সংসদে প্রধানমন্ত্রী

আর্থিক উন্নতি হলে টাউট বাটপার সৃষ্টি হয়

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, কেউ শতভাগ  ‘ধোয়া তুলসীপাতা’ নয়। দুদক কর্মকর্তাদের নিয়ে দুর্নীতির জনশ্রুতি যাতে না ছড়ায় সে জন্য তাদের আরও সচেতন হয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।  দুর্নীতি দমনে সামাজিক সচেতনতা তৈরির আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দুর্নীতি আমরা করব না, দুর্নীতি করতে দেব না।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘ঘুষ যে গ্রহণ করবে আর ঘুষ যে দেবে উভয়েই অপরাধী। সেটাই ধরে নিতে হবে। শুধুমাত্র ঘুষ নিলে তাকেই ধরা হবে তা নয়, যে দেবে তাকেও ধরা হবে। কারণ দেওয়াটাও অপরাধ। সে ভাবেই কিন্তু বিচার করতে হবে।’

গতকাল বুধবার সংসদে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তরে এ কথা বলেন শেখ হাসিনা। সংসদে প্রশ্নোত্তরে প্রথমেই সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রীকে দুদক নিয়ে প্রশ্ন করেন সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদ বেগম রওশন আরা মান্নান। তিনি প্রশ্নে বলেন, কিন্তু এখানে দেখা যায় যে, দুর্নীতি দমন কমিশন এককভাবে কাজ করছে। তাদের নেই তেমন কোনো আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ লোকবল এবং জনবল সংকট তো রয়েছেই। এটা ছাড়া এই সংস্থার মধ্যে অনেকেই দুর্নীতির ব্যাধিতে আক্রান্ত বলে জনশ্রুতি আছে।

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর লিখিত জবাব আসার পর সম্পূরক প্রশ্নে রওশন আরার প্রশ্ন থেকে ‘এটা ছাড়া এই সংস্থার মধ্যে অনেকেই দুর্নীতির ব্যাধিতে আক্রান্ত বলে জনশ্রুতি আছে’ কথাটি বাদ দিতে স্পিকারকে অনুরোধ করেন সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম। দুদককে ‘স্পর্শকাতর’ সংস্থা উল্লেখ করে রফিকুল ইসলাম বলেন, এটা বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।

এসময় শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি মনে করি যে কথাটা লিখেছেন এটা ঠিকই লেখা আছে। এটা এমন কিছু না। এটা বাদ দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। তার কথার মধ্যে কিন্তু এই জিনিসটা আছে যে জনশ্রুতি আছে। তিনি যে করছেনই এই ধরনের কথাটা কিন্তু নাই। এ কারণে আমার মনে হয়, এ কথাটা বাদ দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নাই।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘প্রয়োজন নাই এ কারণে যে, এ কথা একেবারে কিন্তু মিথ্যা না। আর সবাই তো একেবারে ধোয়া তুলসীপাতা না। আর এই গ্যারান্টি তো কেউ দিতে পারবে না যে, সবাই একেবারে একশভাগ ধোয়া তুলসীপাতা হবে।’

দুদকের কর্মকর্তা-কর্মীদের আরও সচেতন হয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এটা ছাড়া এই সংস্থার মধ্যে অনেকেই দুর্নীতির ব্যাধিতে আক্রান্ত বলে জনশ্রুতি আছে। তো ঠিক আছে, আমি মনে করি এই সংস্থাকে এখন থেকে সচেতন হতে হবে বা যারা কাজ করবে তাদেরও সচেতন হতে হবে যে তারা যেন এমন কিছু না করেন যাতে এই ধরনের জনশ্রুতি সৃষ্টি হয়।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আর এখানে একটা ব্যাপার আছে, দুর্নীতি দমনই বলেন বা যে খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রেই বলেন বা অনেক অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, এমন এমন বড় বড় জায়গা আছে যে যেখানে হাত দিলেই মনে হয় যেন হাতটা পুড়ে যাচ্ছে। মানে যারা এই কাজটা করতে যায় তারাই অপরাধী হয়ে যায়। আর কিছু পত্র-পত্রিকা তো আছেই, সঙ্গে সঙ্গে এদের বিরুদ্ধে  লেখা শুরু করে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি নিজে মনে করি, আমাদের এ ব্যাপারে সচেতন থাকা যে, সঠিক কাজটা করেছেন কি না সেটা দেখে তারপরে বিচার করা। কোন পত্রিকায় কী লিখল বা কে কী বলল সেটায় কান দেওয়ার দরকার নাই।’

শাহরিয়ারের বদলি গ্রহণযোগ্য ছিল না

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বড় বড় জায়গায় হাত দিলে, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই হঠাৎ কিছু পত্রিকা লেখালেখি শুরু করে দেয়। যে যাই লেখে, লেখুক। আমরা দেখব সঠিক কি না। রমজান মাসে আড়ং-এর জরিমানা করায় ভোক্তা অধিকারের উপ-পরিচালক মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ারকে বদলি করা হয়। আমার কাছে বিষয়টি মোটেই গ্রহণযোগ্য ছিল না। সঙ্গে সঙ্গে নির্দেশনা দিই। আমি বলেছি, তাকে ওই দায়িত্বে আরও দিতে হবে।’

সমাজ থেকে অন্যায়-অবিচার দূর করতে স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিসহ সকল স্তরের মানুষের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টির আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনো দেশের আর্থিক উন্নতি ঘটলে কিছু ক্ষেত্রে টাউট বাটপার বা বিভিন্ন ধরনের সুযোগসন্ধানী লোক সৃষ্টি হয়। তাদের দমন করা শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে সম্ভব না, এটা সামাজিকভাবেও করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সকল সংস্থাকে কাজে লাগাচ্ছি। পাশাপাশি আমাদের সমাজের বিভিন্ন মানুষ যেমন শিক্ষক, অভিভাবক, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, বিশিষ্টজন জনপ্রতিনিধি আছেন, তাদের বলব প্রত্যেক এলাকায় একটা কমিটি করুন। এ ধরনের কোনো অন্যায় করতে দেখলে কেউ যেন প্রশ্রয় না দেয়।’  শেখ হাসিনা বলেন, ‘যদি কোনো ধরনের অপরাধের সঙ্গে আমাদের দলের কেউ সম্পৃক্ত থাকে আমি তাদেরও ছাড় দিচ্ছি না, ছাড় দেব না। আর অন্য কেউ যদি করে, তারা তো ছাড় পাবেই না। শাসনটা ঘর থেকেই করতে হবে, তাই করছি। আইনশৃঙ্খলার কেউ এ ধরনের অপরাধ করলে, জড়িত থাকার প্রমাণ পেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি। এটা অব্যাহত রাখতে হবে।’