প্রযুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও আধুনিক অনুষঙ্গ মোবাইল। এর কল্যাণে আমাদের জীবন-যাপনও অনেক সহজ হয়েছে। তবে এর কিছু ক্ষতিকর দিক-ও ইদানিং উন্মোচিত হচ্ছে বড় আকারে। আর তার অন্যতম একটি হচ্ছে শিশুদের মোবাইলের প্রতি আসক্তি। অবশ্য এর অনেক কারণ-ও আছে।
এর মধ্যে অন্যতম কারণ হচ্ছে, সন্তানদের প্রতি বাবা-মায়ের সময় না দেওয়া। বাবা-মা ব্যস্ত থাকেন চাকরি বা ব্যবসার কাজে। কিছু বাবা-মা তার চঞ্চল শিশুকে অন্য কোনো উপায়ে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে অগত্যা মোবাইল দিয়ে বসিয়ে দেন। আবার অনেক মা তার সন্তান খেতে না চাওয়ায় মোবাইল ফোন হাতে দেন। তারা ইউটিউবে গান শুনতে শুনতে, কার্টুন দেখতে দেখতে খায়। সুতরাং অভিভাবক নিশ্চিন্ত হন। বিনা ঝামেলায় বাচ্চারা এখন পেটপুরে খায়।
এভাবেই বাবা-মায়েরা সন্তানকে শান্ত রাখতে তাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন স্মার্টফোনসহ নানা ধরনের দামি গেজেট। এতে একদিকে যেমন বাবা-মায়েরা নিশ্চিন্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে তেমনি তারা এটাকে আভিজাত্যের অংশ মনে করেন। আবার অনেকেই আত্মতৃপ্তিতে ভোগেন কারণ তার সন্তান ইন্টারনেট থেকে সব তথ্য, অ্যাপস ডাউনলোড করতে পারে এবং খুব ভালো গেইম খেলতে পারে।
তবে চিকিৎসা বিজ্ঞান বলে ভিন্ন কথা। বিজ্ঞানের দাবি, শিশুদের হাতে মোবাইল ফোনসহ কোনো ইলেকট্রনিক্স গেজেট দেওয়া উচিত নয়। এতে নানা রোগের জন্ম হয় শিশুদের শরীরে।
নাক, কান ও গলা (ইএনটি) বিশেষজ্ঞ প্রাণগোপাল দত্ত বলেন, "মোবাইল ফোন শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। মোবাইল ফোন থেকে নির্গত রশ্মি শিশুদের দৃষ্টিশক্তির ভীষণ ক্ষতি করে। যেসব শিশু দৈনিক পাঁচ-ছয় ঘণ্টা মোবাইল ফোনে ভিডিও গেম খেলে, খুব অল্প বয়সে তারা চোখের সমস্যায় পড়বে।"
তিনি আরও বলেন, "সেদিন খুব বেশি দূরে নয়, যেদিন মোবাইল ফোনকে সিগারেটের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিত করা হবে।"
যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক এক গবেষণায় দেখা যায়, ১১ বছর বয়সী শিশুদের প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ৭০ জন মোবাইল ফোন নিয়মিত ব্যবহার করে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘We are social" ও "Hut Suit’ নামক প্রতিষ্ঠানের করা এক গবেষণা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, "ভারত ও তার আশপাশের রাষ্ট্রগুলোতে মোবাইল ফোন ব্যবহারের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। চীনের মতো প্রযুক্তিবান্ধব রাষ্ট্রে যেখানে শিশুরা দৈনিক ২ ঘণ্টা মোবাইল ফোনে ব্যবহার করে, সেখানে ভারত ও তার আশপাশের রাষ্ট্রগুলোতে শিশুরা গড়ে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা মোবাইল ফোন ব্যবহার করে।"
ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশুরোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সাঈদা আনোয়ার পপি বলেন, "মোবাইলের প্রতি আসক্তি শিশুদের সামাজিক দক্ষতা নষ্ট করছে। ফলে তৈরি হয় শিশুদের নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক সমস্যা। এ ছাড়া প্রযুক্তির এ আসক্তি শিশুদের জীবনে বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব-ও ফেলছে। দীর্ঘসময় মোবাইল স্ক্রিনে চোখ রাখার ফলে শিশুর চোখের সমস্যা তৈরি হচ্ছে। আবার দীর্ঘ সময় বসে থাকতে শিশুর স্থূলতাও বেড়ে যাচ্ছে, কমে যাচ্ছে শিশুর কল্পনাশক্তিও।"
শিশুদের অতিরিক্ত ফোন আসক্তির কারণে শিশু পরিবারের সাথে গল্প-গুজব করা, প্রয়োজনে এগিয়ে যাওয়া, সবার সঙ্গে মিশতে পারার দক্ষতা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলে। এই চিত্র হরহামেশা শহরে লক্ষ্যণীয়।
তবে এই ক্ষেত্রে গ্রামীণ শিশুরাও পিছিয়ে নেই; যদিও সেখানে ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক তেমন সক্রিয় না থাকায় শিশুরা অ্যাপস ডাউনলোড সবসময় না দিতে পারলেও মোবাইলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গেইম খেলা, গান শোনা, কার্টুন দেখার প্রতির আসক্তি দেখা যায়। ফোনে নিত্যনতুন ভিডিও, গেইম পাওয়ার ফলে মাঠে খেলার প্রতি আগ্রহ তেমন দেখা যায় না।
এর ফলে তাদের মধ্যে এক ধরনের একঘেয়েমিতা লক্ষ্য করা যায় এবং সামাজিকতা তেমন বৃদ্ধি পায় না। কিন্তু শিশুর কাজই হলো খেলাধুলা। খেলাধুলার মাধ্যমেই শিশুদের মধ্যে সৃজনশীলতা, ভাষার দক্ষতা, সামাজিকতা, কল্পনাশক্তি বাড়ে এবং সমবয়সীদের সাথে কাজ করার ক্ষমতা, মডেলিং ও রিইনফোর্সমেন্ট এর মাধ্যমে সক্রিয় করে তোলা হয়।
শিশু মাঠে বা পরিবারের খেলার মাধ্যমে যেমন- আনন্দ, আরাম পাবে এবং অনুমান ক্ষমতা বাড়বে; সেইসাথে পরিবারের সদস্যদের সাথে হৃদ্যতা, সহমর্মিতা, সহানুভূতি বাড়বে এবং সহপাঠীদের সাথে খেলার মাধ্যমে মত বিনিময়, মতামত, অন্যের কথাকে শ্রদ্ধা, সম্মান দিতে শিখবে।
শহরে খেলার মাঠের বড্ড সংকট। তাই শহরে শিশুরা প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে যায়। তবে এই ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। সৃজনশীল নানা ধরনের খেলার মাধ্যমে শিশুর খেলার সঙ্গী হতে পারে। এতে শিশু এবং পরিবারের একে অপরের প্রতি মমত্ববোধ অধিকতর দৃঢ় হবে।
লেখক: তন্বী আক্তার; শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়