেও তিনে ৫০ পার। উইকেটে যতক্ষণ থাকেন, কী ব্যস্ত ক্রিকেট যে খেলেন আজকাল প্রায় মুখ বুজে! মুশফিক কথা বলতে পছন্দ করেন। এই ম্যাচে তাদের ব্যাটিংয়ের সময় বারবার নিজেদের পিঠ চাপড়ে পরিকল্পনা শানিয়ে নেওয়ার বিষয়টা হয়তো বাড়তি কিছু দিয়ে থাকবে।

মিস্টার ডিপেন্ডেবল মুশফিক ৩৪তম ফিফটি করলেন। বিশ্বকাপে পঞ্চম। এর আগের সর্বোচ্চ ছিল ৮৯, ইংল্যান্ডকে হারানো ২০১৫ বিশ্বকাপের ম্যাচে। কিন্তু ওদিকে হাঁটার আগে ইমরান তাহির দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে তার ১০০তম ম্যাচে ব্রেক থ্রু দিলেন। সাকিবকে আগে তিনবার আউট করার অভ্যাস আছে তাহিরের। বাজেভাবে শট নিতে যাওয়া সাকিবকে বোল্ড করে রাজ্যের উল্লাস এই লেগার। ৮৪ বলে ৮ চার ও ১ ছক্কায় বিশ্বকাপ নিজের সর্বোচ্চ করে ফিরলেন সাকিব।

সেঞ্চুরির আশা জাগিয়ে সাকিবের মতো মুশফিকও ব্যর্থ হলেন। ৮০ বলে ৮ চারে ৭৮ রান তার। মোহাম্মদ মিঠুন এসে হামলে পড়লেন, ফিরলেনও দ্রুত (২১)। ভয় হচ্ছিল এই শেষটায় উইকেট পতনের ধারাবাহিকতায়। কিন্তু ডাবলিনের মতো শেষে নাবিক মাহমুদউল্লাহ, ডেপুটি মোসাদ্দেক। মোসাদ্দেক ২০ বলে ৪ চারে ২৬। ৩৩ বলে ৪৬ রানের হার না মানা ইনিংস নিয়ে ফেরেন মাহমুদউল্লাহ। কি দামি ইনিংস! জুটির ৪১ বলের ৬৬ রানে বাংলাদেশ নিজস্ব হিমালয়ে উঠল।