ছিঁচকে চুরি থেকে পুকুর-সমুদ্র চুরি, যে চুরিই হোক! নিরাপদে সারতে পারাটাও বিরাট কৃতিত্ব। পুকুর চুরি অর্থাৎ বড় ধরনের চুরিÑ এই যেমন রাষ্ট্রীয় কোটি টাকা পাচার কিংবা লাখ টাকা ঘুষ বাবদ গ্রহণ করলে তিনি গণমাধ্যমে আলোচিত বা ‘হিরো’ হয়ে যান। দিনের পর দিন তাকে নিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন ছাপা হয়। আলোচনা হয়। সে তুলনায় ছোটখাটো চোররা অনালোচিত থেকে যান। তাদের খোঁজ নেয় না কেউ। সাধারণ জনগণ দু-একটি চড়-থাপ্পড় দিয়ে বিদায় করে দেয়। ভাগ্য খারাপ হলে হয়তো কিছুটা বেশি শাস্তিও পেতে হয়!
চুরি আসলে এক চমৎকার আর্ট। কমবেশি অনেকেই এ বিদ্যা চর্চা করে। কিন্তু ধরা পড়ে খুব কম জনই। আর এর সুবিধা হলো, ধরা না পড়া পর্যন্ত কাউকে চোর বলাও যায় না। সে জন্যই প্রবাদ তৈরি হয়েছেÑ ‘চুরি বিদ্যা মহাবিদ্যা, যদি না পড় ধরা’!
চুরিটা আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে এমনভাবে মিশে গেছে, এ নিয়ে কেউ তেমন আর মাথা ঘামায় না। তবে মাঝেমধ্যে দু-একটি বড় চুরির ঘটনা ধরা পড়ে বা উদ্ঘাটিত হয়। তখন আমরা খানিকটা হইচই করি। ধর্মের বাণী স্মরণ করি। ব্যস। তারপর যেই লাউ সেই কদু। আমরা আবার চুরির মওকা খুঁজি। চুরি বিদ্যার চর্চা অব্যাহত রাখি।
যন্ত্র প্রযুক্তিনির্ভর সমাজে ইদানীং সাধারণ চুরির পাশাপাশি ডিজিটাল চুরির ঘটনাও ঘটছে। সর্বশেষ ডিজিটাল জালিয়াতির মাধ্যমে এটিএম বুথের সিস্টেম হ্যাকিং করে টাকা তোলার ঘটনা নিয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। এরই মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয় ছয়জন বিদেশি নাগরিককে। এরা প্রত্যেকেই ইউক্রেনের নাগরিক।
এই চুরির ঘটনাটি ঘটেছে অভিনব কৌশলে, একেবারে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে। এর আগে যতবারই এটিএম বুথ থেকে টাকা চুরি হয়েছে, প্রতিবারই গ্রাহকের কার্ডের তথ্য চুরি করে ক্লোন কার্ড তৈরি করেছিল জড়িত ব্যক্তিরা। প্রতিবারই গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। এবারের ঘটনায় পুরো এটিএম বুথের নিয়ন্ত্রণ নেয় জড়িত বিদেশিরা। খাবারের সঙ্গে রাসায়নিক মিশিয়ে ‘অজ্ঞান পার্টি’র সদস্যরা যেমন কাউকে অজ্ঞান করে সবকিছু হাতিয়ে নেয়, এই চোররাও এটিএম বুথের পুরো সিস্টেমকে ‘অজ্ঞান’ বানিয়ে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। সিস্টেমকে কীভাবে ‘অজ্ঞান’ বানিয়ে তারা বুথ থেকে টাকা চুরি করল, তার কোনো কূলকিনারা করতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও পুলিশ কর্মকর্তারা। এতে দেশের এটিএম সেবার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এই জালিয়াতির ঘটনা যারা ঘটিয়েছে, তারা অত্যন্ত অভিজ্ঞ। আমাদের সৌভাগ্য, বিষয়টি শুরুতেই ব্যাংক কর্র্তৃপক্ষের নজরে এসেছিল। প্রাপ্ত তথ্য মতে, গত ১ জুন সকালে বাড্ডার এটিএম বুথের টাকার হিসাব মেলানোর সময় তিন লাখ টাকা কম হয়। তারপর নিরাপত্তাকর্মী ও ব্যাংক কর্র্তৃপক্ষ সিসিটিভি ফুটেজ দেখে দুই বিদেশি কর্র্তৃক টাকা উত্তোলনের বিষয়টি নিশ্চিত হয়। এরপর সব এটিএম বুথে নিরাপত্তা বাড়ায় ডাচ্-বাংলা ব্যাংক কর্র্তৃপক্ষ। একই তারিখে রাতে খিলগাঁওয়ের তালতলা এলাকায় ডাচ্-বাংলার এটিএমে টাকা চুরি করতে গেলে দুই বিদেশির একজন ধরা পড়ে। পরে আরও পাঁচজন বিদেশিকে আটক করে পুলিশ।
পুলিশ বলছে, এই ছয় আসামি সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক জালিয়াত চক্রের সদস্য। তারা বিশেষ কোনো পদ্ধতি অবলম্বন করে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথের সিস্টেম হ্যাক করে। ডিজিটাল জালিয়াতির মাধ্যমে টাকা তোলার জন্য এই আসামিরা বাংলাদেশে এসেছে।
পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারদের কাছে যে কার্ডগুলো পাওয়া গেছে, সেগুলো এটিএম বুথে ঢোকানোর সঙ্গে সঙ্গেই ব্যাংকের কেন্দ্রীয় সার্ভারের সঙ্গে ওই বুথের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর তারা নিজেদের মতো করে টাকা তুলে নিয়ে যান। এটি সম্পূর্ণ নতুন ও অভিনব পদ্ধতি। আগে কখনো এই পদ্ধতির ব্যবহার তাদের নজরে আসেনি।
বিষয়টি সত্যিই আমাদের জন্য দুশ্চিন্তার। যন্ত্র প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতা আমাদের জীবনকে অনেকাংশে স্বাচ্ছন্দ্য দিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে তৈরি করছে নিরাপত্তা সংকট। এই সংকট দূর করতে না পারলে সমূহ সর্বনাশ। মানুষের মধ্যে আস্থাহীনতা সৃষ্টি হলে অনলাইন ব্যাংকিং, এটিএম ইত্যাদি সুবিধা থেকে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে।
এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ছুটির সময় সব ব্যাংকের এটিএম বুথে পর্যাপ্ত টাকা সরবরাহ, এটিএম বুথে সার্বক্ষণিক পাহারাদারের সতর্ক অবস্থান ও অন্যান্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া অনলাইন ই-পেমেন্ট গেটওয়েতে কার্ডভিত্তিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ‘টু ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন’ ব্যবস্থা চালু রাখা এবং ছুটি চলাকালে যেকোনো অঙ্কের লেনদেনে গ্রাহকদের মোবাইল ফোনে বার্তা পাঠানোসহ সার্বক্ষণিক হেল্পলাইন-সুবিধা প্রদানের নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এসব ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। এ ব্যাপারে ব্যাংকগুলোকে আরও অনেক কিছুই করতে হবে। সবার আগে জানা দরকার কোন পদ্ধতি বা প্রক্রিয়ায় তারা এটিএম বুথের সিস্টেমকে ‘অজ্ঞান’ করেছে, কোনো রকম পিন নম্বর ছাড়াই কীভাবে তাদের কার্ডগুলো ব্যবহার করে টাকা উত্তোলন করেছে। এর প্রতিষেধক যদি বের করা না যায়, তাহলে এমন ঘটনা ভবিষ্যতে আরও ঘটতে পারে।
মনে রাখতে হবে, আন্তর্জাতিক হ্যাকাররা একেবারে নতুন পদ্ধতিতে এবার টাকা চুরি করেছে। এখন আমাদের এটিএম সেবার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। প্রতিনিয়ত নিরাপত্তা হালনাগাদ করতে হবে। এ জন্য টাকা খরচের দিকে তাকানো যাবে না। কারণ, ব্যাংক সেবার নিরাপত্তা আগে নিশ্চিত করাটা জরুরি। প্রয়োজনে এটিএম সেবায় কয়েক স্তরে গ্রাহকের পরিচিতি নিশ্চিত হওয়ার পর সেবা দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে আঙুলের ছাপ ও চোখের পাপড়িকে বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।
উল্লেখ্য, এর আগে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বেসরকারি ইস্টার্ন, সিটি ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) চার এটিএম বুথ থেকে তথ্য চুরি করে ক্লোন কার্ড তৈরি করে বিদেশিরা। ওই সময় ৪০টি কার্ড ক্লোন করে গ্রাহকদের ২০ লাখ টাকা তুলে নেওয়া হয়। ২০১৮ সালে বনানী এলাকার একটি সুপারশপ থেকে গ্রাহকদের তথ্য চুরি হয়। ক্লোন কার্ড তৈরি করে ৪৯ গ্রাহকের হিসাব থেকে টাকা তুলে নেওয়া হয়। ভুক্তভোগীরা ছিলেন ব্র্যাক, দ্য সিটি, ইস্টার্ন, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) ও ব্যাংক এশিয়ার গ্রাহক।
এটিএম বুথের টাকা জালিয়াতির ঘটনার সঙ্গে বিদেশিদের সম্পৃক্ততা লক্ষ করা যাচ্ছে। যেসব দেশের নাগরিকদের এ ধরনের অপকর্মে যুক্ত থাকার রেকর্ড বেশি, সেই বিদেশিদের ওপর কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকেও এ ব্যাপারে সতর্ক করা প্রয়োজন। বিদেশিরা এসে আমাদের দেশে নানা অপকর্ম করবে, তাদের কারণে আমাদের দুর্ভোগ পোহাতে হবে, এটা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না!