নতুন মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পরই বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে নানা তৎপরতা শুরু করেছে সরকার। দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও রয়েছে। গ্যাস-বিদ্যুৎ পরিস্থিতিও আগের চেয়ে অনেক বেশি বিনিয়োগবান্ধব। তা সত্ত্বেও কাক্সিক্ষত বিনিয়োগ হচ্ছে না। এ অবস্থায় বিনিয়োগ বাড়াতে আসছে বাজেটে ব্যবসার খরচ কমানোর কথা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন। নাতিদীর্ঘ এ সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আবুল কাশেম।
ইতিবাচক পরিবেশ সত্ত্বেও ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করছেন না কেন?
বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার কাজ করছে। কিন্তু উন্নয়নটা দৃশ্যমান করার জন্য যা যা দরকার, তা হয়নি। যেমন ব্যাংক ঋণের সুদহার এক অঙ্গে নামানো নিয়ে এখনো আলোচনা হচ্ছে, কোর্টে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে কোনো কাজ হচ্ছে না। এটাকে দ্রুত দৃশ্যমান করা। খেলাপি ও খেলাপি নয় এমন সবাই যেন সহনীয় হারে ঋণ পান সে ব্যবস্থা করতে হবে। নিয়ম-কানুন প্রয়োগের ক্ষেত্রে তা যেন হয়রানিতে রূপ না নেয়, সেদিকে বিশেষভাবে নজর দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এগুলোর কারণে ব্যবসায়ীদের আস্থা কম। যেকোনো বিনিয়োগের একটা পরিকল্পনা থাকে। কত বছরে বিনিয়োগের অর্থ উঠে আসবে তার পরিকল্পনা থাকে। যখন দেখা যায় বিদ্যমান পরিবেশে বিনিয়োগ করে কাক্সিক্ষত মাত্রায় রিটার্ন আসবে না, তখন বিনিয়োগে কেউই আগ্রহী হন না।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বেশি খরচ কোথায় কোথায়?
শ্রমিক আর উদ্যোক্তা ছাড়া বাকি তিনটা বিষয় জমি, মূলধন ব্যয় ও মধ্যম পর্যায়ের ব্যবস্থাপনায় আমরা পিছিয়ে। ঋণের সুদহার বেশি, জমির দাম বেশি, আর মধ্যম পর্যায়ের ব্যবস্থাপক তো আমরা তৈরি করতেই পারছি না। উদ্যোক্তা তৈরির জন্য সরকার ও এফবিসিসিআই থেকেও কিছু কাজ করা হচ্ছে।
উন্নয়ন করতে হলে ভারী শিল্প স্থাপন জরুরি। কিন্তু বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী দেশে ভারী শিল্প কমছে। এর কারণ কী?
ভারী শিল্পের জন্য উদ্যোক্তার সম্ভাব্যতা যাচাইকালে যদি তা লাভজনক বলে মনে না হয়, তাহলে হবে না। সরকারি খাতে বড় বিনিয়োগ হচ্ছে, কিন্তু বেসরকারি খাতে হচ্ছে না। বড় বিনিয়োগের অর্থায়নের জন্য একজন ব্যবসায়ী শেয়ারবাজারে যাবে। কিন্তু শেয়ারবাজারে আস্থার লেভেল তলানিতে রয়েছে। তখন বাধ্য হয়ে তাকে ঋণের জন্য ব্যাংকে যেতে হচ্ছে। সেখানে সুদহার বেশি হওয়ায় বিনিয়োগ লাভজনক হচ্ছে না। ফলে প্রকৃত উদ্যোক্তা তখন বিনিয়োগ থেকে পিছিয়ে আসছে। এ জন্যই ভারী শিল্প হচ্ছে না।
সরকার তো অনেক উদ্যোগ নিচ্ছে, বিদ্যুৎ পরিস্থিতিও ভালো।
সরকার ভারী শিল্পের জন্য পরিকল্পিত অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ছে। বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা যেটা হয়েছে, সে জন্য সরকার ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু এই বিদ্যুৎ এখন বিক্রির জন্য চাহিদা সৃষ্টি না হলে এই উৎপাদন ক্ষমতা লাভজনক হবে না। কারণ, বাড়তি উৎপাদন ক্ষমতার খরচ কে দেবে? এসব বিষয় নিয়ে বেসরকারি খাতের সঙ্গে সরকারকে আরও সম্পৃক্ত হতে হবে। বিদ্যুতের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে দামও কমবে। কারণ, এখন যে বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে না, তার খরচও বহন করতে হচ্ছে। আমাদের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো শুধু সহজ পথে হাঁটছে। তারা বলছে, যে নেবে, তার রেট আরও বাড়িয়ে দাও। কিন্তু এজন্য যে ব্যবস্থাপনা দরকার, তা হচ্ছে না। সে বিষয়ে কাজ করার অনেক সুযোগ আছে। সরকার ২০২১ সালে মধ্যম আয়ের ও ২০৪১ সালে উন্নত দেশ গড়ার যে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়েছে তা অর্জন করতে হলে এখনকার সমস্যাগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সমাধান করতে হবে।
তাহলে জনসংখ্যার বোনাসকাল কি অবহেলাতেই পার হবে?
জনসংখ্যার বোনাসকাল ২০৩০-এর পড়েই কমে যাবে। আমাদের সুযোগ ও সম্ভাবনা আরও বেশি থাকলেও শ্রমশক্তিকে কাক্সিক্ষত মাত্রায় ব্যবহার করতে পারছি না। শ্রমশক্তিকে কাজে লাগানোর জন্যই আমাদের সার্বিক উদ্যোগ ও বাস্তবায়ন আরও যতœ সহকারে করতে হবে। যেমন আমরা ইদানিং দেখলাম যে, সদিচ্ছা বা একজন ভালো প্রকল্প পরিচালক থাকার কারণে মেঘনা সেতু, দাউদকান্দি সেতু, কাঁচপুর সেতু নির্ধারিত সময়ের আগেই বাস্তবায়ন সম্ভব হলো। আবার একই সঙ্গে বাংলাদেশে দেখছি যে, অনেক প্রকল্পে শুধুই সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে। সেখানে প্রকল্প ব্যয় বাড়ে, প্রকল্পে ব্যয় করা অর্থের সুদ খরচ বাড়ে এবং প্রকল্পের সুফলও কাক্সিক্ষত মাত্রায় পাওয়া যায় না। প্রকল্প বাস্তবায়নে নজরদারি ও দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি।
অর্থমন্ত্রীর প্রত্যাশা অনুযায়ী এক কোটি করদাতা পাওয়া কি সম্ভব হবে বলে মনে করেন?
অর্থমন্ত্রী আমাদের কথা দিয়েছেন, কোনো পণ্য ও সেবায় এখনকার চেয়ে অতিরিক্ত কর বা ভ্যাট বসবে না। মন্ত্রী যখন এ কথা বলেন, তখন তাতে আস্থা রাখতে হয়। আমরাও আস্থা রাখছি। তিনি বলেন, মন্ত্রী যে এক কোটি করদাতার কথা বলেছেন, সেই সক্ষমতা এনবিআরের নেই। তবে তিনি যে বড় লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামার কথা বলেছেন, এটাও ইতিবাচক। সবাই মিলে চেষ্টা করলে এক কোটি না হলেও করদাতার সংখ্যা এখনকার চেয়ে বাড়ানো যাবে।