অসমিয়া ভাষা শিখেও নিস্তার নেই বাঙালি মুসলিমদের

ভারতের আসাম রাজ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘চলো পাল্টাই-মিশন ২০২১’ নামে একটি ক্যাম্পেইন বেশ আলোড়ন তুলেছে। রাজ্যের বাংলা ভাষাভাষীরা অসমিয়া ভাষা শিখতে এই ক্যাম্পেইনের ডাক দিয়েছে। দেশটির গত আদমশুমারিতেও তাদের বাঙালি হিসেবে দেখানো হলেও, ২০২১ সালের শুমারিতে নিজেদের আসামীয় হিসেবে দেখাতে চাইছে তারা।

এই ক্যাম্পেইনের সঙ্গে জড়িতরা ভারতীয় সংবাদমাধ্যম স্ক্রলডটইনকে বলেন, অসমিয়া ভাষা শিখেও তারা ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবেই থেকে যাচ্ছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আসামের বাংলা ভাষাভাষীরা জাতীয় নাগরিক তালিকা (এনআরসি) জটিলতায় ভুগছে। এই বিলে আসামের অবৈধ অভিবাসীদের চিহ্নিত করে ভারতীয়দের আলাদা করার প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়।

‘চলো পাল্টাই’ ক্যাম্পেইনসংশ্লিষ্ট আবু ইউসুফ বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষরা অসমীয় মিডিয়াম স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আমরা সবাই সেই স্কুলে পড়েছি। কিন্তু এখন আমাদের জাতীয়তা প্রশ্নবিদ্ধ।’ গত মে মাসের ৩১ তারিখ গুয়াহাটিভিত্তিক একজন অধিকারকর্মী ‘তথাকথিত বুদ্ধিজীবী গার্গ চ্যাটার্জির বিরুদ্ধে’ রিপোর্ট করেন। গার্গ চ্যাটার্জি ওই ক্যাম্পেইনকে সমর্থন করেন। ওই রিপোর্টের পরেই অসমিয়া যুব মঞ্চ চ্যাটার্জি ও বাঙালি হিন্দু নেতাদের কুশপুত্তলিকা দাহ করে।

আসামের ভাষাকেন্দ্রিক জটিলতা নিরসনে ১৯১৭ সালে আসাম সাহিত্য সভা নামে একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির অধীনে ১৯৩১ সালের শুমারিতে দেখা যায়, আসামে অসমিয়া ভাষায় ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ কথা বলে। কিন্তু ১৯৫১ সালের অপর এক শুমারিতে দেখা যায়, রাজ্যে অসমিয়া ভাষাভাষী মানুষের সংখ্যা ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০ বছরের মধ্যে এই সংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ ছিল রাজ্যের বাঙালিদের মধ্যে নিজেদের অসমীয় বলে চিহ্নিতকরণ প্রক্রিয়া।

কয়েক দশক ধরেই আসামের বাঙালি মুসলিমরা নিজেদের অসমীয় ভাষাভাষীর বলে দাবি করে আসছে। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে তাদের বাঙালি হিসেবেই দেখা হয় সাংস্কৃতিক পার্থক্যের কারণে। তবে আসামের হিন্দু বাঙালিদের অসমিয়া হতে হচ্ছে না। ফলে অসমিয়া ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে প্রায়ই তাদের দ্বন্দ্ব হয়। ১৯৬০ সালে অসমিয়াকে রাজ্যের অফিশিয়াল ভাষা করার চেষ্টায় ব্যাপক সাংঘর্ষিক অবস্থার সৃষ্টি হয়। হিন্দু বাঙালিরা (বারাক ভ্যালি) ভাষা আন্দোলনের ডাক দেয়। ওই আন্দোলনে ১১ জন মারা যায় এবং সরকারকে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হয়। ওই আন্দোলনে বারাক ভ্যালির মুসলিম বাঙালিদের অংশগ্রহণ থাকলেও ব্রহ্মপুত্র ভ্যালির মুসলিম বাঙালিদের অংশগ্রহণ ছিল না।

আসামের সাধারণ মানুষের জীবনে ‘অবৈধ অভিবাসী’ ব্যাপারটি গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। ২০১৫ সালে রাজ্য সরকার জাতীয় নাগরিক তালিকা হালনাগাদ করতে শুরু করে। এই হালনাগাদ প্রক্রিয়ায় ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ মধ্যরাতের আগে যারা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসামে প্রবেশ করেছিল, তাদের রাজ্যের নাগরিক হিসেবে রাখা হয়। ওই রাতের পরে যারা এসেছে, তাদের নাম তালিকায় রাখা হয়নি। কিন্তু ২৪ মার্চের আগে আসামে আসা অনেক মুসলিম বাঙালির নামও বাদ যায় তালিকা থেকে। এ নিয়ে নতুন করে সংকট সৃষ্টি হয়।