আবাসনের রেজিস্ট্রেশন স্ট্যাম্প শুল্ক ও ফি কমানোর আশ্বাস

আবাসন খাতের সার্বিক দিক বিবেচনা করে স্ট্যাম্প ডিউটি ও রেজিস্ট্রেশন ফি যৌক্তিক পর্যায়ে কমিয়ে আনার আশ্বাস দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। গতকাল বৃহস্পতিবার সংসদে ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপনকালে এ ঘোষণা দেন তিনি। মন্ত্রী বলেন, আগামী অর্থবছরে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা, যা চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের চেয়ে ১ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা বেশি। চলতি অর্থবছরের বাজেটে এ মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ধরা হয়েছিল ৪ হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা। আর সংশোধিত বাজেটে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা; যা মূল বাজেটের চেয়ে ১ হাজার ১৮৩ কোটি টাকা বেশি।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ঢাকার পূর্বাচল নতুন শহরে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে (পিপিপি) ৬০ হাজার ফ্ল্যাট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ শহরের জলাবদ্ধতা নিরসন ও সৌন্দর্যবর্ধনে হাতিরঝিল, গুলশান, বনানী, উত্তরা, কুড়িল ও পূর্বাচল এলাকায় ৩৯ কিলোমিটর খাল খনন করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও ৫৫ কিলোমিটার খাল খনন করার পরিকল্পনা রয়েছে। তাছাড়া তুরাগ নদের বন্যা প্রবাহ অঞ্চলের ৯ হাজার ১২৫ একর এলাকায় ৬২ শতাংশ জলাধার হিসেবে সংরক্ষিত রেখে অবশিষ্ট এলাকায় কমপ্যাক্ট টাউনশিপ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

উচ্চ নিবন্ধন ব্যয়, তহবিল সংকট দূর করাসহ আবাসন খাতের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের বিষয়টি এবারের বাজেটে সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে বলে জানিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী। গত ৩০ এপ্রিল রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পরামর্শক কমিটির ৪০তম সভায় তিনি বলেছিলেন, ‘আবাসন খাতের সংকট দূর করা আমাদের বড় অগ্রাধিকার। এ বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যানকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আবাসন খাতের সমস্যা দূর করা হবে।’ এ সময় প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, এনবিআর চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াসহ দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামীন বলেন, নিম্ন-মধ্যবিত্তদের ফ্ল্যাট কিনতে কম সুদে ঋণ দেওয়ার জন্য ২০০৭ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করে। ২০১০ সালে ওই তহবিল শেষ হয়ে যায়। এখন মধ্যবিত্তদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা করা দুরূহ হয়ে পড়ছে। ব্যাংকের সুদহার ১২ থেকে ১৫ শতাংশে উঠেছে। এ অবস্থায় আবাসনের জন্য ২০-২৫ বছর মেয়াদি ঋণের ব্যবস্থা করা জরুরি হয়ে পড়েছে। নতুবা এককালীন টাকা জোগাড় করে কারও পক্ষে অ্যাপার্টমেন্ট কেনা সম্ভব হবে না। এছাড়া ফ্ল্যাট-প্লট রেজিস্ট্রেশনে দেশে ১৩-১৪ শতাংশ পর্যন্ত টাকা ব্যয় হয়। এটা সারা বিশ্বে নজিরবিহীন। সার্কভুক্ত দেশগুলোতে এ হার ৭ শতাংশ। আগামী বাজেটে ফ্ল্যাট-প্লট নিবন্ধনে ৭ শতাংশ কর-ফি আরোপের প্রস্তাব করেছিলেন তিনি।

আবাসন ব্যবসায়ীরা মনে করেন, ফ্ল্যাট বা প্লট কিনতে সরকারের কড়া নজরদারির কারণে দেশের অর্থ বাইরে পাচার হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে বিপুল পরিমাণ কালো টাকাও দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হয় না। কালো টাকা বিনিয়োগের কোনো ধরনের ব্যবস্থা না থাকায় পাচার হয় বিদেশে। মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোতেও দ্বিতীয় বাড়ি (সেকেন্ড হোম

 

কেনার মাধ্যমেও অর্থ পাচার করে অনেকে। দেশে কালো টাকার পরিমাণ কমপক্ষে ৭ লাখ কোটি টাকা বলে ধারণা করা হয়।

তাদের দাবি, মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) খাতটির সরাসরি অবদান ৭.০৮ শতাংশ। এই খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিল্প যোগ করলে জিডিপিতে আবাসন খাতের অবদান বেড়ে দাঁড়াবে ১২ শতাংশেরও বেশি। একই সঙ্গে ৩৫ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি করেছে এই খাত, যাদের ওপর নির্ভরশীল প্রায় দুই কোটি মানুষ।

এদিকে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে আবাসন খাতে নিবন্ধন ফি ও স্ট্যাম্প ফি হ্রাস করার ঘোষণার জন্য প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীকে রিহ্যাবের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানান সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া। গতকাল তিনি বলেন, ‘সরকারের এই যুগান্তকারী প্রস্তাবের ফলে আবাসন খাতে বিদ্যমান স্থবিরতা বহুলাংশে কাঠিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে বিশ্বাস করে রিহ্যাব।’ বাজেটে আবাসন খাতে সরকারের বিনিয়োগ সুবিধার প্রস্তাব এই খাতে ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ সম্পদ বৃদ্ধিতেও সহায়তা করবে বলে মনে করছেন তিনি।