কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহে ১৯২তম ঈদুল ফিতরের নামাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্নের সব প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন ঈদগাহ মাঠ কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক (ডিসি) সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরী। গতকাল রবিবার দুপুরে ঈদগাহ পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানান তিনি।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন জেলা পুলিশ সুপার মাশরুকুর রহমান খালেদ, উপপরিচালক (স্থানীয় সরকার) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ, অতিরিক্ত
জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) হাবিবুর রহমান, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জাকির হোসেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাসুদ আনোয়ার, ঈদগাহ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহদী হাসান, পৌর মেয়র পারভেজ মিয়া প্রমুখ।
ডিসি জানান, ঈদুল ফিতরের জামাত অনুষ্ঠিত হবে সকাল ১০টায়। শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠের সব প্রস্তুতি এরই মধ্যে সম্পন্নের পথে। বাকি শুধু লাইটিং আর কয়েকটি গেট বাঁধার কাজ। তিনি আরও জানান, এবারের ঈদুল ফিতরের জামাতের ইমামতি করবেন ইসলাহুল মুসলিহীন পরিষদের চেয়ারম্যান মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ। ঈদের জামাতে অতিরিক্ত নিরাপত্তার জন্য বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হবে। পুলিশ ও র্যাবের পাশাপাশি ৫ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েনসহ চার স্তরের নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা হয়েছে। তা ছাড়া ১১টি ওয়াচ টাওয়ার ও ৬৫টি ক্লোজ সার্কিট টেলিভিশন (সিসিটিভি) ক্যামেরার মাধ্যমে পুরো মাঠ মনিটরিং করা হবে। এ কাজে পোশাকধারীর পাশাপাশি সাদাপোশাকের পুলিশ মোতায়েন থাকবে।
মাঠে অ্যাম্বুলেন্সের পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট সার্বক্ষণিক মোতায়েন থাকবে। ঈদের ৩ দিন আগে থেকে ঈদের দিন পর্যন্ত কিশোরগঞ্জ শহরের উজানভাটি ও গাংচিল হোটেল ছাড়া অন্যান্য আবাসিক হোটেল, স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার ছাত্রাবাস, হোস্টেল, মেস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মুসল্লিদের দেহ তল্লাশির পাশাপাশি একমাত্র জায়নামাজ ছাড়া আর কোনো কিছু নিয়ে মাঠে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
এদিকে শোলাকিয়ায় ঈদের জামাতে অংশগ্রহণের সুবিধার্থে ভৈরব-কিশোরগঞ্জ-ভৈরব ও ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ লাইনে ‘শোলাকিয়া এক্সপ্রেস’ নামে দুটি স্পেশাল ট্রেন চলাচল করবে।
শোলাকিয়া এক্সপ্রেস-১ ভৈরব থেকে ছাড়বে সকাল ৬টায়। কিশোরগঞ্জ পৌঁছাবে সকাল ৮টায়। ফের কিশোরগঞ্জ থেকে দুপুর ১২টায় ছেড়ে ভৈরবে পৌঁছাবে বেলা ২টায়। শোলাকিয়া এক্সপ্রেস-২ ময়মনসিংহ থেকে ছাড়বে সকাল পৌনে ৬টায়। কিশোরগঞ্জ পৌঁছাবে সকাল সাড়ে ৮টায়, আবার কিশোরগঞ্জ থেকে ছেড়ে যাবে দুপুর ১২টায় ও ময়মনসিংহে পৌঁছাবে বেলা ৩টায়।
শোলাকিয়া মাঠের মূল আয়তন বর্তমানে ৬ দশমিক ৬১ একর। চারপাশে অনুচ্চ প্রাচীরঘেরা শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে মোট ২৬৫টি কাতার রয়েছে, যেখানে একসঙ্গে ৩ লক্ষাধিক মুসল্লি নামাজ আদায় করেন। এ ছাড়া মাঠে স্থান সংকুলান না হওয়ায় ঈদগাহ-সংলগ্ন খালি জায়গা, রাস্তা ও নিকটবর্তী এলাকায় দাঁড়িয়ে সমসংখ্যক মুসল্লি এ বৃহত্তম ঈদ জামাতে শরিক হন। প্রতিবছরই জামাতের কলেবর বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ছে এই মাঠের সুনাম।
বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তান আমলে এ মাঠের চারদিকে নিচু দেয়াল নির্মাণ ও দোতলা মিম্বার নির্মাণ করা হয়। এরপর ১৯৭৫ সালে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার খানে আলম খান মাঠের সীমানাপ্রাচীর ও গেট নির্মাণ করেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আসার পর তৎকালীন এলজিআরডিমন্ত্রী প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে মাঠের মাইকিং সিস্টেমের উন্নয়ন, মিনার সংস্কার, মাঠে প্রবেশের প্রধান তোরণ নির্মাণ, ৪৫টি অজুখানা, ১৫টি প্রস্রাবখানা ও পাঁচটি টয়লেট নির্মাণে ভূমিকা রাখেন।
সাম্প্রতিক সময়ে মাঠের মিম্বারটির কিছুটা সংস্কার ছাড়া মাঠের স্থায়ী উন্নয়নে তেমন কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। শোলাকিয়ায় মুসল্লিদের মাটিতেই জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ আদায় করতে হয়। বৃষ্টি হলে কর্দমাক্ত মাঠে নামাজ আদায়ে মুসল্লিদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এ ছাড়া প্রতি জামাতেই মুসল্লির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। ফলে মাঠে স্থান সংকুলান না হওয়ায় বিপুলসংখ্যক মুসল্লি নামাজ না পড়েই বাধ্য হয়ে ফেরত যান।
স্থান সংকুলান না হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে স্থানীয় বাসিন্দা সুমন মিয়া বলেন, লাখ লাখ মুসল্লি ঈদ জামাতে অংশগ্রহণ করতে বিভিন্ন এলাকা থেকে এখানে ছুটে আসেন। কিন্তু স্থান সংকুলান না হওয়ায় আশপাশের বাড়ির উঠানে, রাস্তায়ও মুসল্লিরা নামাজ আদায় করেন। প্রতিবছরই মুসল্লির সংখ্যা বাড়ছে। তাই এই মাঠে স্থান সংকুলান না হওয়ায় নামাজ না পড়েই অনেক মুসল্লি বাধ্য হয়ে ফেরত যান।
বারবার আশ্বাসের পরও উন্নয়ন না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় বাসিন্দা গোলাপ মিয়া বলেন, এ মাঠে অনেক সমস্যা বিরাজমান। তাই মুসল্লিরা নামাজ পড়তে ভোগান্তির মধ্যে পড়েন। সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান প্রয়োজন। কিশোরগঞ্জকে দেশ-বিদেশে পরিচিত করেছে শোলাকিয়া ঈদগাহ। কিন্তু ২৬৭ বছরের পুরনো শোলাকিয়া ঈদগাহটি ঐতিহ্যের তুলনায় উন্নয়ন ও সংস্কারের ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে ঈদগাহ পরিচালনা কমিটি থাকলেও এর কার্যক্রম কেবল ঈদকেন্দ্রিক হওয়ায় সারা বছর রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে কোনো তৎপরতা পরিলক্ষিত হয় না।