কৃষকের ক্ষতি পোষানোর উদ্যোগ নেই বাজেটে

গত কয়েক বছর ধরে কৃষক ধারাবাহিকভাবে বাম্পার ধান উৎপাদন করছেন। বছরের তিনটি মৌসুমেই লক্ষ্যমাত্রার বেশি ধান উৎপাদন করেও তারা যৌক্তিক দাম পাচ্ছেন না। সরকার কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার সিদ্ধান্ত নিলেও গতকালের বাজেট বক্তৃতায় কৃষককে এই দুর্দশা থেকে বের করে আনার কোনো আশার বাণী শোনাননি অর্থমন্ত্রী। কৃষক ফসল ফলাতে যে পরিমাণ টাকা খরচ করেছেন, ফসল বিক্রি করে সেই টাকা পাচ্ছেন না। বোরো মৌসুমের  সব ধান কৃষকের ঘরে উঠে গেলেও সরকার ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু করেছে অনেক পরে। কৃষকের হাত থেকে যখন মিলার বা ফড়িয়ারা ধান কিনে নিয়েছে তখন সরকার মাঠে নেমেছে ধান ও চাল সংগ্রহের জন্য।

খাদ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, কৃষক যৌক্তিক দাম না পেলেও দেশে চালের জোগানের কোনো ঘাটতি নেই। দেশে পর্যাপ্ত ফলনের পাশাপাশি গত বছর বিদেশ থেকে অতিরিক্ত চাল আমদানি হয়েছে। ২০১৭ সালে হাওড়ে বন্যার পর মাত্র ছয় লাখ টন ফসল নষ্ট হলেও বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়েছে প্রায় ৩৯ লাখ টন চাল। এই চাল এখন উদ্বৃত্ত অবস্থা রয়েছে।

কৃষকের ক্ষতি পোষানোর কোনো পথ বাতলে না দেওয়া হলেও অর্থমন্ত্রী বলেছেন, কৃষি খাতে সরকার যেসব সুবিধা দিচ্ছে তা বহাল রাখা হবে। এছাড়া বাজেট বক্তৃতায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলহানির ক্ষতি থেকে কৃষককে বাঁচাতে ‘শস্য বীমার’ কথা বলা হয়েছে পরীক্ষামূলকভাবে।

গত বছর কৃষি খাতের বরাদ্দ ছিল ১২ হাজার ৭৯২ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটে তা ১ হাজার ২৬১ কোটি টাকা বাড়িয়ে ১৪ হাজার ৫৩ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে।

বাজেট বক্তৃতায় বলা হয়েছে, কৃষি ভর্তুকি, সার-বীজসহ অন্যান্য কৃষি উপকরণ প্রণোদনা কার্ড, পুনর্বাসন সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা প্রদান কার্যক্রম প্রয়োজনীয় মাত্রায় অব্যাহত রাখা হবে। কৃষিপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ নগদ প্রণোদনা ও কৃষি ক্ষেত্রে বিদ্যুৎচালিত সেচ যন্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিলের ২০ শতাংশ রিবেট প্রদান অব্যাহত রাখা হবে। আগামী অর্থবছরে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া মোকাবিলায় গবেষণার মাধ্যমে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও বেশি তাপমাত্রা সহিষ্ণু ফসলের জাত উদ্ভাবন কার্যক্রম জোরদার করার কথা বলা হয়েছে। শস্যের বহুমুখী কার্যক্রম সম্প্রসারণ, জৈব বালাই ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম জনপ্রিয়করণ, খামার যান্ত্রিকীকরণ জোরদার করার কথা বলা হয়েছে। বহুমুখী পাট পণ্য উদ্ভাবনের গবেষণা কার্যক্রম চলমান থাকার কথাও বলা হয়েছে।

কৃষিতে রাসায়নিক সারের দাম নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার দীর্ঘদিন প্রণোদনা দিচ্ছে। এই প্রণোদনা কৃষিপণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখাতে ভূমিকা রেখেছে বলে গতকালের বাজেট বক্তৃতায় বলা হয়েছে। সেখানে আরও বলা হয়েছে, প্রধান প্রধান রাসায়নিক সারের আমদানি মূল্য কোনো কোনো সময় বাড়লেও কৃষকের স্বার্থে সরকার দেশীয় বাজারে সারের বিক্রি মূল্য অপরিবর্তিত রেখেছে। যা পরোক্ষভাবে ভোক্তার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করেছে। আগের মতো আমদানি খরচ যাই হোক না কেন, আগামী অর্থবছরেও রাসায়নিক সারের বিক্রি মূল্য অপরিবর্তিত রাখা হবে। কৃষি প্রণোদনাও অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে বাজেট বক্তৃতায়। ফসল কর্তন ও তার পরবর্তী যান্ত্রিকীকরণে উৎসাহিত করার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। এসব কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি কেনায় কৃষককে ভর্তুকি দেওয়ার কথাও রয়েছে বাজেট বক্তৃতায়।

মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ উল্লেখ করে বাজেট বক্তৃতায় বলা হয়েছে, সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ উন্নয়নের জন্য সরকার প্ল্যান অব অ্যাকশন প্রণয়ন করেছে। গরু ও ছাগল পালনে বাংলাদেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। ছাগলের মাংস উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে চতুর্থ। প্রাণিসম্পদ উন্নয়নে দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে সরকার কাজ করছে বলেও জানানো হয়েছব খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকার জোরালো ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বলা হলেও বাজেট ঘোষণায় তা সুনির্দিষ্ট করা হয়নি।

বাজেটে কৃষিকে অগ্রাধিকার খাত বলা হয়েছে। কৃষি খাতের প্রধান উপকরণ বিশেষ করে সার, বীজ, কীটনাশক আমদানিতে শূন্য শুল্ক হার অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে। মৎস্য, পোল্ট্রি ও ডেইরি খাতের টেকসই উন্নয়ন এবং বিকাশের জন্য নানারকম উপকরণ আমদানিতে বিগত সময়ে যে রেয়াত দেওয়া হয়েছে তা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কৃষিকাজে ব্যবহৃত হার্ভেস্টিং মেশিনারি আমদানির ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট এইচএস কোড সৃজন করে শুল্ক হ্রাসের প্রস্তাব করা হয়েছে।